করোনা ভাইরাস থাবা বসিয়েছে জাহানারা খাতুনের জীবিকায়। সিরাজগঞ্জ জেলার রায়গঞ্জ পৌরসভা এলাকার এই জয়িতা অর্থনৈতিকভাবে ছিলেন স্বাবলম্বী। বিধবা মা, দুই বোনসহ চার সদস্যের পরিবার তার। দর্জির কাজ ও নকশিকাঁথা তৈরি করে ভালোভাবেই চলত তাদের সংসার। কিন্তু, করোনাকালে কেউ আর আগের মতো পোশাক বানাতে আসে না। আর তৈরি পোশাক নিয়ে কারো বাড়িতে যাওয়াও হয় না। ফলে আয়-রোজগারে ভাটা পড়ায় কষ্টে আছেন তিনি ও তার পরিবার।
কথা হলে কর্মক্ষেত্রে নানা সংকটের কথা জানান রায়গঞ্জ উপজেলার আটঘরিয়া গ্রামের জয়িতা ময়না খাতুন, আমশড়া গ্রামের সারথী মাহাতো, ক্ষিরিতলা গ্রামের গীতা রানী মাহাতো এবং পশ্চিম মথুরাপুর গ্রামের মমতা খাতুনও। এ সংকট করোনার কারণে সৃষ্টি হয়েছে।
জানা গেছে, করোনার কারণে অনেক জয়িতা নানা প্রতিকূলতায় অর্থনৈতিক সংকটে পড়ে নানামুখী সমস্যায় ভুগছেন। দীর্ঘ সংগ্রামী জীবনে অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছাতে কোথাও থামতে হয়নি তাদের। কিন্তু, করোনা তাদের বিজয়রথে নানাভাবে প্রতিকূলতা সৃষ্টি করেছে। এতে ঝিমিয়ে পড়েছে তাদের রুটি-রুজির নিত্যনৈমিত্তিক কর্মযোগ।
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, দেশের মোট ৪ হাজার ৫৩৫টি ইউনিয়ন পর্যায়ে মনোনীত জয়িতা মোট ৮ হাজার ২৪২ জন। ৪৮৫টি উপজেলা পর্যায়ে মনোনীত জয়িতা ২ হাজার ৩১৭ জন। ৬৪ জেলায় জয়িতা মোট ৩২০ জন। ঢাকা বিভাগে ১৭টি জেলায় সম্মাননাপ্রাপ্ত জয়িতা ৮৫ জন, চট্টগ্রাম বিভাগে ১১টি জেলায় ৫৫ জন, রাজশাহী বিভাগে ৪০ জন, খুলনা বিভাগে ৫০ জন, সিলেটের চারটি জেলায় ২০ জন, বরিশাল বিভাগে ৩০ জন ও রংপুর বিভাগে ৪০ জন জয়িতা রয়েছেন।
সূত্র জানায়, একজন সংগ্রামী, অপ্রতিরোধ্য সফল নারীর প্রতীকী নাম জয়িতা। নারীর আর্থসামাজিক উন্নয়ন ও ক্ষমতায়নের মূর্ত প্রতীক জয়িতা। জয়িতারা বাংলাদেশের নারীদের জন্য বাতিঘর। জীবন সংগ্রামে প্রতিটি ঘাত-প্রতিঘাতে উদয়-অস্ত যুদ্ধ করে যারা জয়িতা হিসেবে নিজেদের সগৌরবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।
সরেজমিন উত্তরবঙ্গের চার জেলা সিরাজগঞ্জ, পাবনা, নাটোর ও বগুড়া ঘুরে ভুক্তভোগীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে অনেক অপ্রকাশিত তথ্য। কথা হয় সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলার তাড়াশ থানাপাড়ার জয়িতা ফাতেমাতুজ্জোহরা, একই উপজেলার ওয়াশীন গ্রামের জাহানারা বেগম, গুড় পিপুল গ্রামের ননীবালা রাণী সরকার, তাড়াশ গ্রামের মালিহা হোসেন এবং কনিকা রাণী সাহার সঙ্গে।
কনিকা রাণী জানান, তিনি সমাজে বিভিন্ন সমস্যাগ্রস্তদের সার্বিক সেবা ও সহযোগিতার পাশাপাশি স্বামীর ব্যবসার কাজে সহযোগিতা করে থাকেন। তার স্বামী রেণু পোনার ব্যবসা করেন। করোনায় সে ব্যবসা থমকে গেছে। আগের মতো আর পাইকাররা আসে না। এতে তাদের কষ্টে কাটছে দিন।
কথা হয় বগুড়া জেলার শেরপুর উপজেলার সব ক্যাটাগরির জয়িতাদের সঙ্গে। এরা হলেন—মজিদা বেগম, শ্যামলী খাতুন, কাকলী ভট্টাচার্য, রুখসানা খাতুন ও নূরজাহান খাতুন। নাটোরের সিংড়া উপজেলার জয়িতা রওশনা মাহমুদ, সোনালী খাতুন, লায়লা জেসমিন, বেবী নাসরিন ও পারভীন বেগমের সঙ্গেও কথা হয়।
আরও পড়ুন: টাকা দিলেই বানানো যায় মানসিক রোগী!
পাবনার চাটমোহর উপজেলার চক উথলি গ্রামের জয়িতা রোজিনা খাতুন জানান, মেয়ে, মা, স্বামী পরিত্যক্তা বোন ও তার মেয়েসহ পাঁচ সদস্যের পরিবার তার। বাড়িতে রাতে দর্জির কাজ ও দিনে বিউটি পার্লারে কাজ করে সবকিছু ঠিকঠাকই চলছিল। কিন্ত করোনার কারণে এখন তিনি মারাত্মক সমস্যাগ্রস্ত। আগের মতো দর্জির কাজ নেই আর অনেক কষ্টে গড়ে তোলা বিউটি পার্লারটিও বন্ধ রয়েছে। এছাড়াও বোথর গ্রামের জয়িতা লায়লী বেগম, জালেশ্বর গ্রামের আগমনী চক্রবর্তী, মথুরাপুর গ্রামের সাইফুন্নাহার খাতুন, ইদিলপুর গ্রামের নাজমা খাতুন। তারা জানান, কেউই আগের মতো ভালো নেই।
এ ব্যাপারে ‘জয়িতা অন্বেষণে বাংলাদেশ’-এর উপ-পরিচালক ফরিদা খানম জয়িতাদের করোনাকালে কোনো প্রকার সহায়তা না দেওয়ার কথা স্বীকার করে ইত্তেফাককে বলেন, আগে জাতীয় পর্যায়ে পাঁচ জন জয়িতাকে ৫০ হাজার টাকা করে মোট আড়াই লাখ টাকা পুরস্কার প্রদান করা হতো। এবার জাতীয় পর্যায়ে প্রত্যেককে ১ লাখ টাকা করে দেওয়া হবে। আর জেলা পর্যায়ের জয়িতাদের ১০ হাজার টাকা করে পুরস্কার প্রদান করা হবে। তবে উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে জয়িতাদের বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়নি বলে তিনি জানান।
ইত্তেফাক/এসি
