বিশ্বব্যাপী এখন আতঙ্কের নাম করোনা ভাইরাস। প্রাণঘাতী এই ভাইরাসের উত্পত্তি চীনের হুবেই প্রদেশের উহান শহর থেকে। সেখান থেকে এখন পর্যন্ত বিশ্বের ১২১টি দেশ ও অঞ্চলে ছড়িয়েও এই ভাইরাসের সংক্রমণ থামছে না। বাড়ছে মৃত্যুর মিছিল ও শনাক্তের সংখ্যাও। ছোঁয়াচে এই রোগের কোনো প্রতিষেধক নেই। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকেরা বলেন, সামনে ভয়াবহ দিন আসছে।
এখন চিকিত্সা সক্ষমতা নয়, জোর দিতে হবে প্রতিকারে। স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলাই করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ থেকে বাঁচার উপায়। মাস্ক পরা, সাবান দিয়ে হাত ধোয়া, সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা, উপসর্গ দেখা দিলে হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকার মধ্য দিয়ে ভাইরাস থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। বাঁচতে হলে এসব স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে। বিশেষজ্ঞদের আগের সতর্কতা অনুযায়ী শীতে রোগী বাড়লে হাসপাতালে সাধারণ বেড পাওয়াই দুষ্কর হবে।
এদিকে অ্যানেসথেসিওলজিস্টের তীব্র সংকটে ভুগছে হাসপাতালগুলো। তাদের ছাড়া আইসিইউ ম্যানেজমেন্ট সম্ভব নয়। প্রয়োজনীয়সংখ্যক অ্যানেসথেসিওলজিস্টের অভাবে অনেক স্থানে মেডিক্যাল অফিসার দিয়ে আইসিইউ ম্যানেজমেন্ট করা হচ্ছে। তাই রোগীরা সুচিকিত্সা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। আইসিইউ ম্যানেজমেন্টের ত্রুটির কারণে রোগী মারাও যাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকেরা বলেন, অ্যানেসথেসিওলজিস্ট ছাড়া অন্য ডাক্তার দিয়ে আইসিইউ ম্যানেজমেন্ট পরিচালনা করা আর হাতুড়ে চিকিত্সা করা একই কথা। এদিকে সারা দেশ থেকে অনেক রোগী ঢাকায় চলে আসছে। তাদের কীভাবে সামাল দেওয়া যাবে, তা নিয়ে চিন্তিত স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।
দেশে করোনা সংক্রমণের হার আগস্টের পর থেকে স্থিতিশীল হলেও সেপ্টেম্বর, অক্টোবর ও নভেম্বরে তা ওঠানামার মধ্যেই আছে। এর আগে মে মাসের পর করোনা সংক্রমণের হার অধিক মাত্রায় বাড়তে থাকে। এক দিনে সর্বোচ্চ সংক্রমণের হার ৩১ শতাংশে দাঁড়ায়। এরপর ১৫ থেকে ২৫ শতাংশের মধ্যে থাকলেও তা কমে ১০ শতাংশের কাছাকাছি আসে। কিন্তু বর্তমানে তা আবারও ১৬ শতাংশের কাছাকাছি। অক্টোবরের প্রথমে সংক্রমণের হার, অর্থাত্ নমুনা পরীক্ষার বিপরীতে শনাক্ত ছিল ১২ দশমিক ৪৯ শতাংশ। এরপর অক্টোবরের শেষে তা দাঁড়ায় ১২ দশমিক ৫০ শতাংশে। নভেম্বরের শুরুতে হার ছিল ১৩ দশমিক ৪৭ এবং শেষে হার ১৪ দশমিক ৭৯। শীতে করোনার সংক্রমণ বাড়বে বলে আগেই সতর্ক করেছিলেন বিশেষজ্ঞরা।
করোনা ভাইরাস মোকাবিলায় গঠিত জাতীয় টেকনিক্যাল পরামর্শক কমিটির সভাপতি অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ সহিদুল্লাহ বলেন, করোনা ভাইরাসের চরিত্র দ্রুত পালটাচ্ছে। ভবিষ্যতে হাসপাতালে নরমাল বেড পাওয়া যাবে কি না, সন্দেহ আছে। এখনই অনেকে সিট পাচ্ছে না।
তিনি বলেন, কোন হাসপাতালে কত বেড খালি আছে, তা প্রতিদিন গণমাধ্যমে প্রচার করা উচিত। কারণ এ ব্যাপারে তথ্য নেওয়ার জন্য যে হেল্পলাইন নম্বর আছে, সেখানে ফোনে পাওয়া যায় না। অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ সহিদুল্লাহ বলেন, হাসপাতালে অ্যানেসথেসিওলজিস্টের সংকট আছে। এক্ষেত্রে ছয় মাসের প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত অনেক অ্যানেসথেসিওলজিস্ট আছেন, যাদের করোনা হাসপাতালে পদায়ন করা যেতে পারে। বিষয়টি টেকনিক্যাল কমিটির পক্ষ থেকে প্রস্তাবও করা হয়েছিল। কারণ অ্যানেসথেসিওলজিস্ট চিকিত্সক ছাড়া আইসিইউ ম্যানেজমেন্ট সম্ভব নয়। কিন্তু অনেক জায়গায় মেডিক্যাল অফিসার দিয়ে আইসিইউ ম্যানেজমেন্ট করা হচ্ছে।
অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ সহিদুল্লাহ বলেন, করোনা ভাইরাস মোকাবিলায় গঠিত জাতীয় টেকনিক্যাল পরামর্শক কমিটির অধিকাংশ প্রস্তাব বাস্তবায়ন করা হয়নি।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত চিকিত্সক অধ্যাপক ডা. এ বি এম আব্দুল্লাহ বলেন, করোনা ভাইরাস থেকে রক্ষা পেতে হলে সবার স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে। প্রতিরোধই উত্তম ব্যবস্থা। রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) উপদেষ্টা ড. মোস্তাক হোসেন বলেন, এখন সক্ষমতা বাড়ানোর প্রয়োজন নেই। এখন প্রতিরোধ করা দরকার। সবার স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে। মাস্ক পরতে হবে। উপসর্গ দেখা দিলে আইসোলেশন ও কোয়ারেন্টাইনে থাকতে হবে। কিন্তু এসব অনেকে মেনে চলছেন না। জ্বর হলে একটা প্যারাসিটামল খেয়ে কাজে চলে যাচ্ছে। হাসপাতালে অ্যানেসথেসিওলজিস্ট সংকট রয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, এই সংকট দ্রুত কাটিয়ে উঠতে হবে।
বাংলাদেশ সোসাইটি অব অ্যানেসথেসিওলজিস্টের সভাপতি এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যানেসথেসিওলজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. দেবব্রত বণিক বলেন, আইসিইউ বেড কোথাও খালি নেই। সরকারি ৩৭০টি আইসিইউ বেড রয়েছে। আর সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে অ্যানেসথেসিওলজিস্ট আছেন ৯৫০ জন। এই সীমিত জনবল দিয়ে আইসিইউ ম্যানেজমেন্ট পরিচালনা কষ্টকর। কারণ একজন অ্যানেসথেসিওলজিস্টের ১৫ দিন ডিউটি করার পর ১৫ দিন কোয়ারেন্টাইনে থাকতে হয়। আবার ঢাকার বাইরে অনেক জেলায় আইসিইউ না থাকায় এখন সবাই ঢাকায় চলে আসছে।
অধ্যাপক ডা. দেবব্রত বণিক বলেন, অ্যানেসথেসিওলজিস্টের অভাবে অনেক হাসপাতালে মেডিক্যাল অফিসার দিয়ে আইসিইউ পরিচালনা করা হচ্ছে। এটা অনেকটা হাতুড়ি চিকিত্সার মতো হচ্ছে। কারণ তাদের অ্যানেসথেসিওলজিস্টের কোনো সাধারণ জ্ঞান নেই। সরকারি, বেসরকারি বিভিন্ন হাসপাতালে কর্মরত অ্যানেসথেসিওলজিস্টদের করোনা হাসপাতালে পাঠানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে বলে অধ্যাপক ডা. দেবব্রত বণিক জানান।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ডিজি) অধ্যাপক ডা. আবুল বাশার মোহাম্মদ খুরশীদ আলম বলেন, করোনা মোকাবিলায় প্রতিরোধের বিষয়ে বেশি জোর দিতে হবে। এ ব্যাপারে জনসচেতনতা বাড়ানো ও রোগীদের সুচিকিত্সা নিশ্চিত করতে প্রতি সপ্তাহে সোম ও বুধবার সারাদেশের সিভিল সার্জন ও বিভাগীয় পরিচালকদের (স্বাস্থ্য) সঙ্গে জুম মিটিং করছেন তিনি।
অ্যানেসথেসিওলজিস্টের সংকটের কথা স্বীকার করে অধ্যাপক ডা. আবুল বাশার মোহাম্মদ খুরশীদ আলম বলেন, সাড়ে ৪০০ ভেন্টিলেটর পড়ে আছে।অ্যানেসথেসিওলজিস্টের অভাবে তা ব্যবহার করা যাচ্ছে না।
অ্যানেসথেসিওলজিস্টের সংকট কাটাতে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, প্রত্যেক জেলা-উপজেলা থেকে আগ্রহী একজন করে মেডিক্যাল অফিসার, যারা অ্যানেসথেসিওলজিস্টের ওপর প্রশিক্ষণ গ্রহণে আগ্রহী তাদের তালিকা পাঠাতে সিভিল সার্জনদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
ইত্তেফাক/বিএএফ
