মানিক মিয়া ও ইত্তেফাক

আপডেট : ২৪ ডিসেম্বর ২০২০, ১০:৫১

ভারতে ব্রিটিশ শাসনের শেষ পর্যায়ে আকরম খাঁর আজাদ এবং পাকিস্তান আমলে মানিক মিয়ার ইত্তেফাক জাতীয় ঘটনাপ্রবাহের গতি নির্ধারণে ভালো-মন্দ যেমনই হোক, সুদূরপ্রসারী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। আকরম খাঁ ও মানিক মিয়া গভীর চিন্তা ও দূরদর্শী বিচার-বিবেচনা দ্বারা তাদের পত্রিকার মাধ্যমে জনগণের জন্য যে রাজনৈতিক যাত্রাপথ নির্দেশ করেছিলেন, তত্কালীন বাস্তবতায় তাকেই হয়তো তারা জনগণের জন্য বাস্তবসম্মত সবচেয়ে কল্যাণকর পথ মনে করেছিলেন।

আমার ধারণা, ব্যাবসায়িক উদ্দেশ্যে তারা পত্রিকা করেননি, তাদের আন্তরিক ইচ্ছা ছিল জাতি ও রাষ্ট্রের পুনর্গঠন। আজাদ ও ইত্তেফাক নিয়ে তারা তাদের কাজে আন্তরিক ছিলেন, কোনো চাপে কিংবা কোনো প্রলোভনে তারা তাদের অন্তরের নির্দেশ অনুযায়ী চলা থেকে বিচ্যুত হননি। তাদের চলার পথ নিষ্কণ্টক ছিল না, অনেক ঝড়-ঝাপটা, বিপদ-আপদ ও জেল জুলুম অতিক্রম করে ক্ষয়ক্ষতি স্বীকার করে তাদের চলতে হয়েছে।

ইত্তেফাক ছাড়া পূর্ব পাকিস্তানে প্রবল বাঙালি জাতীয়তাবাদ ছয় দফার বিপুল জনপ্রিয়তা ও আওয়ামী লীগের একচ্ছত্র প্রতিষ্ঠা সম্ভব হতো না। মানিক মিয়া ছিলেন ইত্তেফাকের মালিক ও সম্পাদক। ইত্তেফাক ১৯৪৯ সালে আওয়ামী মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠার পরে সাপ্তাহিক পত্রিকারূপে মানিক মিয়ার সম্পাদনায় প্রকাশিত হয়। তখন এর লোগোর নিচে লেখা থাকত—প্রতিষ্ঠাতা :মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী। ১৯৫৪ সালে ইস্ট বেঙ্গল লেজিসলেচারের নির্বাচন সামনে নিয়ে পত্রিকাটিকে দৈনিকে রূপান্তরিত করা হয়। নির্বাচন ফজলুল হক ও ভাসানী কর্তৃক গঠিত এবং হক-ভাসানী- সোহরাওয়ার্দী কর্তৃক পরিচালিত যুক্তফ্রন্টের রূপায়ণে এবং ফ্রন্টকে জনপ্রিয় করে তোলার কাজে ইত্তেফাক অসাধারণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

১৯৫৭ সালে কাগমারী সম্মেলনের সময় পত্রিকাটি সোহরাওয়ার্দীর পক্ষাবলম্বন করে। নবপ্রতিষ্ঠিত ন্যাপের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের সমর্থনে বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করে মানিক মিয়া ও ইত্তেফাক শেরেবাংলা ফজলুল হকের সমালোচনায়ও সক্রিয় থেকেছে। মানিক মিয়া ছিলেন সোহরাওয়ার্দীর অনুসারী ও ভক্ত। সোহরাওয়ার্দীও মানিক মিয়াকে একান্ত আপনজন মনে করতেন। পূর্ব বাংলার স্বায়ত্তশাসনের বিষয়টিকে মানিক মিয়া পরিপূর্ণ গুরুত্বের সঙ্গে ইত্তেফাকে গ্রহণ করেন সোহরাওয়ার্দীর মৃত্যুর পরে। ছয় দফা আন্দোলনে মানিক মিয়া ইত্তেফাকে ছয় দফাকে যেভাবে সমর্থন দেন, তাতে সরকার নিষেধাজ্ঞা জারি করে ইত্তেফাক বন্ধ করে দেয় এবং মানিক মিয়াকে কারারুদ্ধ করে। সরকার মনে করে, ইত্তেফাক রাষ্ট্র হিসেবে পাকিস্তানকে বিভক্ত করার কাজে লিপ্ত। এরই মধ্যে চলে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা। তারপর ঘটে উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান। আইয়ুব খানের মার্শাল ল জারির ঠিক পরেও মানিক মিয়া কারা নির্যাতন ভোগ করেছিলেন।

সম্পাদকীয় ছাড়াও ইত্তেফাকে মোসাফির ছদ্মনামে ‘রাজনৈতিক মঞ্চ’ শিরোনামে মানিক মিয়ার উপসম্পাদকীয়গুলো ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও কার্যকর। মানিক মিয়া আওয়ামী লীগের কোনো পদে ছিলেন না। এ কথা ঠিক যে, আওয়ামী লীগের মুখপত্ররূপেই ইত্তেফাক এগিয়েছিল। ইত্তেফাক ঐতিহাসিক বাস্তবতার ফল এবং সেই বাস্তবতা অতিক্রম করে সংগ্রাম করেছিল নতুন বাস্তবতা সৃষ্টির লক্ষ্যে।

অবস্থার প্রতিকূলতার কাছে আত্মসমর্পণ না করে ইত্তেফাক চেষ্টা করেছিল অবস্থার নিয়ামক হয়ে ওঠার জন্য। মানিক মিয়ার মালিকানায় ইত্তেফাকের সঙ্গে ছিল সাপ্তাহিক Dacca Times, বাঙালি জাতীয়তাবাদের ধারায় সাময়িকপত্র হিসেবে সিকানদার আবু জাফর সম্পাদিত সমকালও তখন পালন করেছিল গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ভূমিকা। পাকিস্তানের আদর্শগত মূল উত্পাটনে বদরুদ্দীন উমরের লেখাও তখন খুব কার্যকর হয়েছিল। পাকিস্তান আমলে ঢাকাকেন্দ্রিক সংস্কৃতিতে বাঙালি জাতীয়তাবাদের বিকাশে আবুল ফজল আবদুল হক ও আহমদ শরীফের লেখাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল।

পাকিস্তান ও ব্রিটিশ আমলের অবস্থা আজকের অবস্থা থেকে ভিন্ন ছিল। তথ্যপ্রযুক্তি ও জীবপ্রযুক্তির বিস্তার ও সোভিয়েত ইউনিয়নের বিলুপ্তির পর বাস্তবতা গুণগতভাবে বদলে গেছে। নতুন প্রযুক্তি ও শ্রমশক্তির কল্যাণে উত্পাদন ও সম্পদ অনেক বেড়েছে। আগের অভাব-অনটন, ভাত-কাপড়ের অভাব এখন নেই। এর মধ্যে বৈষম্য ও অসাম্য অনেক বেড়েছে। ন্যায় কমেছে এবং অন্যায় বেড়ে গেছে। কায়েমি স্বার্থবাদীদের শক্তি অনেক বেড়েছে, জনগণের শক্তি কমেছে। একটা গণজাগরণের কাল ছিল, এখন জনসাধারণ ঘুমন্ত। জনসাধারণকে ঘুম পাড়িয়ে রাখার কাজে প্রচারমাধ্যমকে ব্যবহার করা হচ্ছে। আগে প্রতিটি প্রচারমাধ্যমের স্বাতন্ত্র্য ছিল। এখন তা খুঁজে পাওয়া যায় না। এখন দেখা যায় পুঁজি যাদের বেশি আছে তারা যতটা পারছে, পুঁজি যাদের কম তারা ততটা পারছে না। আগে বিশ্বব্যবস্থা ছিল দ্বিকেন্দ্রিক, এখন বিশ্বব্যবস্থা এককেন্দ্রিক। আগে আদর্শগত পার্থক্য ও প্রতিযোগিতা ছিল। এখন আদর্শের ব্যাপার খুঁজে পাওয়া যায় না। এখন আর্থসামাজিক রাষ্ট্রিক ব্যবস্থা এমন যে, মানুষ মানবতা হারিয়ে চলছে।

সংবাদপত্র ও অন্য সব প্রচারমাধ্যমের কাছে লোকে বর্তমান সময়ের সমস্যাবলির সমাধান নিয়ে লেখালেখি ও আলোচনা-সমালোচনা চায়। এখন দরকার আদর্শগত সমস্যার সমাধান। প্রচলিত গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ ও আন্তর্জাতিকতাবাদের ধারণা এখন আবেদনহীন। আগেকার ও বর্তমানের ধারণাবলির পুনর্বিবেচনার মধ্য দিয়ে এখন দরকার নুতন আদর্শ। অতীতের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে এখন দরকার সর্বজনীন গণতন্ত্র বা শতভাগ মানুষের গণতন্ত্র। আজকের বিশ্বব্যবস্থা সংস্কারের মধ্য দিয়ে দরকার নতুন বিশ্বব্যবস্থা প্রবর্তন। জাতিসংঘকে উন্নীত করা দরকার বিশ্বসরকারে। বিশ্বসরকারের কাছে একটি সেনাবাহিনী রেখে সব রাষ্ট্রের সেনাবাহিনী বিলুপ্ত করা দরকার, এর জন্য বৈশ্বিক পর্যায়ে আন্দোলন দরকার। পৃথিবীর সর্বত্র রাষ্ট্রব্যবস্থারও আমূল সংস্কার করতে হবে। রাষ্ট্রব্যবস্থাকে পুনর্গঠিত করতে হবে সর্বজনীন গণতন্ত্র অবলম্বন করে। তাত্ত্বিক বিষয়গুলোর মীমাংসার জন্য প্রথমে সব রাষ্ট্রের বিবেকবান চিন্তাশীল ব্যক্তিদেরই চিন্তাচর্চা অবলম্বন করে অগ্রসর হতে হবে।

লেখক :বিশিষ্ট চিন্তাবিদ, অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

ইত্তেফাক/বিএএফ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন