এরদোগান ক্ষমতা গ্রহণের পর আমূল পরিবর্তন এসেছে তুরস্কের পররাষ্ট্র নীতিতে। কিন্তু এরদোগানের বেশ কিছু সিদ্ধান্তের কারণে কূটনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে মুসলিম এই দেশটি। আন্তর্জাতিক কূটনীতি বিষয়ক পর্যালোচকদের মতে, বিশ্বে 'প্রতিবেশীদের সঙ্গে দৃঢ় সম্পর্ক' এবং 'শূন্য শত্রু' থাকা দেশ তুরস্কের বর্তমানে প্রতিবেশীদের সঙ্গেও ভালো সম্পর্ক নেই। সেই সঙ্গে নতুন করে এরদোগানের বিভিন্ন মন্তব্যের কারণে বিশ্বের শক্তিশালী দেশগুলোর সঙ্গেও নতুন করে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়ছে তুরস্ক।
বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে আরো একবার অর্থনৈতিক মন্দার দ্বারপ্রান্তে রয়েছে তুরস্ক। ২০০১ সালের মত সৃষ্টি হতে যাওয়া ভয়ংকর এই অর্থনৈতিক মন্দা মোকাবেলায় অনেক বন্ধু রাষ্ট্রের প্রয়োজন দেশটির। তুরস্কের সকলের সঙ্গে উষ্ণ সম্পর্ক তৈরি করা উচিত, কিন্তু তার বদলে বৈরি সম্পর্কে তৈরি করছে দেশটি।
এখান থেকে ১০ বছর আগে মুসলিম বিশ্বের জন্য একটি রোল মডেল হিসেবে তুরস্কের কথা উল্লেখ করেছিলেন তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা। তুরস্কের তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আহমেত দেবতগ্লু 'প্রতিবেশীর সঙ্গে সমস্যা শূন্যে নামিয়ে আনা' নীতি গ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু সেই সবকিছুর পরিবর্তন হয়ে যায় ২০১৫ সালে ক্ষমতাসীন দল একেপি পার্টি (জাস্টিস অ্যান্ড ডেভলোপমেন্ট পার্টি) সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারালে। এ সময় দেশটির ডানপন্থী ন্যাশনালিস্ট মুভমেন্ট পার্টিকে নিয়ে সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পান রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোগান।
মিডিল ইস্ট ইনিস্টিটিউটের টার্কিশ স্টাডি সেন্টারের পরিচালক গোনাল তোল বলেন, 'নতুন পররাষ্ট্র নীতি অনুসারে বর্তমানে দেশটির চারপাশে যারা রয়েছে সকলে শত্রু রাষ্ট্র। অন্যদিকে তুরস্কের পশ্চিমা বন্ধু রাষ্ট্রগুলোও তাদের পরিত্যাগ করছে। আর সেই সঙ্গে নিজেদের সীমানার বাহিরে সামরিক শক্তি প্রদর্শনেও উৎসাহিত হচ্ছে তুরস্ক।
কুর্দিশদের শাস্তি দেয়ার নামে এখন পর্যন্ত আঙ্কারা সিরিয়া অধিকৃত সীমান্তে ঢুকে হামলা চালিয়েছে। সেখান বোমা হামলা করেছে এবং কিছু অংশের দখল নিয়ে রেখেছে। একই ভাবে কুর্দিশদের ওপর হামলার নামে ইরাকেও হামলা চালিয়েছে তুরস্ক।
নিজে থেকেই লিবিয়ার গৃহযুদ্ধে অংশ নিয়েছে আঙ্কারা। সেখানে বর্তমানে সরকার গঠন করা প্রধানমন্ত্রী ফয়েজ আল-সারাজের সঙ্গে একটি চুক্তি স্বাক্ষর করেন এরদোগান। এই চুক্তির কল্যাণে লিবিয়ার এই সরকারকে অস্ত্র ও পণ্যাদিয়ে সহায়তার পাশাপাশি সৈন্যও পাঠায় তুরস্ক। সেই সঙ্গে লিবিয়া সীমান্তের পূর্ব ভূমধ্যসাগরীয় সীমান্তের নিকটে নিজেদের সৈন্য মোতায়েনের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে গ্রিস ও সাইপ্রাসকে তাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত করে তুরস্ক। সমুদ্রেও দেশটির আগ্রাসনমূলক আচরণের কারণে গ্রিস ও সাইপ্রাসের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি ঘটছে। অনেকে ধারণা করছে ন্যাটো ভুক্ত এই দুই সহযোগী রাষ্ট্রের মধ্যে চলমান বৈরি আচরণের কারণে যে কোন সময় যুদ্ধ লেগে যেতে পারে!
কিছুদিন আগেও যখন আর্মেনিয়া ও আজারবাইজানের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে, তুরস্ক সেখানে হস্তক্ষেপ করে। আজারবাইজানকে 'শর্তহীন সহায়তা'র ঘোষণা দেয় দেশটির প্রেসিডেন্ট এরদোগান। আজেরি ফোর্সের সঙ্গে সম্মিলিতভাবে যুদ্ধের জন্য সিরিয়ায় বেশ কিছু অস্ত্র বিক্রি করেন এরদোগান, যা তার মেয়ে জামাইয়ের কারখানায় উৎপাদন করা হয়। রাশিয়ার হস্তক্ষেপে যখন আজারবাইজান ও আর্মেনিয়ার মধ্যকার সমস্যা সমাধানে আলোচনা শুরু হয়, তখনো এরদোগান জানিয়েছিলেন, 'আজারবাইজান ও তুরস্ক এক রাষ্ট্রের দুই রাজ্য'।
নিঃসন্দেহে এই অঞ্চলে যত দেশ রয়েছে তার মধ্যে সামরিকভাবে শক্তিশালী তুরস্ক। কিন্তু কাতার ছাড়া তুরস্ককে যেকোনো বিপদে সহায়তা করার মত কোন দেশ নেই। এই কাতার অবশ্য অর্থ ছাড়া অন্য কিছু দিয়ে তুরস্ককে সহায়তা করতে পারবে না।
বরাবরই দাবি করা হচ্ছে তুরস্কের সঙ্গে দৃঢ় সম্পর্ক রয়েছে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের। রাশিয়ার কাছ থেকে বেশ কিছু 'এস-৪০০' মিসাইল ক্রয় করায় তুরস্কের ওপর অবরোধ আরোপ করে যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু এই বন্ধু রাশিয়ার বিরুদ্ধে হাত মিলিয়েছে তুরস্ক। সম্প্রতি সিরিয়া, লিবিয়া এবং আর্মেনিয়া-আজারবাইজান দ্বন্দ্বে রাশিয়ার বিপক্ষের শক্তিকে সহায়তার ঘোষণা দেয় এরদোগান!
এরদোগানের বিভিন্ন সময় করা মন্তব্যের কারণে দিনে দিনে তুরস্কের সঙ্গে আরো সম্পর্কের অবনতি হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপিয় দেশগুলোর। কিছুদিন আগেই ইউরোপিয় দেশের নেতৃবৃন্দকে 'নাৎসি বাহিনীর একই শিকলে বাঁধা' বলে মন্তব্য করেন এরদোগান। এ ছাড়াও মার্কিন প্রেসিডেন্টকে 'চপেটাঘাত' করার কথাও বলেছেন তিনি। অ্যাজিয়ান সাগরের কিছু দ্বীপ গ্রিসের বদলে তুরস্কের মালিকানায় থাকার কথা বলেও ঘোষণা করেন তিনি। সেই সঙ্গে নিজেদের এককভাবে ফিলিস্তিনের রক্ষক মনে করে ইসরাইলকে আক্রমণাত্মক মন্তব্য করা এবং ইউরোপে শরণার্থীর বিনা বাধায় প্রবেশ করানোর হুমকিও দিয়ে আসছেন এরদোগান।
সম্প্রতি ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট মাক্রোঁর মন্তব্য নিয়ে বিভিন্ন সময় মন্তব্য করছেন এরদোগান। এমনকি রাষ্ট্রীয় প্রধান হিসেবে অন্যান্য রাষ্ট্রকে ফ্রান্সের পণ্য বয়কটের আহ্বানও জানান তিনি। এ সময় তিনি বলেন, 'মাক্রোঁর মানসিক চিকিৎসার প্রয়োজন'। বিষয়টি নিয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানায় ফ্রান্স। দেশটির প্রেসিডেন্ট অফিস জানায়, এরদোগানকে তার পলিসি পরিবর্তন করা উচিত। কেননা সবদিক থেকেই তা বেশ ভয়ংকর।
মিশরি স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি বিষয়ক অধ্যাপক ডেভিড রোমেনো বলেন, 'এভাবে চললে কিছু সময় পর তুরস্ক নিজেকে বিশ্ব থেকে বিচ্যুত অবস্থায় পাবে। আর এর কিছুদিন পরেই তুরস্কের মানুষ এই ঘটনার জন্য হয় এরদোগানকে দায়ী করবে অথবা দুর্বল রাষ্ট্রে পরিণত হবে তুরস্ক। এমনকি দুটোই এক সঙ্গে ঘটতে পারে।'
ইত্তেফাক/আরএ
