রাজশাহীতে হঠাৎ টিএসপি সারের দাম দ্বিগুণ হয়েছে। ফলে বিপাকে পড়েছেন আলু চাষিরা। সার ব্যবসায়ীরা বলছেন, চাহিদার তুলনায় সরকারি বরাদ্দ কম থাকায় টিএসপি সারের ঘাটতির আশংকা দেখা দিয়েছে। ইতোমধ্যে সরকার নির্ধারিত দামের প্রায় দ্বিগুণ দামে বিক্রি হচ্ছে টিএসপি। তারপরও চাহিদামত পাওয়া যাচ্ছে না টিএসপি। আলু উৎপাদনের বৃহত্তম রাজশাহী জেলায় টিএসপির দাম বাড়ায় সংশ্লিষ্টদের দুষছেন কৃষকরা।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, এবার রাজশাহী জেলায় আলু চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৩৫ হাজার হেক্টর (প্রায় ২ লাখ ৬২ হাজার ৫শ’ বিঘা)। আলুর জমি প্রস্তুতকালেই চাষিরা প্রতিবিঘা জমিতে এক বস্তা টিএসপি সার দিয়ে থাকে। সেক্ষেত্রে এই জেলায় শুধুমাত্র আলু চাষেই টিএসপি সারের প্রয়োজন প্রায় ২ লাখ ৬২ হাজার ৫শ’ বস্তা (প্রতি বস্তায় ৫০ কেজি)।
অথচ এ জেলায় সারা বছরের টিএসপির সরকারি বরাদ্দ ৮ হাজার ৪১৮ টন। অর্থাৎ এক লাখ ৬৮ হাজার ৩৬০ বস্তা। এতে আলু চাষেই টিএসপি সারের ঘাটতি থাকছে ৯৪ হাজার ১৪০ বস্তা। আবার এ জেলায় ডিএপি সারের বরাদ্দ বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু বাজারে টিএসপির সাথে সাথে ডিএপি সারেরও দাম বেড়েছে বলে অভিযোগ কৃষকদের। একদিকে বরাদ্দ কম এবং অন্যদিকে চাহিদা থাকায় প্রায় দ্বিগুণ দামে বিক্রি হচ্ছে টিএসপি সার। আবার টিএসপির পাশাপাশি ডিএপিও চাহিদা মত পাওয়া যাচ্ছে না।
সূত্র জানায়, রাজশাহীতে ধানের পরেই আলুর আবাদ হয়। এবার মৌসুমের শুরু থেকেই আলু দাম ভাল। উপরন্তু করোনা ও অতিবৃষ্টির কারণে বছর জুড়েই আলুর দাম চড়া। এতে আলু ব্যবসায়ী ও কৃষকেরা খুশি। কৃষি বিপণন বিভাগ বেধে দিয়েও আলুর দাম নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি। এ অবস্থায় বপনের মৌসুম শুরু হওয়ায় আলু বীজের পাশাপাশি টিএসপি ও ডিএপি সারের দাম বাড়ায় সংকটে পড়েছে কৃষক।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বাজারে সর্বোচ্চ এক হাজার টাকার টিএসপির বস্তা বর্তমানে বিক্রি হচ্ছে ১৫শ’ থেকে সাড়ে ১৬শ’ টাকায়। ডিএপিও বিক্রি হচ্ছে বেশি দামে। আলু, পেঁয়াজ, রসুনসহ রবি মৌসুমের চাষিরা বিপাকে পড়েছে সার নিয়ে। এ সুযোগে ডিএপি সারের দামও বাড়িয়েছেন অসাধু ব্যবসায়ীরা।
