যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচন ব্যবস্থা অন্য সব দেশের চেয়ে বেশ আলাদা। সব সময় এই নির্বাচন সরলভাবে অনুষ্ঠিত হয়নি। প্রায় ২৫০ বছরের মার্কিন গণতন্ত্রের ইতিহাসে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন নিয়ে ঘটেছে বেশ কয়েকটি চমকপ্রদ ও নাটকীয় ঘটনা। ইতিহাস থেকে এখানে সে রকম কয়েকটি ঘটনা তুলে ধরা হলো :
‘দুই বছর ধরে’ ভোটগ্রহণ
যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল আর্কাইভস তথ্য অনুযায়ী, সদ্য তৈরি করা সংবিধান অনুসারে ১৭৮৮ সালের ১৫ ডিসেম্বর থেকে শুরু করে ১৭৮৯ সালের ১০ জানুয়ারি পর্যন্ত, ২৫ দিন ধরে ঐ নির্বাচনের ভোটগ্রহণ হয়। যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে এই একবারই দুই ক্যালেন্ডার বছর জুড়ে নির্বাচন হয়েছিল। তখনকার ইলেকটোরাল কলেজে মোট ভোট ছিল ৬৯টি, এখন যা ৫৩৮টি। যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতাযুদ্ধের নেতা হিসাবে জর্জ ওয়াশিংটন সবগুলো ভোট পেয়ে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। জন অ্যাডামস ৩৪টি ভোট পেয়ে ভাইস প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন।
সমান ভোট
১৮০০ সালে যুক্তরাষ্ট্রে যে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, প্রথমবারের মতো দলগতভাবে সেখানে প্রার্থী মনোনয়ন দেওয়া হয়। রিপাবলিকান দলের প্রার্থী ছিলেন তৎকালীন ভাইস প্রেসিডেন্ট টমাস জেফারসন এবং অ্যারন বার। আর ফেডারেলিস্টদের প্রার্থী ছিলেন সেই সময়ের প্রেসিডেন্ট জন অ্যাডামস আর চার্লস সি পিঙ্কনি। রিপাবলিকানরা চাইছিলেন যে, তাদের দুই প্রার্থীর মধ্যে জেফারসন কিছু ভোট বেশি পাবেন আর অ্যারন বার একটি হলেও কম। তাহলে একজন প্রেসিডেন্ট, আরেক জন ভাইস প্রেসিডেন্ট হবেন। কিন্তু ঘটনাক্রমে দুই জনের ভোট সমান, ৭৩ ভোট হয়ে যায়। ফলে কে প্রেসিডেন্ট হবে, সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার ভার গিয়ে হাউজ অব রিপ্রেজেন্টেটিভের ওপর পড়ে। সাত দিন ধরে ৩৫ দফা ভোটাভুটিতেও কোনো সমাধান আসেনি। শেষ পর্যন্ত অ্যালেকজান্ডার হ্যামিলটন কয়েক জন ফেডারেলিস্ট প্রতিনিধিকে জেফারসনকে সমর্থন করাতে রাজি করাতে সক্ষম হন। টমাস জেফারসন প্রেসিডেন্ট হন আর ভাইস প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পান অ্যারন বার।
হাউজ অব রিপ্রেজেন্টেটিভের মাধ্যমে প্রথম নির্বাচন
