শুধু আইন দিয়েই কি যৌতুক বন্ধ করা সম্ভব?

আপডেট : ২৫ নভেম্বর ২০২০, ২১:৩৮

যৌতুক একটা সময় একটা নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু এখন এটা উচ্চবিত্ত থেকে নিম্নবিত্ত সব জায়গায় ছড়িয়ে পড়েছে। ধারা ২ (খ) যৌতুক :যৌতুক অর্থ বিবাহে এক পক্ষ দ্বারা অন্য পক্ষের কাছে বৈবাহিক সম্পর্ক তৈরি করার জন্য পূর্বশর্ত হিসেবে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে পণ দাবি করাকে বুঝায়। তবে মুসলিম ধর্মের দেনমোহর বা আত্মীয়-স্বজনদের দেওয়া উপহার যৌতুক হিসেবে ধরা হবে না।

যৌতুক কতটা ভয়ংকর তার একটা রূপরেখা আমরা দেখি :গত বছরের ২৮ সেপ্টেম্বর মুনা আক্তার হত্যায় আদালতকে দেওয়া পুলিশের প্রতিবেদন বলছে, সাত/ আট মাস আগে মুনার সঙ্গে পারভেজের বিয়ে হয়। বিয়ের পর থেকে পারভেজ মুনাকে চাপ দিতে থাকে যৌতুকের ৪ লাখ টাকা এনে দেওয়ার জন্য। ঘটনার দিন মুনাকে প্রথমে লোহার পাইপ দিয়ে পেটানো হয় এবং পরে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়। বর্তমান সময়েও যৌতুকের জন্য এ যেন এক মধ্যযুগীয় বর্বরতার চিত্র।

যৌতুক নিরোধ আইন ২০১৮ :এই আইনের অধীনে সংঘটিত অপরাধ আমলযোগ্য, জামিন অযোগ্য এবং আপসযোগ্য হবে। ধারা ৩ :কেউ যদি প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যৌতুকের দাবি করেন তবে তা হবে এই আইনের অধীনে একটি অপরাধ এবং সেজন্য তিনি অনধিক পাঁচ বছর এবং অন্যূন এক বছর বা অনধিক ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডনীয় হবে। ধারা ৪ :কেউ যদি যৌতুক প্রদান, গ্রহণ কিংবা গ্রহণে সাহায্য করে তাহলে তাকে অনধিক পাঁচ বছর কিন্তু অন্যূন ১ বছর বা অনধিক ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডনীয় হবে। ধারা ৬ :যদি কোনো ব্যক্তি এই আইনের অধীনে মিথ্যা মামলা করেন, তাহলে তাকে অনধিক পাঁচ বছর কারাদণ্ড বা অনধিক ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডনীয় হতে হবে। যারা আইনের অপব্যবহার করে মিথ্যা মামলা করেন তাদেরও শাস্তির বিধান আছে। কিছু মানুষ (পুরুষ-নারী-নির্বিশেষে) সব সময় ছিল, আছে এবং থাকবে যারা সুযোগের অপব্যবহার করেছে, করে এবং করবে। তাহলে ভুক্তভোগীদের জন্য প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা কী? দোষী প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত কাউকে অপরাধীর তকমা লাগিয়ে দেওয়া কিংবা সমাজের চোখে ছোট করে দেওয়া, আদৌ কাম্য হতে পারে না। ফৌজদারী মামলা বিচারের ক্ষেত্রে প্রধান ও মূলনীতি হলো সাক্ষী-প্রমাণ দ্বারা দোষীসাব্যস্ত না হওয়া পর্যন্ত আসামিকে নির্দোষ ধরে নেওয়া হবে। নারী নির্যাতন দমন আইন ২০০০ :ধারা ১১ (ক) :যৌতুকের জন্য মৃত্যু ঘটানো বা মৃত্যু ঘটানোর চেষ্টা করলে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডনীয় হবে। ১১ (খ) মারাত্মক জখম করার জন্য যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড অথবা অনধিক ১২ বছর কিন্তু অন্যূন পাঁচ বছর সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডনীয় হবে এবং অর্থদণ্ডে দণ্ডনীয় হবে। (গ) সাধারণ জখম করার জন্য অনধিক তিন বছর এবং অন্যূন এক বছর সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডনীয় হবে এবং অর্থদণ্ডে দণ্ডনীয় হবে।

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ সংগঠনটি বলছে, গত ২০১২-২০১৭ পর্যন্ত যৌতুকের জন্য হত্যার শিকার হয়েছেন ১ হাজার ১৫১ জন নারী। ২০১৮ সালে এই সংগঠনটি বলছে ১০২ জন নারীকে যৌতুকের কারণে হত্যা করা হয়েছে। বাংলাদেশ পুলিশের তথ্য অনুযায়ী গত দুই বছরে ৬ হাজার ৭২৮টি যৌতুকের মামলা হয়েছে। যদিও আসক বলছে, যৌতুকের কারণে নির্যাতনের ঘটনায় মামলা কম হচ্ছে। আমাদের সমাজে মেয়েদের যেভাবে দেখা হয় তার দৃষ্টিভঙ্গি বদলায়নি, যৌতুক দেওয়া-নেওয়া এখনো সমাজে প্রচলিত আছে। বাংলাদেশে যৌতুক বিরোধী আইন আছে। কিন্তু এর তোয়াক্কা করছে না। আমাদের দেশে ৮৭ ভাগ মেয়ে পারিবারিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। এর সিংহ ভাগই হচ্ছে যৌতুকের কারণে। এটা পরিসংখ্যান ব্যুরোর রিপোর্টে উঠে এসেছে। শুধু আইন দিয়ে এই অবস্থার পরিবর্তন সম্ভব নয়। এর জন্য দরকার অবশ্যই নারীদের শিক্ষিত করে তোলা, তাদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন করে তোলা, অর্থনৈতিক সচ্ছলতা এবং আইনের সুষ্ঠু প্রয়োগ। তবেই নারী নির্যাতন থেকে মুক্তি পাবে বলে আশা করছি।

n লেখক :শিক্ষার্থী, আইন বিভাগ, আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি-বাংলাদেশ (AIUB)