সত্য-মিথ্যা-গুজব

সত্য-মিথ্যা-গুজব

আপডেট : ১১ নভেম্বর ২০২০, ১০:০১

প্রত্যেক মানুষই কমবেশি মিথ্যা বলে। কেউ প্রয়োজনে বলে, কেউ আবার মনের আনন্দে বলে। তবে বিনা কারণে, বিনা প্রয়োজনে নির্বিকারভাবে মিথ্যা কথা বলে, এমন লোকও আমাদের সমাজে কম নেই। কেউ কেউ অহংকার করার জন্য মিথ্যা কথা বলে। অফিসের বসরা যেমন বলে থাকেন, আমার চেয়ে ভালো ইংরেজি এ অফিসে একজনও জানে না। কিংবা কাজে ফাঁকি দেওয়া আমার ডিকশনারিতে নেই।

আমাদের বন্ধুবান্ধবও বিস্তর মিথ্যা বলে। অনেকেই আছে, যারা বঙ্গবাজার থেকে আনকোরা এক মাল গায়ে চাপিয়ে বলে, এটা আমার আংকেল নিউ জার্সি বা আন্টি ‘এলে’ (লস অ্যাঞ্জেলেস) থেকে পাঠিয়েছেন!

অনেকে আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে অথবা জয়েন্ট ইন্টারোগেশন সেলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের জেরায় জর্জর হয়ে মিথ্যা কথা বলে। দেরি করে অফিসে পৌঁছে ঊর্ধ্বতনের কাছে, রাতে দেরি করে বাসায় ফিরে বউয়ের কাছে মিথ্যা কারণ দেখানোরও অনেকের প্রয়োজন পড়ে।

স্কুলের ক্লাসে ছাত্রছাত্রীরা মিথ্যা বলবে কিংবা অফিসে বসের কাছে কনিষ্ঠ সহায়ক অসত্য অজুহাত দেবে কাজ না করার, এতে আশ্চর্যের কিছু নেই। বাড়ির কাজের লোক বাজার করে এসে সত্যি হিসাব দেবে, কিংবা লম্পট স্বামী-স্ত্রীর কাছে সত্য বিবৃতি দেবে, এরকম আশা করাটাও অন্যায়। এগুলোর তবু কার্যকারণ আছে। এসব মিথ্যা ভাষণের প্রয়োজন বোঝা কঠিন নয় এবং যে মিথ্যা বলছে তার কাছে এর প্রয়োজনও রয়েছে। কিন্তু এর বাইরে এক ধরনের প্রয়োজনহীন মিথ্যা কথা আছে। মনের আনন্দে নির্দ্বিধায় উলটোপালটা ডাইনে-বাঁয়ে মিথ্যা বলা অনেকের স্বভাব এবং বলতে না পারলে তারা দম বন্ধ হয়ে পেট ফেটে মরে যাওয়ার অবস্থায় পৌঁছে যায়। ডাকটিকিট জমানো ও পুরোনো মুদ্রা সংগ্রহের মতো অনেকের হবি হচ্ছে মিথ্যা বলা। তবে এসব মিথ্যা খুবই সাধারণ এবং নির্দোষ। এ ধরনের মিথ্যা কারো কোনো ক্ষতির কারণ হয় না। স্রেফ গল্প দেওয়ার জন্যই তারা এ ধরনের মিথ্যা চর্চা করে থাকে। যেমন কবে কোথায় কোন মেয়ে তার প্রেমে পড়েছিল, কবে একদিন একাই দুই ছিনতাইকারীকে পাকড়াও করেছিল—এসব মিথ্যাচার কারো কোনো ক্ষতির কারণ হয় না।

‘সদা সত্য কথা বলিবে’, ‘মিথ্যা বলা মহাপাপ’—এ কথাগুলো জীবনের একদম শুরুতে, শিশুকালেই আমাদেরকে শেখানো হয়। কারণ, মিথ্যা মানেই বিভ্রান্তি, ছলনা। মিথ্যার বিভীষিকা সম্পর্কে বলতে গিয়ে প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছিলেন, ‘মিথ্যারও মহত্ত্ব আছে। হাজার হাজার মানুষকে পাগল করে দিতে পারে মিথ্যার মোহ। চিরকালের জন্য সত্য হইয়াও থাকিতে পারে মিথ্যা’ (পুতুল নাচের ইতিকথা)। ধর্মীয় দৃষ্টিকোণে দেখতে গেলে, প্রায় প্রতিটি ধর্মগ্রন্থে মিথ্যা বলতে নিষেধ করা হয়েছে। নীতিগতভাবে ভাবতে গেলেও, মানবজীবনে মিথ্যার গ্রহণযোগ্যতা নেই। তবুও, জীবনের নানা ক্ষেত্রে অনেকেই ছোটখাটো মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে থাকেন। সুযোগসন্ধানীরা স্বার্থ-সুবিধা ও প্রয়োজনমতো ঠিকই মিথ্যাচর্চা অব্যাহত রেখেছে।

সত্য কথা বলে ফায়দা হাসিল হয় না। এ জগতে যে যত স্বার্থপর, লোভী, ভণ্ড, ধান্দাবাজ, দুই নম্বর—তার তত বেশি মিথ্যা কথা বলতে হয়। সব দুই নম্বরি মিথ্যা দিয়ে ঢাকতে হয়। জ্ঞানী-গুণীরাও বিষয়টি অনুধাবন করেছেন। তাই তারা সত্য বলার ব্যাপারে নমনীয় মনোভাব দেখিয়েছেন। ‘সদা সত্য কথা বলিবে’ এই মহত্ উপদেশ বাক্য সব সময় গ্রাহ্য নয়। প্রকৃত জ্ঞানীরা বলেছেন, অপ্রিয় সত্য কথা বলবে না। হয়তো জ্ঞানীদের রুচি ও বিবেকে বেঁধেছিল, তাই তারা সরাসরি বলতে পারেননি, ‘প্রিয় মিথ্যা কথা বলো’।

বিদেশি প্রবাদ আছে, যে মিথ্যা কথা কাউকে সান্ত্বনা দেয়, সুখী করে, সে অনেক ভালো যে সত্য কথা কাউকে আঘাত করে, আহত করে তার চেয়ে। এসব তত্ত্বকথা আপাতত থাক। আমরা বরং এ বিষয়ে আমাদের অভিজ্ঞতা নিয়ে আলোচনা করি। বর্তমান জমানায় চারদিকে মিথ্যারই জয়জয়কার। বর্তমানে শিক্ষার্থী, চাকরিজীবী, প্রেমিক-প্রেমিকা, পুলিশ, আমলা, ব্যবসায়ী, শিল্পপতি, রাজনীতিবিদ ও মন্ত্রীরা তো মিথ্যা বলেনই; এমনকি ধর্মগুরুরা পর্যন্ত মিথ্যা কথা বলেন। তবে মিথ্যা বলার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক নেতানেত্রীরা আপসহীন ও অপ্রতিদ্বন্দ্বীতে পরিণত হয়েছে। স্বার্থ হাসিলের জন্য, দায় এড়াতে (পিঠ বাঁচাতে) এবং প্রতিপক্ষকে ফাঁসাতে এমন মিথ্যা চর্চা পৃথিবীর ইতিহাসে অন্য কেউ কখনো করেছে কি না সন্দেহ।

মিথ্যা আসলে সত্যের অনুপস্থিতি। মিথ্যার এক ব্যক্তিগত রূপ আছে, ব্যক্তি মানুষ তার নিজের স্বার্থ বজায় রাখতে মিথ্যা বলে, সেই মিথ্যা গোষ্ঠীতেও সংক্রমিত হয়, না বুঝেই। আবার মিথ্যার এক অসুস্থতার রূপ আছে, সেখানে মানুষ মিথ্যা বলতেই থাকে, তার চারপাশের মানুষ জানে যে সে মিথ্যা বলছে, সেও জানে যে সবাই বুঝতে পারছে যে সে মিথ্যাই বলছে, কিন্তু বলতেই থাকে। এদেরকে প্যাথলজিকাল লায়ার বলা হয়, দীর্ঘ চিকিত্সার পরেও এ অসুখ সারে না। আর আছে অজ্ঞানতাপ্রসূত মিথ্যা, না জেনেই অসত্য বলে ফেলা।

তবে জেনেশুনে মিথ্যা খুবই অন্যায় শুধু নয়, অপরাধও বটে। তার পরও মিথ্যাচার চলতেই থাকে। যারা দুর্নীতি করেছেন, তারা বলেন আমি নির্দোষ। যারা জঙ্গি সৃষ্টি করছেন, তাদের মদদ দিয়েছেন, তারা বলেন, না ওসব মিথ্যা কথা। আমি মহান। কেউ তার অপরাধ স্বীকার করেন না, হাতেনাতে ধরা পড়লেও না। যাদের যা করার কথা তারা তা করেন না। অথচ নিয়মিত প্রতিশ্রুতি দেন। প্রতিশ্রুতির কথা মনে করিয়ে দিলে অস্বীকার করে বসেন। এভাবে মিথ্যা আর অসত্যের চাদরে সবকিছুকে ঢেকে ফেলা হয়েছে।

ইদানীং মিথ্যা তথ্য বা মিথ্যা সংবাদের ভিত্তিতে এক শ্রেণির মানুষের মধ্যে সাম্প্রদায়িক উসকানি ছড়ানোর প্রবণতা লক্ষ করা গেছে। এটাও একটা গুরুতর অপরাধ। সঠিক তথ্য বা সংবাদ জ্ঞানের উত্স। তাই কোনো বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়ার আগে তথ্য যাচাই করা প্রয়োজন। কারণ, ভুল তথ্যের ওপর নেওয়া সিদ্ধান্তও ভুল হবে এবং এর পরিণতি হবে ভয়াবহ। অসত্য তথ্যের ভিত্তিতে অনেকে উত্তেজিত হয়ে নিরপরাধ ব্যক্তিকে আক্রমণ করে বসে, যা যথাযথ নয়।

অনেকে আবার মানুষের বিশ্বাস নিয়ে খেলতে চায়। আর এই ভয়ংকর খেলার প্রধান বাহন হচ্ছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম। মুক্তবাজার অর্থনীতির সুবাদে বিপ্লব এসেছিল গণমাধ্যমে। আর ২০০০৭-০৮ সালে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সুনামি আসে। গোড়ায় ইয়াহু মেসেঞ্জার, অরকুট, পরে ফেসবুক, টুইটার। হাতে-হাতে স্মার্টফোন চলে আসা আর ডেটার দর তলানিতে চলে যাওয়ার পরে ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, টুইটার, টিকটক এখন অনেকের প্রতিমুহূর্তের সঙ্গী। খরচ কমে যাওয়ায় ওয়েবসাইটও বেড়েছে হুহু করে। ফলে খবরের এখন হাজার উত্স।

আর ঠিক এখানেই বাধছে গোল। বহু সময়েই স্বার্থগোষ্ঠী তৈরি হচ্ছে। তারা নিজেদের মতো নানা খবর তৈরি করছে। সত্য-মিথ্যা মিশিয়ে, আবার অনেক সময়ে নিখাদ মিথ্যা সামাজিক মাধ্যম মারফত ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। জেটগতির যুগে মানুষ সেসব যাচাই না করেই গোগ্রাসে গিলে চলেছে। অনেক সময়ে সাধারণ মানুষের কাছে যাচাইয়ের উপায়ও থাকে না। দ্রুত ‘ফরোয়ার্ড’ বা ‘শেয়ার’ হতে-হতে সেসব ছড়িয়ে পড়ে।

একজন প্রবাসী ব্যক্তির ফেসবুক পোস্টের জেরে কিছু দিন আগে কুমিল্লার মুরাদনগরে বেশ কিছু বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। এর আগে রামু, নাসিরনগর, গোবিন্দগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে এমন ফেসবুক পোস্টের জের ধরে ব্যাপক হিংসার পরিবেশ তৈরি করা হয়েছিল। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছেলেধরার গুজব ছড়িয়ে পড়ার ফল যে কত ভয়ংকর হতে পারে, তা অনেকেই জানেন। বহু প্রান্তিক মানুষকে ছেলেধরা সন্দেহে প্রাণ দিতে হয়। অনেক ক্ষেত্রে আবার এক সম্প্রদায়ের মানুষের প্রতি অপর সম্প্রদায়ের বিদ্বেষ উদ্রেক করাই থাকে লক্ষ্য। তাতে বিপুলসংখ্যক মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

মিথ্যা বলে, মিথ্যা খবর রটিয়ে করোনা মহামারির এই দুর্দিনেও যারা আপনার-আমার বিশ্বাস নিয়ে খেলা করতে চায়, এই দুর্দিনেও যারা সাম্প্রদায়িকতার বিষ ছাড়াতে চায় তাদের চিহ্নিত করুন, তাদের মুখোশ খুলে দিন, বাংলার ইতিহাসে তারা মিরাজাফর জগত্ শেঠ, উমিচাঁদ হয়ে থেকে যাক!

লেখক: রম্যরচয়িতা

ইত্তেফাক/জেডএইচডি

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন