বিনিয়োগ বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ দিক

আপডেট : ২৬ ডিসেম্বর ২০২০, ১৪:১১

করোনা জীবাণু অতিমারীর ধাক্কায় বাংলাদেশে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগে (এফডিআই) কমে গেছে। হ্রাসের এ প্রবণতা আশঙ্কাজনক। গত অর্থবছরে ৩১৫ কোটি ৭০ লাখ (৩.১৫ বিলিয়ন) ডলারের এফডিআই এসেছে। তার আগের অর্থবছরে (২০১৮-১৯) এসেছিল ৪৯৪ কোটি ৬০ লাখ ডলার। বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০১৯-২০ অর্থবছরের বিদেশি বিনিয়োগের তথ্যে দেখা যায়, এক বছরে দেশে বিদেশি বিনিয়োগ কমেছে ৩৬ দশমিক ১৭ শতাংশ। বাংলাদেশের বিভিন্ন খাতে মোট যে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ আসে, তা থেকে বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান মুনাফার অর্থ দেশে নিয়ে যাওয়ার পর যেটা অবশিষ্ট থাকে, সেটাই প্রকৃত সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই)। এ বিনিয়োগ বাড়বে বলে মনে হয় না! বিশ্ব বিনিয়োগ প্রতিবেদন ২০২০-এর তথ্য মতে, করোনার কারণে ২০২০ সালে বৈশ্বিক বিনিয়োগ ৪০ শতাংশ কমে গিয়ে ১ দশমিক ৫৪ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার থেকে ১ ট্রিলিয়ন ডলারে এসে দাঁড়াতে পারে। ৭ম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় গেল বছর বাংলাদেশের ৯.৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল, যদিও আমরা সে লক্ষ্য অর্জন করতে পারিনি।

অর্থনীতিবিদ ও দেশের ব্যবসায়ী-উদ্যোক্তাদের ধারণা, মহামারি এখনো বিদ্যমান; তাই আগামী দিনগুলোতে এই চিত্র বদলাবে না। তারা বলছেন, বিদেশি বিনিয়োগ না বাড়লে দেশি বিনিয়োগও বাড়বে না, ফলে মহামারিতে ওলটপালট অর্থনীতি আরো নাজুক হয়ে পড়বে।

বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা)র গভর্নিং বডির সভায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গণভবন থেকে সম্প্রতি ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে ভাষণে বিনিয়েগের ক্ষেত্রে আমাদের আন্তরিকতার বিষয়টি বেশ গুরুত্বের সঙ্গে উল্লেখ করেছেন।

আমরা জাতিসংঘ নির্ধারিত সহস্রাব্দের লক্ষ্যমাত্রা অর্থাত্ মিলেনিয়াম ডেভেলপমেন্ট গোল বা এমডিজি বাস্তবায়ন করেছি। এ বছর থেকে শুরু হয়েছে ১৫ বছরমেয়াদি টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের কাজ। উন্নয়নের লক্ষ্যে ২০৩৪ খ্রিষ্টাব্দ অবধি মোট ১৭টি লক্ষ্যমাত্রা অর্জন আমাদের করতে হবে। অবকাঠামো উন্নয়ন না হলে দেশে কখনো বিনিয়োগ আসবে না সে উপলব্ধি আমাদের প্রধানমন্ত্রীরও। তাই রাস্তাঘাট থেকে শুরু করে নৌপথ, রেলপথ, আকাশপথে যোগাযোগ ব্যবস্থার সুষম উন্নত করার জন্য সরকারসহ সবার যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।

বিদ্যুত্ খাতে দেশে বর্তমান সরকারের প্রচুর উন্নতি হয়েছে। কিন্তু এ খাতে অব্যবস্থাপনা প্রকট। এক জায়গায় উন্নয়নটা যাতে না থেকে তা যেন বহুমুখী হয় তা লক্ষ্য রাখা জরুরি। শিল্পায়ন ত্বরান্বিত করতে কর রেয়াত সরকারের শুভ উদ্যোগ নিঃসন্দেহে। বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল বা এসইজেড অঞ্চলে খাদ্য ও কৃষি প্রক্রিয়াজাত খাতে বিনিয়োগ করলে উদ্যোক্তাদের ২০ শতাংশ নগদ সহায়তা দেওয়ার ঘোষণা বিনিয়োগ বাড়াতে সাহায্য করবে।

বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ বা বেজা বিনিয়োগকারীদের জন্য অত্যন্ত কম মূল্যে জমি প্রদান করছে, যা ভিয়েতনামের তুলনায় অনেক কম। বাণিজ্য সম্প্রসারণে সম্ভাবনাময় দেশগুলোর সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) স্বাক্ষর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

জাপানি বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশে বিনিয়োগে আগ্রহী। ২০১৯ সালে এশিয়াতে জাপানি বিনিয়োগ ছিল ৫৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যেখানে বাংলাদেশে ০.০৯ শতাংশ জাপানিজ বিনিয়োগ এসেছে। ভিয়েতনামসহ আরো কয়েকটি দেশ নিজে দেশে বিদেশি বিনিয়োগ টানতে চায়।

বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ানোর জন্য দেশে এমন ১০০ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তুলছে সরকার। চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ের অর্থনৈতিক অঞ্চল বঙ্গবন্ধু শিল্প নগর প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।

বাণিজ্য ও অর্থনীতির শিক্ষার্থী এবং তিন দশকের অর্থনীতি সাংবাদিকতায় অভিজ্ঞতায় মনে করি আমাদের এফডিআইয়ের প্রধান সমস্যা হচ্ছে ‘ব্র্যান্ডিং’। বিদেশি বিনিয়োগকারীদের সামনে আমরা এখনো আমাদের ব্র্যান্ডিং যথাযথভাবে তুলে ধরতে পারিনি। আমাদের রয়েছে বন্দরের সমস্যা। এখনো আমরা আমাদের বন্দরের অটোমেশন করতে পারিনি। এটা খুবই দুঃখজনক।

অতীতেও দেখা গেছে, বড় সংকটের পর বাংলাদেশের জন্য সুফলও এসেছে। বড় বড় দুর্যোগ কাটিয়ে উঠে আমরা দেশের অর্থনীতিকে সমৃদ্ধির পথে ঘুরে দাঁড় করিয়েছি এমন অনেক দৃষ্টান্ত আমাদের রয়েছে। সবাই আশঙ্কা করেছিল ২০০৫ সালে কোটা উঠে যাওয়ার পর বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রফতানিতে ধস আসবে ব্যাপকভাবে। কিন্তু সেটা না হয়ে উলটো অগ্রগতি হয়েছে। সে সময়ের ৫ বিলিয়ন ডলারের রফতানি এখন ৩০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে।

বিনিয়োগ উন্নয়নে সরকারি ও বেসরকারি পক্ষ মিলে আন্তরিকভাবে একসঙ্গে কাজ করার বিকল্প নেই। সরকারের দেওয়া ক্ষতিগ্রস্থদের প্রণোদনা প্যাকেজ বাস্তবায়নে ব্যাংকগুলোকে যেমন আন্তরিক হওয়া প্রয়োজন তেমনি যে কাজে সহযোগিতা দেওয়া হচ্ছে তা সঠিক হচ্ছে কি না তা খতিয়ে দেখতে হবে। এ ক্ষেত্রে সহায়তা গ্রহণকারীদের ওপর সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নজরদারি বাড়াতে হবে।

দুর্নীতি উন্নয়নের প্রধান শত্রু। আর্থিক খাতে রাজনৈতিক প্রশ্রয় দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিকে বাধাগ্রস্ত করে। ব্যাংক থেকে অর্থ লোপাট, জালিয়াতি, মানব পাচার, দেশ থেকে অর্থ পাচার, অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা ভঙ্গ ও বিনিয়োগের প্রতিকূল পরিবেশ অর্থনীতি প্রবৃদ্ধিকে বেশ ব্যাহত করে। তাছাড়া তা দেশপ্রেমের লক্ষণও নয়। তা যদি বারবার হতে থাকে তাহলে দেশ সমৃদ্ধির পথে পরিকল্পনামাফিক যে যাত্রা আমাদের তা মুখ থুবড়ে পড়বে। স্বাধীনতা অর্জনের সুবর্ণ জয়ন্তীর প্রাক্কালে অর্থনীতি অগ্রগতির হিসাব-নিকাশের খতিয়ান নিরূপণ করে উন্নত বিশ্বের মতো সামনের দিকে যেতে হবে আমাদেরও।

লেখক: গল্পকার, কবি, প্রাবন্ধিক ও অর্থকাগজ সম্পাদক

ইত্তেফাক/টিআর

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন