সাম্প্রতিক সময়ে আন্তর্জাতিক রাজনীতির মঞ্চে মধ্যপ্রাচ্যকে কেন্দ্র করে আবারও নতুন সমীকরণ পরিলক্ষিত হচ্ছে। যেখানে ক্ষমতার শেষলগ্নে এসে ত্বরিতগতিতে অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন। বলার অপেক্ষা রাখে না যে, মধ্যপ্রাচ্যের তেলসমৃদ্ধি দেশগুলো বিশ্ব রাজনীতির অঙ্গনে নিঃসন্দেহে অতিশয় গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর। যেখানে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে প্রভাব বিস্তারে মুখিয়ে থাকে পশ্চিমা বিশ্ব। মূলত, মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতির হিসাব-নিকাশ, যুদ্ধবিগ্রহ, সন্ত্রাসবাদের নব্য উত্থান ও গণতন্ত্রের সংকট নতুন সমস্যা নয়। তবে গত সেপ্টেম্বর মাসে সংযুক্ত আরব-আমিরাত, বাহরাইন ও নতুন করে মরক্কো মধ্যপ্রাচ্যের বিষফোঁড়া নামে পরিচিতি ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার ঘোষণা দেয়। এতে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে ফিলিস্তিনবাসী। নিন্দা প্রকাশ করে ইরান, তুরস্কসহ বেশ কিছু মুসলিম দেশ। তবে এ উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছে মিশর, জর্ডান।
কার্যত, ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনের মধ্যদিয়ে দীর্ঘ দিনের মধ্যপ্রাচ্য সংকট সমাধানে নতুন গতি আসবে বলে আশা প্রকাশ করছে স্বীকৃতি প্রদানকারী দেশগুলো। ইতিমধ্যে সংযুক্ত আরব-আমিরাত ইসরাইলকে নিজ আকাশ সীমা ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছে। আন্তর্জাতি বিশ্লেষকদের অভিমত, এর ফলে মধ্যপ্রাচের সংকট, বিভাজন ও দ্বন্দ্ব আরো বেশি তীব্রতর হবে। দিনদিন ফিকে হয়ে আসবে দীর্ঘদিনের ফিলিস্তিনিদের স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করার লালিত স্বপ্ন। অপরদিকে মধ্যপ্রাচ্যসহ আফ্রো-এশিয়ার ১৬টি মুসলিম দেশের ওপর ক্রমান্বয়ে বাড়বে ইসরাইলকে স্বীকৃতি দেওয়ার চাপ—সে কথা দ্বিধাহীনভাবে অনুমান করা যায়।
বর্তমান মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘমেয়াদি শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে প্রথমে নিজেদের মধ্যে শিয়া-সুন্নি মতবিরোধ বা অঞ্চলিক বিভাজন ভুলে বৃহত্তর স্বার্থে ঐক্যবদ্ধ হওয়া জরুরি। দ্বিতীয়ত, আরব লিগ জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও পরাশক্তি দেশগুলোর সমন্বয়ে একটি শক্তিশালী কমিটি গঠন করা এখন সময়ের দাবি। যারা মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি আনার লক্ষ্যে ক্লান্তিহীন প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখবে এবং নির্দিষ্ট সময় পরপর সার্বিক বিষয় নিয়ে প্রতিবেদন দাখিল করবে। এ ক্ষেত্রে অবশ্যই সৌদি আরব ও যুক্তরাষ্ট্রকে মুখ্য ভূমিকা পালন করতে হবে। তৃতীয়ত, ইসরাইলকে স্বীকৃতি নয় বরং পশ্চিম তীরে অবৈধ বসতি স্থাপনায় ও ফিলিস্তিনিদের ওপরে নির্মম নির্যাতন নিপীড়নের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে। সেই সঙ্গে গাজায় অন্যায্য অবরোধ প্রত্যাহার করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে ইসরাইলকে। চতুর্থত, ফিলিস্তিনে গাজার নিয়ন্ত্রণকারী থাকা হামাস ও পশ্চিম তীর নিয়ন্ত্রণকারী ফাতাহ—এই দুই বৃহত্তর দলকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। যাতে, স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের দাবি বিশ্বদরবারে ও কূটনীতিক মহলে সুনিপুণভাবে উপস্থাপন করা যায়—এছাড়া এর কোনো বিকল্প নেই। পঞ্চমত, যুক্তরাষ্ট্রকে অবশ্যই মধ্যপ্রাচ্যে অস্ত্র বিক্রির কৌশল হতে সরে আসতে হবে। বর্তমান সৌদি সরকারের ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমানের সঙ্গে ইসরাইলের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বিদ্যমান। জোরালো গুঞ্জন আছে, সৌদি আরব ইসরাইলকে নিকট ভবিষ্যতে স্বীকৃতি দেবে। প্রসঙ্গক্রমে মধ্যপ্রাচ্যে সৌদি আরব, ইসরাইল ও সংযুক্ত আরব আমিরাত নতুন জোট গঠনে তত্পর। বলা যায়, এতে কোণঠাসা হবে ইরান এবং তার মিত্ররা। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের অভিমত, স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র ব্যতীত ইসরাইলের সঙ্গে সৌদি আরব কূটনীতিক সম্পর্ক স্থাপন করা হবে আত্মঘাতী। ইসরাইলের নিরাপত্তাবিষয়ক গবেষণা সংস্থা জেরুজালেম ইনস্টিটিউট অব স্ট্রাটেজি অ্যান্ড সিকিউরিটির গবেষক ড. জনাযন স্পায়ার বিবিসি বাংলাকে বলেন, সৌদি আরবের মধ্যে প্রজন্মগত বিরোধ চলছে এবং আনুষ্ঠানিক সম্পর্ক হতে সময় লাগবে। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের অভিমত, নবনির্বাচিত মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন মধ্যপ্রাচ্যের নীতির খুব বেশি পরিবর্তন করবেন—এমনটা ভাবা যায় না। তবে আশার আলো হচ্ছে—তিনি নির্বাচনের পূর্বপ্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ইরানের পারমাণবিক চুক্তিতে ফিরবেন বলে আশ্বস্ত করেছেন। এছাড়া ইয়েমেন যুদ্ধে সৌদি জোটকে অস্ত্র বিক্রির ওপর নিষেধাজ্ঞা আসতে পারে। তবে ইসরাইল ও সৌদি আরবকে আগের মতো আন্তর্জাতিক অঙ্গনে অকুণ্ঠিত সমর্থন প্রদান করা থেকে বিরত থাকবেন জো বাইডেন প্রশাসন—এমনটা অনুমেয়। কিন্তু এতে কৌশলগত সম্পর্কের কোনো পরিবর্তন আসবে না।
লেখক :শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়
ইত্তেফাক/টিআর
