ঐতিহাসিক এক নির্বাচনে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হয়েছেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থী সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন। তার এই জয়ের মাধ্যমে দ্বিতীয় মেয়াদে জিততে পারলেন না ডোনাল্ড ট্রাম্প। দীর্ঘ ২৮ বছর পর কোনো ক্ষমতাসীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট দ্বিতীয় মেয়াদে নির্বাচিত হতে ব্যর্থ হলেন। ১৯৮০ সালে জিমি কার্টার এবং ১৯৯২ সালে জর্জ এইচ ডব্লিউ বুশের পর একবিংশ শতাব্দীতে প্রথম এক মেয়াদের প্রেসিডেন্ট হিসেবে মার্কিন ইতিহাসে জায়গা হচ্ছে ডোনাল্ড ট্রাম্পের। আর প্রথম মেয়াদে সবচেয়ে বেশি বয়স্ক প্রেসিডেন্ট হিসেবে হোয়াইট হাউজে যাচ্ছেন ৭৭ বছর বয়সি জো বাইডেন।
এবারের নির্বাচনকে দেখা হচ্ছিল, কয়েক দশকের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং চ্যালেঞ্জিং নির্বাচন হিসেবে। কারণ ব্যবসায়ী থেকে প্রেসিডেন্ট হওয়া ডোনাল্ড ট্রাম্প গত চার বছরে যুক্তরাষ্ট্রে বিভক্তির সৃষ্টি করেছেন বলে মনে করেন অনেকে। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে, তিনি সব কিছুই করতেন দ্বিতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্ট হওয়ার জন্য এবং ব্যক্তিগত সুবিধা অর্জনের জন্য। প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালনে তিনি সাধারণ মানুষের কথা ভাবেননি। করোনা ভাইরাসে (কোভিড-১৯) সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা যুক্তরাষ্ট্রে। ট্রাম্পের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল, এই মহামারি মোকাবিলায় তিনি ব্যর্থ হয়েছেন। তার আমলেই বর্ণবাদ বেড়েছে যুক্তরাষ্ট্রে। চলতি বছরেই যুক্তরাষ্ট্রে নজিরবিহীন বিক্ষোভ হয়েছে। বলা হয়ে থাকে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের উসকানিমূলক বক্তব্যে অনেকক্ষেত্রে সহিংসতা বেড়েছে। এমন পরিস্থিতিতে এবারের নির্বাচনকে অনেক মার্কিনি তাদের জীবনের সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং নির্বাচন বলে মনে করেছেন।
গত মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ভোটগ্রহণ হয়। করোনা মহামারির কারণে এবার রেকর্ড ১০ কোটির বেশি আগাম ভোট পড়েছে। যার বেশিরভাগই ডাকযোগের ভোট। বিভিন্ন রাজ্যে ভোটগ্রহণ ও গণনার সময় ভিন্ন হওয়ার কারণে ২০০০ সালের পর ভোট গণনায় এবারই সবচেয়ে বেশি বিলম্ব হয়েছে। কে হচ্ছেন পরবর্তী মার্কিন প্রেসিডেন্ট সেটা জানার জন্য চার দিন অপেক্ষা করতে হয়েছে মার্কিনি ও বিশ্ববাসীর। বাংলাদেশ সময় শনিবার রাতে পেনসিলভেনিয়া রাজ্যে জো বাইডেনের জয় নিশ্চিত হয়। এর মাধ্যমে তিনি ২৭০টি ইলেকটোরাল ভোট নিশ্চিত করেন। এই নির্বাচনে যে পরিমাণ মানুষ ভোট দিয়েছেন ১৯০০ সালের পর কোনো নির্বাচনে এতো মানুষ ভোট দেননি। এবারের নির্বাচনে জো বাইডেন রেকর্ডসংখ্যক পপুলার ভোট বা সাধারণ মানুষের ভোট পেয়েছেন। রবিবার পর্যন্ত (বাংলাদেশ সময়) ভোট গণনায় তিনি ৭ কোটি ৪৫ লাখ ৬৬ হাজার ৭৩১ ভোট পেয়েছেন। যা মোট ভোটের ৫০ দশমিক ৫ শতাংশ। অন্যদিকে ডোনাল্ড ট্রাম্প পেয়েছেন ৭ কোটি ৩ লাখ ৯৬ হাজার ৫৭৩ ভোট (৪৭ দশমিক ৭)। ট্রাম্পের চেয়ে বাইডেন প্রায় ৪১ লাখ ভোট বেশি পেয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি ভোট পেয়ে প্রেসিডেন্ট হয়েছেন তিনি।
ঐতিহাসিক নির্বাচনে জয়ের পর জো বাইডেন বলেন, দেশকে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য আমাকে বেছে নেওয়ায় আমি সম্মানিত। আমাকে ভোট দিয়েছেন বা দেননি সেটা বিষয় নয়, আমি সব আমেরিকানের প্রেসিডেন্ট হবো। আমার ওপর আস্থার প্রতিদান দেবো। এই জয়ে দীর্ঘ পাঁচ দশকের রাজনৈতিক জীবনে প্রেসিডেন্ট হওয়ার যে স্বপ্ন ছিল বাইডেনের তা পূরণ হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ম অনুযায়ী ২০২১ সালের ২০ জানুয়ারি শপথের পর দায়িত্ব নেবেন।
যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে এবারের নির্বাচন অনন্য এবং অবিস্মরণীয়। এবারই যুক্তরাষ্ট্রে প্রথম কোনো নারী ভাইস প্রেসিডেন্ট হয়েছেন কমলা হ্যারিস। তিনি একইসঙ্গে প্রথম এশিয়ান ও কৃষ্ণাঙ্গ নারী হিসেবে ইতিহাসে জায়গা করে নিয়েছেন।
আরো একটি কারণে এবারের নির্বাচন ঐতিহাসিক। সাধারণত বেসরকারিভাবে ফল ঘোষণার পর পরাজিত প্রার্থী হার মেনে বিজয়ীকে অভিনন্দন জানান। শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন। এই প্রথা যুক্তরাষ্ট্রের গণতন্ত্রের সৌন্দর্য। যা সারা বিশ্বে সম্মানের চোখে দেখা হয়। কিন্তু দীর্ঘদিন পর প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই প্রথা মানতে রাজি হননি। বরং তিনি বলেছেন, ভোট গণনা নিয়ে দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ে যাবেন। তার প্রচারণা টিমের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, লড়াই এখনো শেষ হয়নি। আইনি যুদ্ধ সোমবার থেকে শুরু হবে। প্রসঙ্গত, ট্রাম্প নির্বাচনের আগে থেকেই প্রমাণ ছাড়া ভোট কারচুপির অভিযোগ করে আসছেন। তার আইনি লড়াইয়ে এই ঐতিহাসিক নির্বাচনের ফল কোন দিকে গড়ায় সেটাই এখন দেখার অপেক্ষায় বিশ্ব।
ইত্তেফাক/জেডএইচডি
