স্বপ্নের পদ্মা সেতু

আপডেট : ২৯ ডিসেম্বর ২০২০, ২১:৩৫

স্বপ্ন সত্যি হলো। দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলের প্রায় ২২ টি জেলার প্রায় ৭ কোটি মানুষের দীর্ঘদিনের স্বপ্ন পদ্মাসেতু। পদ্মাসেতুর ৪১ তম স্প্যান বসানোর মধ্য দিয়ে দৃশ্যমান হলো ৬ হাজার ১৫০ মিটার পদ্মাসেতু। তৈরি হলো দুই পাড়ের মানুষের সেতুবন্ধন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাহসী নেতৃত্বে সকল দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করে নিজস্ব অর্থায়নে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকীতে বিজয়ের মাসে বাঙালি জাতির আরেকটি ঐতিহাসিক বিজয়। 

দিনের আলোতে চোখের সামনে ধরা দিল পদ্মাসেতু। অনেকের কাছে পদ্মাসেতু বাংলাদেশের উন্নয়ন এর মহাসড়ক, আমাদের দক্ষিণবঙ্গের অনেক মানুষের কাছে পদ্মা সেতু বেঁচে থাকার অবলম্বন। আমরা যখন ৮০’র দশকে মাদারীপুর থেকে ঢাকা আসতাম, ১২ থেকে ১৬ ঘণ্টা সময় লেগে যেত। মাঝেমধ্যে পদ্মার চরে লঞ্চ আটকে গেলে ২-৩ দিনও লেগে যেত। এই লঞ্চে করে আমরা যখন পদ্মা পার হতাম আমার কাছে মনে হত আমরা সমুদ্র পাড়ি দিচ্ছি, পদ্মার কুল কিনারা দেখা যেত না। একবার জরুরি কাজে ঢাকা আসতে হবে আবহাওয়া তেমন খারাপ না, যাতায়াত করার মত স্বাভাবিকভাবেই লঞ্চ চলছে, বিকালে আমি লঞ্চে করে মাদারীপুর থেকে ঢাকার উদ্দেশে রওনা দিলাম। আমার কাছে লঞ্চের যাত্রা খুবই আরামদায়ক ছিল। 

পদ্মার ইলিশ মাছ, ডাল-ভাত,ঝালমুড়ি ছিল আমার খুবই প্রিয়। মধ্যরাত্রে ঘুমিয়ে ছিলাম, হঠাৎ কান্নাকাটির প্রচণ্ড শব্দে আমার ঘুম ভেঙে গেলো। দেখলাম মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচার জন্য মানুষের আর্তনাদ, সে কি কান্না! অনেক মানুষ মহান আল্লাহ্‌ রাব্বুল আলামিনের কাছে ক্ষমা চাচ্ছে, দোয়া ও মান্নত করছে। কয়েকজন হিন্দু ধর্মাবলম্বী মা-বোনেরা চিৎকার করে কাঁদছে আর বলছে- ‘মা গঙ্গা আমাদের রক্ষা করো’। মা গঙ্গাকে সন্তুষ্ট করার জন্য তাদের হাতের গয়না নদীতে ফেলে দিচ্ছিলো। আমি দেখলাম লঞ্চটি ঢেউয়ের তরঙ্গের সাথে সাথে একবার অনেক নিচে চলে যাচ্ছে আবার অনেক উপরে ভেসে উঠছে। মনে পড়ে গেল শরৎচন্দ্রের ‘সমুদ্র সাইক্লোন’ গল্পের দৃশ্য। যতবার লঞ্চটি নিচের দিকে যাচ্ছিল আমার মনে হচ্ছিল এই বুঝি লঞ্চটি ডুবে যাচ্ছে। একজন সুস্থ মানুষ যখন দেখে তার বেঁচে থাকার সম্ভাবনা ক্ষীণ হয়ে আসছে, এখনি তাকে এই পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে চলে যেতে হবে, এটা যে কতটা আতঙ্ক এবং বেদনার তা কেবল একজন ভুক্তভোগীই অনুভব করতে পারে। এই ঘটনা আমাদের জীবনে নতুন কিছু নয়। অনেকবার পদ্মা নদীতে বিপদের মুখোমুখি হয়েছি তারপরেও ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে সুন্দর জীবনের জন্য নিজের জীবনকে বাজী রেখে ঢাকায় আসতে হয়েছে। ঝোড়ো আবহাওয়া, শীতের কুয়াশায় প্রতিবছর হাজার হাজার বাস ট্রাক আটকে পড়া ছবি, নৌকা,লঞ্চ, স্পিডবোট ডুবিতে শত শত মানুষের মৃত্যুর খবর আমরা দেখি। মাদারীপুর থেকে একজন ডাক্তার যখন তার সন্তানকে বলেন আপনার বাবাকে চিকিৎসার জন্য দ্রুত ঢাকায় নিতে হবে অথবা কোন মুমূর্ষু রোগীকে নিয়ে ঢাকায় আসা খুব প্রয়োজন হয়ে পড়ে তখন অনেক সময় তাকে শেষ সম্বলটুকুও বিক্রি করে দিতে হয়। বৈরি আবহাওয়া বা ঘন কুয়াশার কারণে ফেরি চলাচল বন্ধ থাকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দিনের পর দিন। পদ্মার পাড়ে আটকে থেকে চিকিৎসার অভাবে কারো বাবা কারো মা শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে, কেউ মৃত আত্মীয়কে দেখতেও যেতে পারেন না সময়মত, এই মানুষগুলোর কাছে পদ্মা সেতুর গুরুত্ব যে কি তা ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়।

