যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ভোট গ্রহণ আজ। বাংলাদেশসহ গোটা বিশ্বের নজর এই নির্বাচনের দিকে। কারণ বিশ্বের ক্ষমতাধর ব্যক্তিকে আজ নির্বাচিত করবেন মার্কিনিরা। হোয়াইট হাউজ দখলের এই লড়াইয়ে রয়েছেন বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন। এখন পর্যন্ত বিভিন্ন জরিপে যুক্তরাষ্ট্র জুড়ে এগিয়ে রয়েছেন বাইডেন।
আর বড় ব্যবধানে পিছিয়ে রয়েছেন ট্রাম্প। কিন্তু ব্যতিক্রমী ইলেকটোরাল কলেজ ভোট পদ্ধতির কারণে শেষ হাসি কে হাসবেন, সেটা বলতে পারছেন না কেউই। শেষ মুহূর্তে তাই জয় নির্ধারণী সুইং বা দোদুল্যমান রাজ্যগুলোতে দৌড়ঝাঁপ চলছে দুই প্রার্থীর।
গত কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে অনিশ্চয়তা আর চ্যালেঞ্জিং ভোটের দ্বারপ্রান্তে যুক্তরাষ্ট্র। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প পরাজয় মেনে শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রতিশ্রুতি দেননি। বিভিন্ন সময়ে উসকানিমূলক বক্তব্য দিচ্ছেন। আবার ডাকযোগে আগাম ভোট বেশি পড়ায় এবার নির্বাচনের রাতেই চূড়ান্ত ফল আসার সম্ভাবনা কম। এসব কারণে পরিস্থিতি সংঘাতে মোড় নিতে পারে—এমন আশঙ্কায় নির্বাচনের দিন ও পরবর্তী যে কোনো সহিংসতা রোধে সতর্কাবস্থায় রাখা হয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে।
সহিংসতার আশঙ্কায় অনেক শহরে বড় বড় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। হোয়াইট হাউজ ঘিরে নিরাপত্তাবলয় তৈরি করা হচ্ছে। আগামী কয়েক সপ্তাহে সম্ভাব্য সহিংসতা মোকাবিলার জন্য প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে ওয়াশিংটন ডিসি পুলিশও। এবারের নির্বাচনেও সাইবার আক্রমণের হুমকি রয়েছে। চূড়ান্ত ফলাফল ঘোষণা না হওয়া পর্যন্ত হ্যাকারদের কড়া নজরে রাখবে হোমল্যান্ড সিকিউরিটির সাইবার সিকিউরিটি ইউনিট।
এবার এমন এক সময়ে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন হচ্ছে, যখন দেশটিতে করোনা ভাইরাস মহামারি চলছে। গত সাত মাসে করোনায় দেশটিতে ২ লাখ ৩০ হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। করোনা মহামারি নির্বাচনে কতটুকু প্রভাব ফেলছে, তা জানা যাবে ফল প্রকাশের পরই।
প্রধান দুই প্রার্থী ট্রাম্প ও বাইডেন : যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন হচ্ছে গত ২৩০ বছর ধরে। দেশটিতে মূলত রিপাবলিকান ও ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রভাব। এ দুই দলের প্রার্থীরাই ঘুরেফিরে প্রেসিডেন্ট হন। যদিও এর বাইরে একজন স্বতন্ত্র প্রার্থী প্রেসিডেন্ট হয়েছেন। তিনি হলেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম প্রেসিডেন্ট জর্জ ওয়াশিংটন। রিপাবলিকান দলের এবারের প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রার্থী জো বাইডেন। অবশ্য ছোট ছোট কিছু রাজনৈতিক দল যেমন লিবার্টারিয়ান, গ্রিন, ইনডিপেনডেন্ট পার্টি প্রেসিডেন্ট পদে প্রার্থী দিয়েছে।