মোহনপুরের মৌগাছির নুড়িয়াক্ষেত্র এলাকার বাণিজ্যিক আলু চাষি মোবারক হোসেন। তিনি ১৫ বছর ধরে বাণিজ্যিকভাবে আলু চাষ করছেন। এবারো ৫০ বিঘা জমিতে আলু চাষ করবেন। তিনি জানান, চাহিদা মত পর্যাপ্ত বরাদ্দ না থাকায় এবারে টিএসপি সারের দাম বেড়েছে। এছাড়া সার না পাওয়ার অজুহাতে ডিএপিসহ অন্যান্য সারের দামও বাড়িয়ে বিক্রি করছেন ডিলারগণ। তবু চাহিদা মত পাওয়া যাচ্ছে না। সারের অভাবে বীজ রোপণ করতে না পারলে আলুর মৌসুমেও দাম কমবে না।
মৌগাছি গ্রামের আলু চাষি নুরুল ইসলাম বলেন, টিএসপির পাশাপাশি ডিএপি সারও প্রতিবস্তা ১১ টাকা দামে বিক্রি হচ্ছে। ডিলারের দোকানে সরকারি দামের ফর্দ টাঙ্গানো থাকলেও সার পাওয়া যাচ্ছে না। এ নিয়ে তিনি দুশ্চিন্তায় দিন কাটাচ্ছেন। তিনি খুব দ্রুত টিএসপি ও ডিএপি’র বরাদ্দ বাড়িয়ে সরবরাহের আবেদন করেন। নইলে সারের প্রাপ্যতার জন্য আলু চাষ ব্যাহত হবে আশংকা করছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ডিলার বলেন, টিএসপি সারের এমনিতেই বরাদ্দ কম। কিন্তু এই জেলার বেশীরভাগ আলু চাষি প্রতি বিঘা জমিতে এক বস্তা টিএসপি, এক বস্তা ডিএপি এবং ১-২ বস্তা এমওপি দিয়ে থাকেন। সেই ক্ষেত্রে বিশেষ করে টিএসপির ঘাটতি হবেই। তিনিও বেশী বরাদ্দের দাবি জানান।
পবা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শারমিন সুলতানা বলেন, গতবছরের চেয়ে এবার প্রায় অর্ধেক বরাদ্দ টিএসপি সারের।
সেক্ষেত্রে ডিএপির বরাদ্দ বাড়িয়েছে। কিন্তু আলু চাষে টিএসপি সার বেশি ব্যবহার হয়। একদিকে বরাদ্দ কম এবং অন্যদিকে একসাথে রোপণের ফলে কিছুটা ঘাটতি দেখা দিতে পারে। এসব সারে বেশি দাম নিচ্ছেন ডিলারগণ-এমন প্রশ্নের জবাবে বলেন, আমরা প্রতিনিয়তই মনিটরিং করছি। তবে চাহিদা থাকায় দু’একটি ঘটনা অস্বাভাবিক নয়।
রাজশাহী ফার্টিলাইজার এসোসিয়েশনের সভাপতি ওছমান আলী ও সাধারণ সম্পাদক রবিউল ইসলাম বলেন, শুধু টিএসপি, ডিএপি নয়, কোনো ধরণের রাসায়নিক সার সরকার নির্ধারিত দামের বেশি নেয়ার এখতিয়ার নাই ডিলারের। বিসিআইসি ডিলারগণ সরকার নির্ধারিত দামের বেশিতে সার বিক্রি করলে লাইসেন্স বাতিল হবে। তবে খুচরা বিক্রেতারা বেশি দাম নিলে তাদের কিছু করার নেই।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, রাজশাহীর উপপরিচালক শামছুল হক বলেন, আলু চাষে বিখ্যাত রাজশাহীতে আবাদ মৌসুমে সার নিয়ে কিছুটা বিড়ম্বনা হয়। এর কারণ বেশিরভাগ চাষিই একসাথে সার কিনেন। এবার রাজশাহীতে টিএসপির বরাদ্দ কমিয়ে ডিএপির বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে। অনেক চাষি মনে করেন ডিএপি দিলে আলুর শিকড় পচে যেতে পারে, এই ধারণাটি আসলে ভুল। তারা টিএসপির দাম বৃদ্ধির বিষয়টি খতিয়ে দেখছেন।
ইত্তেফাক/এসআই
