নবীন আলোকচিত্রশিল্পী রেহানা আক্তারের মৃত্যুসংবাদটা পেলাম ইত্তেফাকের সম্পাদক তাসমিমা হোসেনের কাছ থেকে। তার কাছ থেকেই শুনলাম রেহানা মৃত্যুবরণ করেছে ২৯ জুন সোমবার সন্ধ্যা ৬টা ১৫ মিনিটে। এই মৃত্যুসংবাদ তিনি পেয়েছেন রেহানার বড় ভাই ফটোগ্রাফার বাবুর কাছ থেকে।
মনে পড়ে গেল অনেক কথা। রেহানাদের আদি বাড়ি ছিল ফরিদপুর জেলার ভাঙ্গায়। বাবা ওহাব শেখ আর মা ফজিলা বেগম সেখানে বেশি দিন থাকতে পারেননি। নদীভাঙনের কারণে তারা গৃহহীন হয়ে পড়েন। ১৯৭৪ সালের শেষ দিকে তাদের প্রথম সন্তান ছয় মাসের পুত্র বাবুকে কোলে নিয়ে আশ্রয় নেন রূপগঞ্জের ‘চনপাড়া পুনর্বাসন কেন্দ্রে’। তখন গৃহহারাদের পুনর্বাসনের কাজ করছিল কনসার্ন সাহায্য সংস্থা ও ওয়ার্ল্ড ভিশন। ওহাব শেখ নিজে রিকশা চালাতেন আবার রিকশা ভাড়া দিয়েও উপার্জন করতেন। আর ফজিলা বেগম দর্জির কাজে কিছু আয়রোজগার করে সংসারে খরচ করতেন। বড় ছেলে বাবু চনপাড়াতেই বড় হতে থাকে। যখন যা জোগাড় করতে পারত, সেসব জিনিস বিক্রি করে সংসারের খরচ বহনে সাহায্য করত। এরই ফাঁকে ফাঁকে কিছু টাকা জমাতে থাকে। এইভাবে যখন ১ হাজার ৭০০ টাকা জমা হলো, তখন সেই টাকা দিয়ে একটা ক্যামেরা কেনে। নিজের ক্যামেরা দিয়ে এবার ছবি তোলা শুরু করে বাবু। বাবু এভাবে ফটোগ্রাফারের কাজ শুরু করে। ওহাব ও ফজিলা বেগমের আরো তিনটি সন্তান জন্ম নেয়। বাবুরা দুই ভাই, দুই বোন। রেহানা সবার ছোট। কাছেই ছিল ‘নবকিশলয় উচ্চ বিদ্যালয়’। এই স্কুলে রেহানাকে ভর্তি করে দেয়। সেখানে রেহানা দশম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ালেখা করে। রেহানার বয়স যখন ১৮, পরিবারের উদ্যোগেই চনপাড়ার এক প্রতিবেশীর বাড়িতে রেহানার বিয়ে হয়। আবার বাবুর উত্সাহে ফটো তোলা, বাইক চালানো শিখে নেয় রেহানা। রেহানা ফটোগ্রাফার হিসেবে কাজ করে প্রথম ঘোষণায়, তারপর বাংলা নিউজে, এরপর অনন্যায়, সবশেষে ইত্তেফাকে।
একবার রেহানা ‘অনন্যা শীর্ষদশের’ কাজ করছিল, তখন সে দারুণ ব্যস্ত তথ্য সংগ্রহ ও ছবি তোলা নিয়ে। তথ্য পৌঁছানোর জন্য ছুটতে হয়েছে অনন্যা অফিসে। ফটোশপে ছবি ঠিকমতো প্রস্তুত করাসহ কত কাজ তার। অনন্যা সম্পাদক এসব দেখে রেহানাকে বলেন, ‘রেহানা, তোমাকে আমি ভালো একটা সম্মানী দেব।’ রেহানা উত্তরে বলে, ‘ম্যাডাম, আমার সম্মানীর দরকার নাই। আমাকে একটা চাকরি দিলে আমি বেশি উপকৃত হব। কিছুদিন পর রেহানার চাকরি হয়ে গেল অনন্যায়। এসব গল্প অনন্যা অফিসে বসেই আমার শোনা। নির্বাহী পরিচালক দিল মনোয়ারা মনু বিভিন্ন পেশার নারীদের নিয়ে একটা বৈঠকের আয়োজন করতেন প্রতি মাসেই। সেই সুবাদে আমাদের যাওয়া হতো অনন্যা অফিসে, ইকবাল রোডে। সেখানে রেহানাকে দেখেছি ছবি তুলতে এবং ছবির কাজ করতে। যখন তার নিজের একখানা বাইক হলো, তখন দেখা যেত রাস্তায় রেহানা বাইক চালিয়ে যাচ্ছে, পিঠে তার ক্যামেরার ব্যাগ। সরকারি-বেসরকারি সব অনুষ্ঠানে ছুটে যেত রেহানা। দেশের বরেণ্য, গণ্যমান্য বহুজনের ছবি সে তুলেছে। যখন হেঁটে চলত, তখন হাতে সদা প্রস্তুত তার ক্যামেরা। কখন কী নজরে পড়বে সেদিকে তার খেয়াল। রেহানার বড়ভাই বাবুর সঙ্গে পরিচয় হয় অনন্যার এক অনুষ্ঠানে। নিজে এসে পরিচয় দেয় সে রেহানার বড় ভাই। অনন্যা অফিসে মনুর ঘরে বসেই ছোট বোন রেহানার বেড়ে ওঠা ও ছবি তোলা নিয়ে নানান গল্প করেছে ফটোগ্রাফার বাবু। এখন বাবু আলোকিত বাংলাদেশে ফটোগ্রাফার হিসেবে কাজ করছে। রেহনাকে বাইকে করে কাজের জায়গাগুলোতে পৌঁছে দিত বাবু। আবার কাজ শেষ হলে অনন্যায় নিয়ে যেত। আর দিন শেষে নিজের কাজ শেষ হলে রেহানাকে অনন্যা অফিস থেকে তুলে নিয়ে বাড়ি ফিরত। তা যত রাতই হোক না কেন, রেহানা অনন্যা অফিসেই অপেক্ষা করত।
রেহানা এ বছরের এপ্রিল মাসে পেটে প্রচণ্ড ব্যথা নিয়ে ভর্তি হয় মুগদা হাসপাতালে। ধরা পড়ে কোলন ক্যানসার। অপারেশন লাগবে। সেখানে অপারেশন হয়। প্রথম কেমো দেওয়ার পর বাড়ি নিয়ে আসে। দ্বিতীয় কেমোর আগেই গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়ে। তখন সে বাড়িতেই ছিল। করোনাকালে ২৯ জুন সোমবার সন্ধ্যা ৬টা ১৫ মিনিটে মৃত্যুবরণ করে। তবু রেহানার স্মৃতি অমলিন থাকবে প্রিয়জনের কাছে, অনন্যা ও ইত্তেফাকের সহকর্মীদের কাছে এবং সাধারণ মানুষের কাছে।
এরপর হারালাম প্রবীণ আলোকচিত্রশিল্পী সাইদা খানমকে ১৭ আগস্ট ২০২০। তাকে প্রথম দেখার সুযোগ হয়েছিল বেগম ক্লাবে। গার্ল গাইডের প্রথম ট্রেইনার মাজেদা আপার সঙ্গে গিয়েছিলাম বেগম ক্লাবে। বেগমের নূরজাহান বেগম, গাইডের মাজেদা আপা এবং আমরা নারিন্দায় কাছাকাছি থাকতাম। মাজেদা আপা বিকেলে একা কোথাও গেলে আমাকে সঙ্গে নিয়ে যেতেন। তখন সবে কলেজে ঢুকেছি। বেগম ক্লাবে মাজেদা আপা একটা অনুষ্ঠানে নিয়ে যান। শাড়ি পরা একজন আপা ছবি তুলছিলেন। তাকে মাজেদা আপা বাদল বাদল বলে ডাকছিলেন। অনেক পরে জেনেছি, তিনিই সাইদা খানম। তারপর পরিচয় হওয়ার সুযোগ হয় গাইড হাউজে। একাত্তরের মার্চ মাসে আজিমপুর স্কুল রোডের ‘মরিচা হাউজে’ মেয়েদের রাইফেল ট্রেনিং দেন তুবা খানম। সেখানে গিয়ে দেখি সাইদা আপা রাইফেল ট্রেনিংয়ের ছবি তুলছেন। চৌ এন লাই এসেছে ঢাকায়, তার ছবি তুলতে গেছেন ছেলে সাংবাদিকদের সঙ্গে। ছবি তুলেছেন মাদার তেরেসার আর্ত শিশুদের সেবাদানের সময়।
গাইড হাউজে কাজ করার সময় সহকর্মী লিলি ও নাজমা বেগমকে নিয়ে যেতেন ছবি তোলার জন্য। আর দেখেছি তার সঙ্গী হিসেবে ভিকারুন্নেসা স্কুলের শিক্ষিকা আলেয়া ফেরদৌসীকে নিয়ে ছবি তুলতে যেতে।
আলোকচিত্রশিল্পী সাইদা খানম অনেকের পথিকৃত। তিনি বেঁচে থাকবেন মানুষের অন্তরে অন্তরে চিরকাল।
n লেখক :সমাজকর্মী