দ্বিতীয়বার প্রেসিডেন্ট হতে লড়ছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। ২০১৬ সালের নির্বাচনে তিনি ডেমোক্র্যাট প্রার্থী হিলারি ক্লিনটনকে পরাজিত করেন। পপুলার ভোট (নাগরিকদের ভোট) কম পেয়েও ইলেকটোরাল কলেজ ভোটে ৪৫তম প্রেসিডেন্ট হন তিনি। প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার অনেক আগে থেকেই তিনি পরিচিত ও আলোচিত ছিলেন নিউ ইয়র্কের একজন ধনকুবের ব্যবসায়ী ও সেলিব্রেটি হিসেবে। তার রানিং মেট হিসেবে এবারও রয়েছেন ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্স।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বিভাজন সৃষ্টিকারী নীতি ও বক্তব্যের কারণে গত চার বছরে ব্যাপক সমালোচনা হয়েছে। নির্বাচিত হওয়ার পর তাকে অভিশংসন বা ইমপিচ করার চেষ্টা হয়েছে। কংগ্রেসের প্রতিনিধি পরিষদে অভিসংশিত হলেও সিনেটে রক্ষা পান তিনি। তিনিই একমাত্র মার্কিন প্রেসিডেন্ট, যিনি ইমপিচমেন্টের মুখে পড়ে আবারও নির্বাচন করছেন।
অন্যদিকে দীর্ঘ প্রায় পাঁচ দশকের রাজনৈতিক জীবনে হোয়াইট হাউজে যাওয়ার যে স্বপ্ন জো বাইডেন লালন করে আসছেন, তা পূরণ হওয়ার জন্য এটাই সম্ভবত তার শেষ চেষ্টা। ডেলাওয়ারের সাবেক সিনেটর বাইডেন আট বছর ওবামা প্রশাসনের ভাইস প্রেসিডেন্ট ছিলেন। অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক বলছেন, বারাক ওবামার ডেপুটি থাকার সুবাদে তিনি কৃষ্ণাঙ্গ ডেমোক্র্যাটদের বিপুল সমর্থন পেয়েছেন। তিনি রানিংমেট হিসেবে বেছে নিয়েছেন একজন কৃষ্ণাঙ্গ-ভারতীয় বংশোদ্ভূত নারী কমলা হ্যারিসকে।
কে এগিয়ে-কে পিছিয়ে
বিবিসির খবর অনুযায়ী গতকাল সোমবার পর্যন্ত জনমত জরিপে যুক্তরাষ্ট্র জুড়ে ট্রাম্পের চেয়ে ৯ পয়েন্টের ব্যবধানে এগিয়ে রয়েছেন জো বাইডেন। বাইডেনের পক্ষে মত দিয়েছেন ৫৩ শতাংশ ভোটার, যেখানে ট্রাম্পের পক্ষে রয়েছেন ৪৩ শতাংশ ভোটার। এসব জরিপে পপুলার ভোটের ধারণা পাওয়া যায়। কিন্তু প্রেসিডেন্ট হতে পপুলার ভোট নয়, বরং ২৭০টি ইলেকটোরাল ভোট লাগে। গত পাঁচটি নির্বাচনের মধ্যে চারটিতেই বেশি পপুলার ভোট পেয়েছেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থীরা। কিন্তু ইলেকটোরাল পদ্ধতির কারণে দুইবার জয়ী হয়েছেন রিপাবলিকান প্রার্থী।
যুক্তরাষ্ট্রে মোট ইলেকটোরাল কলেজ ভোট ৫৩৮টি। ওয়াশিংটন ডিসির তিন জনসহ ৪৩৮ জন হাউজ অব রিপ্রেজেন্টেটিভ (নিম্নকক্ষ) এবং ১০০ জন সিনেটর (উচ্চকক্ষ) মিলে ৫৩৮টি ইলেকটোরাল কলেজ ভোট গণনা করা হয়। মেইন ও নেব্রাস্কা রাজ্য ছাড়া ৪৮টি রাজ্য ও ওয়াশিংটন ডিসিতে যিনি যে রাজ্যে সর্বোচ্চ পপুলার ভোট পাবেন তিনি ঐ রাজ্যের সবগুলো ইলেকটোরাল ভোট পাবেন। নেব্রাস্কা ও মেইন রাজ্যের পপুলার ভোটের বিজয়ীরা পান দুটি করে ইলেকটোরাল কলেজ ভোট।
ইলেকটোরাল ভোটের হিসাব আটকে রয়েছে সুইং রাজ্যগুলোতে। জরিপে বেশির ভাগ সুইং রাজ্যেও ট্রাম্পের চেয়ে এগিয়ে বাইডেন। তবে ব্যবধান কম। সিএনএনের এক বিশ্লেষণে বলা হচ্ছে, বাইডেনের জয় নিশ্চিত এমন রাজ্যগুলোতে ইলেকটোরাল ভোট রয়েছে ২০৩টি। আর ট্রাম্প জিততে যাচ্ছেন এমন রাজ্যগুলোর ইলেকটোরাল ভোট ১২৫টি। বাকি ২১০টি ইলেকটোরাল ভোট রয়েছে সুইং স্টেটগুলোতে। এর মধ্যে রিপাবলিকানদের ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত টেক্সাস রয়েছে। এই রাজ্যে ইলেকটোরাল ভোটের সংখ্যা ৩৮টি। গতবার ট্রাম্প এই রাজ্যে অনায়াসে জিতেছিলেন। কিন্তু এবার সবচেয়ে আগাম ভোট পড়েছে এই টেক্সাসে। এ কারণে এই রাজ্যে ট্রাম্প হারতে পারেন বলে অনেক বিশ্লেষকের ধারণা। এই রাজ্যে জিতলে বেগ পেতে হবে না বাইডেনকে। আর ঘুরে দাঁড়াতে কষ্ট হবে ট্রাম্পের।
গতবার মিশিগান, উইসকনসিন এবং পেনসিলভেনিয়া ডেমোক্র্যাটদের কাছ থেকে কেড়ে নিয়েছিলেন ট্রাম্প। এবার জরিপে এসব রাজ্যে বড় ব্যবধানে এগিয়ে বাইডেন। এসব রাজ্যে জয় পেলে সহজেই প্রেসিডেন্ট হয়ে যাবেন বাইডেন। ২৭০ ম্যাজিক ফিগার পেতে একাধিক রাস্তা খোলা রয়েছে তার। কিন্তু সেক্ষেত্রে সুযোগ কম ট্রাম্পের। প্রেসিডেন্ট হতে হলে অবশ্যই জরিপে পিছিয়ে থাকা বেশির ভাগ সুইং রাজ্যে জয় পেতেই হবে তাকে। ২০১৬ সালের নির্বাচনে সেটাই হয়েছিল।
যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে বিপুল বাংলাদেশি আমেরিকান ভোটার রয়েছেন। মোটা দাগে যাদের বসবাস ডেমোক্র্যাট রাজ্য নিউ ইয়র্কে। ফলে তাদের ভোট এই জাতীয় নির্বাচনে কোনো প্রভাব ফেলবে না। বেশির ভাগ বাংলাদেশি আমেরিকান ডেমোক্র্যাট সমর্থক। তবে এবার ট্রাম্পের সমর্থক তৈরি হয়েছে উল্লেখযোগ্য হারে।
নির্বাচনের সময়সূচি
যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় সময় মঙ্গলবার সকাল ৬টা (বাংলাদেশ সময় বিকাল ৫টা) থেকে শুরু হবে ভোটগ্রহণ। রাজ্যভেদে ভোট গ্রহণের সময়সীমা হেরফের হবে। ২৩ কোটির বেশি ভোটারের মধ্যে ইতিমধ্যে ৯ কোটি ৩০ লাখের বেশি আগাম ভোট পড়েছে। পূর্বাভাস বলছে, এক শতাব্দীর বেশি সময় পর এবারই সর্বোচ্চ ভোট পড়ছে। বাকিরা আজ সশরীরে কেন্দ্রে গিয়ে ভোট দেবেন। বিপুল মানুষ ডাকযোগে ভোট দেওয়ায় এবারের নির্বাচনের ফল পেতে দেরি হতে পারে। এ কারণে বড় ধরনের উত্তেজনা তৈরির আশঙ্কা রয়ে গেছে।
ডাকযোগে ভোট কখন ও কীভাবে গণনা করা হবে তার জন্য একেক রাজ্যে রয়েছে একেক ধরনের আইন। কিছু কিছু রাজ্যে, যেমন ফ্লোরিডা এবং অ্যারিজোনা, সেখানে ডাকযোগে ভোটের গণনা শুরু হয়ে গেছে। কিন্তু উইসকনসিন ও পেনসিলভানিয়ায় ৩ নভেম্বরের আগে সেগুলো স্পর্শ করা হবে না। ফলে সেখান থেকে ভোটের ফলাফল দেরিতে আসবে। নর্থ ক্যারোলাইনায় ভোটগ্রহণ শেষ হবে স্থানীয় সময় সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায়। অন্যতম প্রধান ব্যাটলগ্রাউন্ড রাজ্য ফ্লোরিডাতে ভোটগ্রহণ শেষ হবে স্থানীয় সময় রাত ৮টায়।
পোস্টাল ভোট ও কেন্দ্রে পড়া ভোট, এই দুটোর গণনা প্রথম আসবে এই ফ্লোরিডা রাজ্য থেকে। প্রাথমিক গণনায় এগিয়ে থাকতে পারেন বাইডেন। কারণ তার সমর্থকরা আগেই ডাকযোগে ভোট দেওয়ার পক্ষে ছিলেন।
সাইবার হামলার আশঙ্কা
এবারের নির্বাচনে সাইবার হামলার আশঙ্কা করা হচ্ছে। এই হুমকি মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্রের ৫০টি রাজ্য ও ডিস্ট্রিক্ট অব কলম্বিয়ায় (ওয়াশিংটন ডিসি) সর্বোচ্চ সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে হোমল্যান্ড সিকিউরিটি। ২০১৬ সালের নির্বাচনে রাশিয়ার হ্যাকারদের সাইবার আক্রমণের হুমকি ছিল। এবারের নির্বাচনে নতুন হুমকি এসেছে ইরান ও চীনের হ্যাকারদের কাছ থেকে। আশঙ্কা করা হচ্ছে—সাইবার আক্রমণ চালিয়ে ভোটারদের সব তথ্য, বিশেষ করে নাম, ঠিকানা, ইমেইল ও টেলিফোন নম্বর মুছে ফেলা হতে পারে। সাইবার আক্রমণের সম্ভাব্য লক্ষ্য ব্যাটলগ্রাউন্ড রাজ্য। এ কারণে এসব রাজ্যে মোতায়েন করা হয়েছে বিশেষ মিলিটারি ইউনিট।
কংগ্রেসের নির্বাচনও গুরুত্বপূর্ণ
আজ প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের পাশাপাশি কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ হাউজের ৪৩৫টি এবং উচ্চকক্ষ সিনেটের ৩৫টি আসনে ভোট হবে। সিনেটে রিপাবলিকানদের সংখ্যা গরিষ্ঠতা থাকলেও এবার হাতছাড়া হতে পারে। সেটা হলে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে বেগ পেতে হবে রিপাবলিকান প্রেসিডেন্টকে। অন্যদিকে বাইডেন প্রেসিডেন্ট হলে যে কোনো আইন, সিদ্ধান্ত সহজেই পাশ করাতে পারবেন। এছাড়া প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ ডেমোক্র্যাটদের হাতে থাকছে বলেই জরিপ বলছে। রাজ্যভিত্তিক বিভিন্ন পদেও নির্বাচন হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ব্যয়বহুল নির্বাচন
যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে এবারই সবচেয়ে ব্যয়বহুল নির্বাচন হতে যাচ্ছে। নির্বাচনে ১ হাজার ৪০০ কোটি মার্কিন ডলার (১ লাখ ১৯ হাজার কোটি টাকা) ব্যয় করছেন প্রেসিডেন্ট প্রার্থীসহ, সিনেট ও হাউজের প্রার্থীরা। ২০১৬ সালের প্রায় দ্বিগুণ ব্যয় হচ্ছে এবারের নির্বাচনে।
নির্বাচনী প্রচারণার শেষ দিনে গতকাল প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নর্থ ক্যারোলিনা, পেনসিলভেনিয়া, মিশিগান এবং উইসকনসিনে পাঁচটি সমাবেশ করেছেন। বাইডেন পেনসিলভেনিয়া, ওহাইও এবং সাবেক প্রেসিডেন্ট ওবামা বাইডেনের পক্ষে জর্জিয়া ও ফ্লোরিডায় প্রচারণা চালান।
ইত্তেফাক/এসআই