পরবর্তী সময়ে আরো দুই বার হাউজ অব রেপ্রেজেন্টেটিভের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন করতে হয়েছে। ১৯২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডেমোক্রেটিক ও রিপাবলিকান পার্টির পক্ষে চার জন প্রেসিডেন্ট পদে নির্বাচন করেছিলেন। তাদের মধ্যে অ্যান্ড্রু জ্যাকসন সবচেয়ে বেশি ভোট পেয়েছিলেন (পপুলার ভোট)। অন্য প্রার্থীদের চেয়ে ইলেকটোরাল কলেজেও তিনি বেশি ভোট পেয়েছিলেন। কিন্তু প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হতে হলে ইলেকটোরাল কলেজের যতগুলো ভোট দরকার, তা তিনি পাননি। ফলে সংবিধান অনুযায়ী প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের দায়িত্ব বর্তায় হাউজ অব রিপ্রেজেন্টেটিভের ওপর, যাকে বলে ‘কনটিনজেন্ট ইলেকশন’। কংগ্রেসম্যানরা প্রেসিডেন্ট নির্বাচন করবেন আর সেনেটররা নির্বাচন করবেন ভাইস প্রেসিডেন্ট। সেই ভোটাভুটিতে নির্বাচিত হন জন কুইন্সি অ্যাডামস। যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে একমাত্র সেবারই সাধারণ ভোট ও ইলেকটোরাল কলেজের ভোটে সংখ্যাধিক্য থাকার পরেও পরাজিত হয়েছিলেন কোনো প্রেসিডেন্ট প্রার্থী।
কমিশন করে প্রেসিডেন্ট নির্ধারণ
১৯৭৬ সালের নির্বাচনকে বলা হয় আমেরিকার ইতিহাসে সবচেয়ে বিতর্কিত নির্বাচন। রিপাবলিকান পার্টি প্রেসিডেন্ট পদে মনোনীত করেছিল রাদারফোর্ড বি হেইসকে আর ডেমোক্র্যাটরা মনোনীত করেছিল স্যামুয়েল জে টিলডেনকে। নির্বাচনে টিলডেন হেইসের চেয়ে ২ লাখের বেশি ভোট পান। ইলেকটোরাল কলেজের ভোটও তিনি পেয়েছিলেন ১৮৪টি, আর হেইস পান ১৬৫টি। নির্বাচিত হওয়ার জন্য টিলডেনের দরকার ছিল এক ভোট আর হেইসের দরকার ছিল ২০টি ভোট। বাকি যে ২০টি ভোট ছিল, উভয় দলই দাবি করেছিল যে, সেগুলো তারা পেয়েছে। সংকট সমাধানের জন্য একটি আইন পাশ করে ১৫ সদস্যের নির্বাচনি কমিশন গঠন করা হয়, যার মধ্যে কংগ্রেসের উভয় কক্ষের পাঁচ জন করে প্রতিনিধির সঙ্গে সুপ্রিম কোর্টের পাঁচ জন সদস্য থাকবেন। তবে সেখানেও দেখা যায়, কংগ্রেসের সদস্য আর বিচারপতি মিলিয়ে রিপাবলিকান হয়ে গেছেন আট জন আর ডেমোক্র্যাট সাত জন। শেষ পর্যন্ত কমিশনের আট-সাত ভোটের ব্যবধানে ২০টি ইলেকটোরাল ভোট হেইসকে দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। ফলে ১৮৫-১৮৪ ভোটের ব্যবধানে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন হেইস।
সুপ্রিম কোর্টের রায়ে সিদ্ধান্ত
২০০০ সালে জর্জ ডব্লিউ বুশ এবং আল গোরের মধ্যে ভোটাভুটি হওয়ান পর ডেমোক্র্যাট আল গোর পেয়েছিলেন ২৬৭ ইলেকটোরাল ভোট আর রিপাবলিকান বুশ পেয়েছিলেন ২৪৬ ভোট। শুধু ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যের ২৫টি ভোট বাকি ছিল। সেখানে দুই প্রার্থীর মধ্যে ভোটের ব্যবধান এত কম ছিল, যে সপ্তাহের পর সপ্তাহ জুড়ে ভোট গণনা চলছিল। সেই সময় ফ্লোরিডার গভর্নর ছিলেন জর্জ বুশের ভাই জেব বুশ। ২৬ নভেম্বর তিনি ঘোষণা দেন, ফ্লোরিডার ইলেকটোরাল ভোট জর্জ বুশের পক্ষে যাচ্ছে। পুনরায় গণনার দাবিতে সুপ্রিম কোর্টে মামলা হয়। তবে সুপ্রিম কোর্ট পাঁচ-চার বিচারপতির মতামতের ভিত্তিতে ভোট পুনর্গণনা বন্ধের আদেশ দিয়ে বুশকে প্রেসিডেন্ট হিসাবে নির্বাচিত করার রায় দেন।‑
ইত্তেফাক/ইউবি
