আপসের রাজনীতির পিচ্ছিল পথ

আপডেট : ২৭ ডিসেম্বর ২০২০, ১৩:৩৬

বেশ কয়েক বছর আগে ঢাকার রাজপথে মৌলবাদীরা স্লোগান দিয়েছিল, ‘আমরা সবাই তালেবান, বাংলা হবে আফগান।’ তখন তালেবানেরা সদ্য আফগানিস্তানে ক্ষমতা দখল করেছে। তাতে বাংলাদেশের মৌলবাদীরা উত্সাহিত হয়েছিল। তখন বিএনপি-জামায়াত বাংলাদেশে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত। মৌলবাদীরা তাতে উত্সাহ পেয়েছিল। যদি বিএনপি-জামায়াত আরো কিছুকাল ক্ষমতায় থাকার সময় ও সুযোগ পেত এবং আমেরিকার সঙ্গে তালেবানদের বিরোধ দেখা না দিত, সর্বোপরি শেখ হাসিনার নেতৃত্বে মহাজোট ক্ষমতায় বসতে না পারত, তাহলে বাংলাদেশে এত দিনে তালেবানি রাজত্ব প্রতিষ্ঠিত হতো।

এই তারেবান রাজত্ব প্রতিষ্ঠার প্রাথমিক কাজটুকু বিএপি-জামায়াত সরকারই করতে শুরু করেছিল। শিক্ষাব্যবস্থায় তারা ঘোর অরাজকতা সৃষ্টি করে রেখেছে। স্কুল শিক্ষায় সরকারি অর্থ সাহায্য কাট করে মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থায় অর্থ সাহায্য বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। মাদ্রাসা শিক্ষা প্রসারের জন্য সৌদি আরব, কাতার, কুয়েত থেকে দেদার টাকা আসতে থাকে। মাদ্রাসা এবং উচ্চশিক্ষাতেও গোলাম আযমের বক্তৃতা-বিবৃতি পাঠ্যসূচির অন্তর্গত করা হয়। রাজনৈতিক ক্ষেত্রে বিএনপি-জামায়াত সরকার বাংলা ভাইদের তৈরি করে। জামায়াত তো ক্ষমতায় ছিলোই। হিজবুত, তাহরিক, হেজবুল্লা ইত্যাদি নামে কয়েকটি হিংস্র জিহাদিস্ট দল গড়ে ওঠে। মনে হয়েছিল বাংলাদেশে সেকুলার বুদ্ধিজীবী ও রাজনৈতকি দল কোনোটাই বেঁচে থাকতে পারবে না।

বহু তরুণ মুক্তবুদ্ধির বুদ্ধিজীবী তখন দল বেঁধে দেশ ছেড়ে পালিয়ে গেছেন। ১৯৭১ সালে যারা বাংলাদেশকে বুদ্ধিজীবী হত্যা দ্বারা মেধাশূন্য করতে চেয়েছিল, তাদেরই অনুচরেরা পরবর্তী পর্যায়ে ধর্মের দোহাই পেড়ে তরুণ বুদ্ধিজীবীদের গলা কাটা শুরু করে একই উদ্দেশ্য সিদ্ধি করতে চেয়েছিল। আর এসব হত্যাকাণ্ডকে খালেদা জিয়া বলতেন নাটক। কবি শামসুর রাহমানের ওপর তখন এক মৌলবাদী ঘাতক, তাকে হত্যার উদ্দেশ্যে ছোরা হাতে ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং তার স্ত্রীর বাধাদানের ফলে তিনি রক্ষা পান, তাকেও খালেদা জিয়া বলেছিলেন ‘সাজানো নাটক’। বাংলাদেশের প্রধান কবির (এখন প্রয়াত) ওপর এই নিষ্ঠুর হামলার নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাতে খালেদা জিয়া রাজি হননি।

২০০৮ সালে শেখ হাসিনার নির্বাচনে বিজয়কে আমি অ্যাক্ট অব গড (act of god) বলি। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে দেশের গণতান্ত্রিক মহাজোট নির্বাচনে বিজয়ী না হলে গত শতকে ইতালির ডিকটর ইমানুয়েল যেমন বিনা যুদ্ধে ক্ষমতা ফ্যাসিস্ট মুসোলনির হাতে তুলে দিয়ে গিয়েছিলেন, এ যুগে খালেদা জিয়া তেমনি বাংলাদেশটাকে তালেবানদের হাতে তুলে দিয়ে যেতেন।

এটা আল্লাহর রহমতই (act of god) যে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের সরকার এখন পর্যন্ত ক্ষমতায় আছে। তারা কঠোর হাতে বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদের চরম দণ্ড দিয়েছে। একটি দুঃসাহসিক কাজ করেছে একাত্তরের ঘাতক-দালাল জামায়াতি নেতাদের বিচার ও সর্বোচ্চ শাস্তি দিয়ে। ২০১৩ সালেও মহাজোট সরকার যেভাবে ওয়াটার পাম্পের সাহায্যে হেফজতি অভ্যুত্থান দমন করেছে, তার নজির ইতিহাসে বিরল।

এত বড় বিজয়ের পরেও আওয়ামী লীগ সরকার এখন কেন আপস ও এপিজমেন্টের পথে গেলেন, তা আমার বুদ্ধির অগম্য। এই আপস আমার কাছেও প্রথমে সমর্থনযোগ্য মনে হয়েছিল। এই আপস দ্বারা যদি জামায়াতিদের খপ্পর থেকে হেফাজতিদের উদ্ধার করা হয়ে থাকে এবং পরবর্তী সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী মহাজোটের বিজয় নিশ্চিত করা হয়ে থাকে, তাহলে রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে এই আপস সমর্থনযোগ্য। কিন্তু এই আপসের আড়ালে আওয়ামী লীগকে নিজেদের নীতি বিসর্জনের মতো কী দাম দিতে হয়েছে তা আমার জানা ছিল না। পরে হেফাজতিদের সঙ্গে আওয়ামী লীগের আপস-চুক্তির কয়েকটি ধারা যখন দেখেছি, তখনই মনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, বাঘ কি অজগরকে গিলে নিজে বাঁচতে পারবে।

যত দিন হেফাজতের প্রয়াত আমির মওলানা শফি বেঁচে ছিলেন, তত দিন হেফাজত ছিল পোষ মানা বিড়ালের মতো। ট্রয়ের ঘোড়া বাবুনগরী তখন স্বরূপে বেরোতে পারেননি। এখন মওলানা শফির মৃত্যুর পর তিনি স্বরূপে বেরিয়েছেন। সঙ্গে ডিঙ্গি নৌকা মমিনুল হক। দেশে জাতির পিতার ভাস্কর্যের মতো সব চাইতে স্পর্শকাতর বিষয় নিয়ে তারা মাঠে নেমেছেন। সরকারের এক মন্ত্রী বলেছেন, মওলানাদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনাক্রমে বিষয়টির ‘সুন্দর সমাধান’ করা হবে। মওলানারা নাকি পাঁচ দফা আপস প্রস্তাব দিয়েছিলেন। তার সব কয়টি না কয়েকটি মানা হয়েছে তা আমি জানি না। তবে এটা দেখতে পাচ্ছি, কোনো মন্ত্রী আর বুখাইনগরী সম্পর্কে উচ্চবাচ্য করছেন না। কিন্তু হেফাজতিরা তাদের কথা এখনো থামায়নি।

তারা কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপার (এসপি) এস এম তানভীর আরাফাতের বরখাস্তকরণ দাবি জানিয়েছেন। গত শুক্রবার হেফাজতের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মাওলানা আজিজুল হক ইসলামাবাদী গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে এই দাবি জানিয়েছেন। কুষ্টিয়ার এসপির অপরাধ, তিনি জাতির পিতার স্ট্যাচুর অবমাননা করার জন্য তার মনের ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। এই ক্ষোভ সারা জাতির। তিনি সেই ক্ষোভই প্রকাশ করেছেন তার বক্তব্যে। তিনি অপরাধীদের হাত ভেঙে দেওয়ার হুমকি দিয়েছেন এবং বলেছেন, কারো যদি বাংলাদেশ পছন্দ না হয়, তাহলে তাদের উচিত তাদের পেয়ারা পাকিস্তানে চলে যাওয়া।

কুষ্টিয়ার এসপি আরাফাত তার মনের ক্ষোভ তো সারা জাতির মনের ক্ষোভ এবং কথা হিসাবে প্রকাশ করেছেন মাত্র। অপরাধীরা ধৃত হলেও তাদের হাত-পা ভেঙে দেননি। তবু তাকে বরখাস্ত করার দাবি তোলার ধৃষ্টতা দেখাতে পারছে হেফাজতিরা। কিন্তু তাদের বিবৃতিতে জাতির পিতার ভাস্কর্য ভাঙার মতো জাতিদ্রোহিতার কাজ করেছে যারা, তাদের অপরাধ সম্পর্কে একটি কথাও নেই। তাদের বিচার ও শাস্তি সম্পর্কে কোনো কথা নেই এই বিবৃতিতে। আমার মতে, জাতির পিতার অবমাননাকারীদের সম্পর্কে কোনো নিন্দা ও বিচার দাবি না করে এই বিবৃতিদাতা অপরাধীদের পক্ষাবলম্বন করেছেন। এই অপরাধে তাকেও গ্রেফতার করা উচিত।

কুষ্টিয়ার এসপি ভাস্কর্য ভাঙার অপরাধীদের ধরেছেন। তাদের বিচার হবে। তিনি অপরাধীদের হাত-পা ভাঙেননি। শুধু ভয় দেখিয়েছেন। এই ভয় দেখানোর কাজটি যদি অপরাধ হয়ে থাকে, তাহলে বাংলাদেশের সব জেলার সব এসপির উচিত জাতির পিতার ভাস্কর্যে হতে দেওয়ার মতো গুরুতর অপরাধ যারা করে, তাদের শুধু গ্রেফতার করা নয়, কুষ্টিয়ার এসপির মতো তাদের ভয় দেখানো, যাতে দুষ্কৃতরা এ ধরনের অপরাধ করা থেকে নিবৃত্ত হয়। কুষ্টিয়ার এসপি আরাফাত বাংলাদেশের সংবিধান যারা লঙ্ঘন করে, জাতির পিতার ভাস্কর্যের যারা অবমাননা করে, তাদের উদ্দেশে এই হুমকি দিয়ে তার কর্তব্য পালন করেছেন। সরকারের উচিত তাকে পুরস্কৃত করা, প্রোমোশন দেওয়া। জাতিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে হুমকি দিলে বা ভয় দেখালে হেফাজতিদের আঁতে ঘা লাগে সেটাই আজ বড় প্রশ্ন। তাহলে এই অপরাধী কি তারা?

বরিশাল থেকে জানতে পেরেছি, বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য ভাঙা হবে এই আশঙ্কায় পুলিশ সেটি পাহারা দিচ্ছে। তাহলে কি সব জেলাতেই পুলিশকে বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য রক্ষার কাজে পাহারা দিতে হচ্ছে? স্বাধীন বাংলাদেশে তার স্থপতির ভাস্কর্য নিরাপদ নয়, এর চাইতে লজ্জার বিষয় আর কিছু নেই। এটা হচ্ছে আমাদেরই আপস ও এপিজমেন্ট নীতির ফল। আমরা রজ্জুতে সর্পভ্রম করে ক্রমাগত পেছনে হটছি। এই পেছনে হটার শেষ কোথায় জানি না।

ভারতের জাতির জনক মহাত্মা গান্ধীকে হত্যা করেছিল লাতুরাম গডসে। সে ছিল হিন্দু মহাসভার লোক। গান্ধীকে হত্যা করার পর মুম্বাই ও আহমেদাবাদে হিন্দু মহাসভার লোকেরা মিষ্টি বিতরণ শুরু করে। প্রধানমন্ত্রী নেহরু তাদের গ্রেফতার করার নির্দেশ দেন এবং ক্রোধের বশবর্তী হয়ে বলেন, ‘উসকো শির কুচল দেঙ্গে’ (ওদের মাথা ভেঙে দেব)। তিনি কারো মাথা ভাঙেননি। কিন্তু এ কথা বলার জন্য হিন্দু মহাসভা তার পদত্যাগ দাবি করার হাস্যকর কাজটি করেনি। নেহরু হিন্দু মহাসভাকে নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দল ঘোষণা করেন। তার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সরদার বল্লভ ভাই প্যাটেল নেহরুকে বলেছিলেন, নেহরুজি, লাথুরামসহ অপরাধীদের তো গ্রেফতার করা হয়েছে। হিন্দু মহাসভা দলকে নিষিদ্ধ করে লাভ কী?

নেহরু জবাব দিয়েছিলেন, আমি ওদের কোনো প্রকার দুর্বলতা অথবা উদারতা দেখাতে চাই না। তাহলে ওরা পেয়ে বসবে। ভবিষ্যতে আরো বড় আকারে সহিংস হয়ে উঠবে। বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য ভাঙার পর হেফাজতিদের সম্পর্কে সরকারের কী নীতি অনুসরণ করা উচিত? গত ২০০ বছরের ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, আপস কখনো সুফলপ্রসূ হয়নি। তার আগের ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, আপস যারা করেছেন, তারা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া ছাড়া কখনো লাভবান হননি। খেলাফত নিয়ে যুদ্ধে হজরত আলি (রা.) হজরত মুয়াবিয়ার বিরুদ্ধে জয়ী হতে চলেছিলেন। উপদেষ্টাদের পরামর্শে তিনি আপস করতে রাজি হন। মুয়াবিয়ার সৈন্যরা বর্শার আগায় কোরআন ঝুলিয়ে পালাচ্ছিল। কোরআন ছিল তাদের আত্মরক্ষার বর্ম। কোরআন দেখলে আলির সৈন্যরা তাদের ওপর তলোয়ার চালাবে না। এই আপসের পর হজরত আলি (রা.) নিজে আততায়ীর হাতে নিহত হন। মুয়াবিয়ার পুত্র এজিদ চক্রান্ত করে বিষ প্রয়োগে তার প্রথম পুত্র ইমাম হাসানের মৃত্যু ঘটান। ছোট পুত্র ইমাম হোসেনকে কারবালায় ডেকে এনে যুদ্ধের প্রহসনে হত্যা করেন।

ইংরেজ আমলে গত শতকের প্রথম দিকে ফজলুল হকের নেতৃত্বে তার কৃষক প্রজা পার্টি মুসলিম লীগকে নির্বাচনে সম্পূর্ণ পরাজিত করে। তা সত্ত্বেও তিনি পরাজিত পক্ষের প্রতি উদারতা দেখিয়ে তাদের সঙ্গে আপস করেন, এমনকি তাদের মন্ত্রিসভায় স্থান দেন। নিজে মুসলিম লীগে যোগ দেন। পরবর্তী ইতিহাস সবারই জানা, পুনরাবৃত্তি নিষ্প্রয়োজন। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের আগে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী নেভিল চেম্বারলেন জার্মানির হিটলার অবৈধভাবে অস্ট্রিয়া দখল করার পরও মিউনিখে ছুটে গিয়ে তার সঙ্গে শান্তিচুক্তি করেছিলেন। ফল দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ। চার্চিল এই আপসের তীব্র নিন্দা করেছিলেন। পরবর্তীকালে তাকেই প্রধানমন্ত্রী হয়ে দেশটাকে রক্ষা করতে হয়েছিল।

সাদ্দামের আগে ইরাকের প্রেসিডেন্ট ছিলেন জেনারেল করিম কাশেম। তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেন কর্নেল আরিক। আরিক পরাজিত হয়ে জে. কাসেমের কাছে ক্ষমাভিক্ষা করেন। কাসেম উদারতা দেখিয়ে তাকে ক্ষমা করেন এবং বিদেশে রাষ্ট্রদূত নিযুক্ত করেন। পরবর্তীকালে আরিক দেশে ফিরে আসেন। গোপন ষড়যন্ত্র দ্বারা ক্ষমতা দখল করেন এবং করিম কাসেম প্রাণভিক্ষা চাওয়া সত্ত্বেও তাকে হত্যা করেন।

এজন্যই ব্রিটিশ রাজনীতিক স্যার স্টাফোর্ড ক্রিপ্স রাজনীতিতে চার্চিল কর্তৃক প্রতারিত হয়ে বলেছিলেন, আপসের রাজনীতি খুবই পিচ্ছিল। যারাই ওখানে পা রাখে, তাদের পতনের আশঙ্কা ষোল আনা। জওয়াহের লাল নেহরু বলেছেন, ‘শত্রুর শক্তিকে উপেক্ষা করতে নেই। কিন্তু শত্রুর কল্পিত শক্তিকে ভয় পেয়ে যারা আপস করে, তাদের পতন ও পরাজয় কেউ রোধ করতে পারে না।’ একসময় বাংলাদেশে স্লোগান শোনা গিয়েছিল, ‘আপসের মুখে লাথি মারো/ বাংলাদেশ স্বাধীন করো।’ এখন এই স্লোগান হওয়া উচিত—আপসের মুখে লাথি মারো/ বাংলাদেশ রক্ষা করো।

লন্ডন, ২৬ ডিসেম্বর, শনিবার ২০২০

ইত্তেফাক/টিআর

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন