পুলিশের ঊর্ধ্বতনরা আন্তরিক হলেও থানায় উলটো চিত্র

আপডেট : ০৬ ডিসেম্বর ২০২০, ০৩:১৮

দেশে পুলিশের যেমন সুনাম আছে, তেমনি দুর্নামও আছে। সুনামের ধারা ধরে রাখতে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের আন্তরিকতার কোনো কমতি নেই। তবে থানার চিত্র উলটো। সেখানে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে সুনামের চেয়ে দুর্নামই বেশি। থানায় জিডি করতে গেলেই টাকা লাগে। মামলার বাদী-বিবাদী উভয়ের কাছ থেকেই টাকা নেওয়া হয়। টাকা ছাড়া থানায় তো সেবা মেলেই না, উপরন্তু পুলিশের দ্বারা প্রায়শই হয়রানির শিকার হচ্ছে সাধারণ মানুষ।

তবে পুলিশের অনেক কার্যক্রম প্রশংসাও কুড়াচ্ছে। বিরাজমান করোনা পরিস্থিতিতে সম্মুখযোদ্ধা হিসেবে বাংলাদেশের পুলিশ সদস্যদের ভূমিকা সারা দেশে বেশ প্রশংসিত হচ্ছে। প্রসূতিকে হাসপাতালে পৌঁছে দিচ্ছে পুলিশ। করোনায় মৃত রোগীকে দাফন করাচ্ছে পুলিশ। এই দুর্যোগকালে বাংলাদেশ পুলিশ মানবিকতার যে উদাহরণ সৃষ্টি করেছে, তা সত্যিই বিস্ময়কর এবং অনুপ্রেরণাদায়ীও। এ কারণে আন্তর্জাতিকভাবেও বাংলাদেশের পুলিশের প্রশংসা করা হচ্ছে। বিদেশি মিডিয়ায় পুলিশের ভালো কাজগুলো স্থান পাচ্ছে। শত বদনাম ঘুচিয়ে জীবন বাজি রেখে, জীবন দিয়ে পুলিশ যে জনগণের বন্ধু, তা তারা প্রমাণ করেছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও পুলিশের প্রশংসা করেছেন। ৯৯৯ নম্বরে ফোন দিলেই পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে যাচ্ছে। তবে থানার পুলিশের কিছু আচরণ সার্বিক অর্জনকে ম্লান করে দিচ্ছে। যদিও থানার ওসি পদে পোস্টিং নিতে থানাভেদে ৪০ থেকে ৫০ লাখ টাকা লাগে। এসআইসহ অন্যদের থানায় পোস্টিং নিতে ঘুষ দিতে হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে থানার পুলিশের মূল টার্গেট থাকে টাকার দিকে। আর ওসি ঘুষের টাকা দেন একশ্রেণির অতিরিক্ত এসপি ও এসপিকে। আর এ ঘুষের টাকার ভাগ দিয়ে থাকেন একশ্রেণির অতিরিক্ত ডিআইজি ও ডিআইজিকে। এ কারণে থানার পুলিশের আচরণ পরিবর্তন হচ্ছে না। রাজশাহীতে এক পুলিশ কর্মকর্তার ঘুষ নেওয়ার ভিডিও বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। ঐ ভিডিওতে জেলার বাগমারা উপজেলার তাহেরপুর পুলিশ ফাঁড়ির সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) হারুনুর রশীদকে প্রকাশ্যে ঘুষ নিতে দেখা যায়। গত বুধবার ঐ ভিডিও ভাইরাল হয়। এর পরপরই তাকে ঐ পুলিশ ফাঁড়ির দায়িত্ব থেকে প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়েছে। তবে টাকা গুনে প্রকাশ্যে ঘুষ নেওয়ার সিসিটিভির ঐ ফুটেজ থেকে করা ভিডিওটি করোনার শুরুতে লকডাউন সময়ের বলে জানা গেছে।

ওসির ওপরে দুই থানার সার্কেলে একজন সহকারী পুলিশ সুপার কিংবা অতিরিক্ত পুলিশ সুপার থাকেন। তার ওপরে পুলিশ সুপার। এসপির সঙ্গে এক জন কিংবা দুই জন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার থাকেন। এসপির ওপরে থাকেন সাত-আটটি জেলা মিলে রেঞ্জের একজন ডিআইজি। এর সঙ্গে কয়েক জন অতিরিক্ত ডিআইজি থাকেন। ডিআইজি ও এসপিরা যদি সঠিকভাবে মনিটরিং করেন, তাহলে থানার পুলিশ দিয়ে মানুষের হয়রানি থাকবে না। এক্ষেত্রে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে বাংলাদেশ পুলিশের ঢাকা রেঞ্জ। ‘ঘুষ লেনদেন, হয়রানি, ডিউটি অফিসারের অসংলগ্ন প্রশ্ন, ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার (ওসি) ভীতিকর আচরণ ও সাধারণ মানুষকে নাজেহাল করা’ এই রেঞ্জের অধীন থানাগুলোয় এসব দৃশ্য তেমন একটা দেখা যায় না। ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তাদের কঠোর মনিটরিংয়ের কারণে ঢাকা রেঞ্জের ৯৬টি থানার দৃশ্য অনেকটাই পালটে গেছে। এ কারণে ঢাকা রেঞ্জকে মডেল হিসেবে গ্রহণ করতে অন্য রেঞ্জগুলোকে নির্দেশ দিয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর। ঢাকা রেঞ্জের অধীনে ১৩টি জেলা, ৯৬টি থানা ও ৪৩টি সার্কেল রয়েছে। দুটি থানা মিলে একটি সার্কেল। গত বছরের সেপ্টেম্বর থেকে ঢাকা রেঞ্জের অধীন থানাগুলোকে কঠোর মনিটরিংয়ের আওতায় আনা হয়েছে। থানায় জিডি বা মামলা করার পর ২৪ ঘণ্টার মধ্যে জিডির কার্বন কপি সার্কেল অফিসে দিতে হয়। একই সঙ্গে তা সার্ভারে দিয়ে দেওয়া হয়। সঙ্গে সঙ্গে সেটা সার্কেল, জেলার এসপি ও রেঞ্জের ডিআইজি অফিসের কর্মকর্তারা দেখতে পান। জিডি ও মামলার ক্ষেত্রে অভিযোগকারী ও তদন্তকারী অফিসারের মোবাইল নম্বর থাকে। ডিআইজি অফিসে একটি সেল আছে। সার্ভারে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী তারা বাদীর সঙ্গে সরাসরি কথা বলেন। হয়রানির শিকার হচ্ছেন কি না, জানতে চান। তদন্তকারী কর্মকর্তা অর্থ চেয়েছেন কি না, কিংবা ভালো ব্যবহার করছেন কি না, সেটাও মনিটরিং করা হয়।

আরো পড়ুন: বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য ভাঙায় জড়িতদের চিহ্নিত করা গেছে : অতিরিক্ত ডিআইজি

সাধারণ মানুষকে সবচেয়ে বেশি হয়রানির শিকার হতে হয় পুলিশ ক্লিয়ারেন্স ও পাসপোর্টের আবেদনের তদন্ত প্রতিবেদন নিয়ে। পুলিশ ক্লিয়ারেন্স এখন অনলাইনে হয়। সার্ভারে তথ্য যাওয়ার পর ডিআইজি অফিস একইভাবে মনিটরিং করে। ডিআইজি অফিস থেকে ফোন করে আবেদনকারীর কাছে জানতে চাওয়া হয়, টাকা লেগেছে কি না। তবে পুলিশ ক্লিয়ারেন্সে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি শাখার স্বাক্ষর লাগে। পাসপোর্টের আবেদনের তদন্তে অনেক সময় লাগত আগে। কিন্তু এখন সব তথ্য সার্ভারে দিয়ে দেওয়ার কারণে দ্রুত হচ্ছে। মনিটরিংয়ে থানার কোনো কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে টাকা নেওয়া, হয়রানি করা ও দায়িত্বে অবহেলার প্রমাণ পাওয়া গেছে। গত জুলাইয়ে দায়িত্বে অবহেলার কারণে ১৮ জন এসআইকে বিভিন্নভাবে শাস্তি দেওয়া হয়েছে। এরপর থেকে দায়িত্বে অবহেলার ঘটনা আর ঘটছে না। ঢাকা রেঞ্জের মডেল অনুসরণ করলে সারা দেশে থানার পুলিশ দিয়ে হয়রানি থাকবে না। অতি সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার মোহা. শফিকুল ইসলাম জনসাধারণের উদ্দেশে বলেন, ‘রাজধানীর কোনো থানায় গেলে যদি কোনো ধরনের হয়রানি করা হয়, তাহলে সরাসরি আমার কাছে চলে আসবেন। আমার দরজা খোলা।’ এই বক্তব্যের পর মহানগর থানায় পরিস্থিতির অনেকটা উন্নতি হয়েছে। কমিশনার নিজেই থানা মনিটরিং করেন।

অবশ্য অনিয়মের কারণে পুলিশের মধ্যে যত ব্যবস্থা নেওয়া হয়, অন্য কোথাও তা হয় না। গত ৯ বছরে ১ লাখ ২০ হাজার ১৯১টি ঘটনায় পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এই হিসাবে বছরে গড়ে ১৩ হাজার ৩৫৪টি ঘটনায় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনীর মহাপরিদর্শক (আইজিপি) ড. বেনজীর আহমেদ বলেন, অপরাধ করলে কোনো ছাড় নেই। পুলিশ সদস্যদের ডোপ টেস্ট করা হচ্ছে। কেউ মাদকাসক্ত প্রমাণিত হলেই চাকরিচ্যুত করা হচ্ছে। সরকারি অন্যান্য অফিসে কিন্তু এ ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না।

ইত্তেফাক/এএএম