যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী ওয়াশিংটন ডিসির সহিত বাংলাদেশের সময়ের ব্যবধান ১১ ঘণ্টা। তাহা হইলেও দিনটি দুই দেশেই মঙ্গলবার, ৩ নভেম্বর। আর এই দিনটির জন্যই শুধু যুক্তরাষ্ট্রের নহে, বাংলাদেশসহ সমগ্র বিশ্বের মানুষ আগ্রহের সহিত অপেক্ষা করিয়া ছিল। এই অপেক্ষার কারণ যুক্তরাষ্ট্রে নির্বাচন। বলা উচিত ভোট গ্রহণের শেষ দিন। সরকারিভাবে দিনটি ইলেকশন ডে হইলেও যুক্তরাষ্ট্রের ভোটিং ব্যবস্থায় আগাম ভোট দেওয়ার রেওয়াজ রহিয়াছে। ঐ ব্যবস্থা অনুসারে নির্বাচনের শেষ দিনের পূর্বেই ৯ কোটি ভোট ইতিমধ্যেই ব্যালট বাক্সে পড়িয়াছে, যাহা শত বত্সরের ইতিহাসে দেখা যায় নাই। উল্লেখ্য, যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ৩৩ কোটি মানুষের মধ্যে ১৮ বত্সরের ঊর্ধ্বে প্রায় ২৬ কোটি মানুষেরই ভোটাধিকার রহিয়াছে।
যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচন সর্বদাই তাত্পর্যপূর্ণ; কিন্তু এইবার বহু কারণেই সেই তাত্পর্য অধিক মাত্রা লাভ করিয়াছে। রাজনীতিতে আদর্শের সংঘাত থাকিবে, প্রতিপক্ষ থাকিবে—ইহাই স্বাভাবিক। যুক্তরাষ্ট্রেও তাহা বরাবরই ছিল; কিন্তু রিপাবলিকান পার্টির মনোনয়ন পাইয়া ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হইবার পর যেই কারণেই হউক, যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতির ময়দান খানিকটা তৃতীয় বিশ্বের রূপ লাভ করিয়াছে। তৃতীয় বিশ্বের মতোই মিথ্যাচার, এক দলেকে আরেক দলের নির্বাচনি প্রচারণায় বাধা প্রদানের চেষ্টা দেখা গিয়াছে, যাহা দেশটির রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে এতকাল অনুপস্থিত ছিল। ডেমোক্রেটিক পার্টির সমর্থকরা ইহাও মনে করিতেছে যে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের হাতে যুক্তরাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানসমূহ ধ্বংসের মুখে আসিয়া দাঁড়াইয়াছে, সুতরাং এইবারের নির্বাচন সংকট হইতে উত্তরণের, আমেরিকার অস্তিত্বের। অন্যদিকে ডোনাল্ড ট্রাম্পের শিবির মরিয়া হইয়া উঠিয়াছে পুনর্বার নির্বাচনে জয়লাভের জন্য। কারণ রিপাবলিকান এই প্রেসিডেন্ট পূর্বের প্রেসিডেন্টের স্বাস্থ্য পলিসি ওবামাকেয়ার হইতে শুরু করিয়া ফরেইন পলিসিসহ অনেক জাতীয় ইস্যুতে পরিবর্তন ঘটাইয়াছেন। ইহার পাশাপাশি এমনও পূর্বাভাস রহিয়াছে যে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প পরাজিত হইলে তাহাকে কাঠগড়ায় দাঁড়াইতে হইতে পারে। এই নির্বাচনে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবসায়ী সম্প্রদায়, সংবাদমাধ্যম হইতে শুরু করিয়া প্রায় সকল ক্ষেত্র দুইটি শিবিরে ভাগ হইয়া গিয়াছে, যাহা পূর্বে এতটা তীব্র আকারে দেখা যায় নাই।
লক্ষণীয়, যুক্তরাষ্ট্রের এইবারের নির্বাচন এমন এক সময় হইতে চলিয়াছে, যখন মহামারি করোনা ভাইরাসের সবচাইতে বড় আঘাত পড়িয়াছে খোদ যুক্তরাষ্ট্রেই। এবং স্বভাবতই ইহাই নির্বাচন বিতর্কের প্রধান বিষয়বস্তু হইয়াছে, যদিও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও পররাষ্ট্রনীতিও নির্বাচনি বিতর্কে প্রাধান্য পাইয়াছে। এখন দেখিবার সময় আসিয়াছে, যুক্তরাষ্ট্রে জনগণ কী সিদ্ধান্তে আসিল। ভোট গণনা মঙ্গলবারই শুরু হইবে এবং ফলাফল পাইতে বাংলাদেশ সময়ে বুধবারে গড়াইয়া যাইবে।
নির্বাচন যুক্তরাষ্ট্রের বটে; কিন্তু এই নির্বাচনের সহিত পরোক্ষ, ক্ষেত্রবিশেষ প্রত্যক্ষ স্বার্থ সংশ্লিষ্ট রহিয়াছে বিশ্বের বহু দেশের। অনেকে আশঙ্কা করিতেছেন, এইবারের যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনের উপর বেশ খানিকটা নির্ভর করিবে বিশ্বের অপরাপর দেশের গণতন্ত্রের ভবিষ্যত্। বিশ্বের উল্লেখযোগ্য বৃহত্ গণতন্ত্রের প্রবক্তা যুক্তরাষ্ট্রের বিগত নির্বাচনে ভোট জাল-জালিয়াতির অভিযোগ উঠিয়াছে এবং আজকের নির্বাচনেও ভোটের অপব্যবহারের আশঙ্কা করিয়াছেন অনেকে। এইরূপ অভিযোগ দেশটির নির্বাচনে প্রতিষ্ঠা লাভ করিলে উন্নয়নশীল দেশসমূহের নির্বাচন লইয়া কথা বলিবার মনোবল হারাইয়া ফেলিবে অপরাপর প্রবক্তা দেশসমূহ। ইহা ইতিমধ্যেই পরিষ্কার হইয়া উঠিয়াছে যে, ট্রাম্প পুনর্বার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হইলে আমেরিকার স্বার্থকে অধিক প্রাধান্য দিয়া এবং মার্কিন অর্থনীতিকে চাঙ্গা করিতে গিয়া অনেক দেশের বিরাগভাজনের কারণ হইতে পারেন। সেই ক্ষেত্রে বেশকিছু দেশ বৈরী হইয়া উঠিতে পারে। সুতরাং নির্বাচনটির একটি বৈশ্বিক গুরুত্ব অস্বীকার করা যায় না।