১৯৮৬ সালের দিকে বর্তমান শরিয়তপুর জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও শরিয়তপুর জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি জনাব খোকা শিকদার ও দৈনিক ইত্তেফাকের সিনিয়র সাংবাদিক বীর মুক্তিযোদ্ধা মরহুম আব্বাস উদ্দিন আফসারি ‘পদ্মা সেতু বাস্তবায়ন কমিটি নামে’ একটি কমিটি গঠন করেন, স্বপ্ন দেখান পদ্মার উপর সেতু নির্মাণের। তখন মানুষ তাদেরকে পাগল বলত। তখন মানুষ স্বপ্নেও চিন্তা করেনি পদ্মার উপর সেতু বানানো সম্ভব। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাঙালি জাতিকে স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন স্বাধীনতার, বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বেই বাঙালি অর্জন করেছিল স্বাধীনতা। হাজার বছরের ইতিহাসে বাঙালি জাতির কোন স্বাধীন রাষ্ট্র ছিলনা। বঙ্গবন্ধু অসম্ভবকে সম্ভব করে ইতিহাস রচনা করেছিলেন, তাই তিনি বাঙালি জাতির পিতা। এই বিজয়ের মাসে বঙ্গবন্ধুর কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অসম্ভবকে সম্ভব করে নতুন ইতিহাস রচনা করলেন। এক ঐতিহাসিক মুহূর্তের সাক্ষী হল বাংলাদেশ ও পুরো বিশ্ব। স্বপ্ন আজ সত্যি হল। সর্বশেষ স্প্যানটি বসানোর মধ্য দিয়ে আলোচিত পদ্মা সেতুর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বড় অংশের কাজের সমাপ্তি হল। পদ্মা সেতু পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সেতু নয়, তবে অবশ্যই সবচেয়ে আলোচিত সেতু। তাইতো প্রতিটি স্প্যান হয়েছে সংবাদপত্রের শিরোনাম। স্বপ্ন দেখতে সাহস লাগে, বঙ্গবন্ধুর কন্যা শেখ হাসিনা তার সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছেন বারবার। তাইতো প্রধানমন্ত্রীর ডাকে সাড়া দিয়ে অনেক মানুষ নিজেদের বসতভিটা ছেড়ে দিয়েছিলেন পদ্মা সেতুর জন্য। বিশ্বব্যাংক এর সঙ্গে টেক্কা দিয়ে পদ্মা সেতু করে ফেলা সম্ভব এটা কেউ ভাবেনি, শুধু একজনই ভেবেছিলেন তিনি বঙ্গবন্ধুর কন্যা শেখ হাসিনা।

পদ্মা সেতুর প্রেক্ষিতে সবচেয়ে বেশি ষড়যন্ত্রের শিকার ২ জন মানুষকে আমি খুব কাছ থেকে চিনি। একজন সাবেক সেতু মন্ত্রী জনাব আবুল হোসেন। তিনি জনসেবা করে নেতা হয়েছেন। তিনি আমার এলাকার অত্যন্ত জনপ্রিয় একজন নেতা। তিনি মন্ত্রী, এমপি হবার আগেই অনেক স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করে এলাকার অনেক উন্নয়ন করেছেন। আরেকজন সাবেক সেতু সচিব, বর্তমানে জার্মানিতে নিযুক্ত বাংলাদেশের মান্যবর রাষ্ট্রদূত জনাব মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া। খুবই সাধারণ, অত্যন্ত ভদ্র এবং বিনয়ী একজন মানুষ। পৃথিবীর সবাই বিশ্বাস করলেও, যারা তাদেরকে চেনে তারা কেউ একথাটি বিশ্বাস করবে না যে তারা দুর্নীতি করতে পারে ।

বঙ্গবন্ধুর কন্যা যখন ইউরোপ সফরে আসেন তখন সবসময়ই প্রবাসীদের সাথে মত বিনিময় করেন, প্রবাসীদের কথা তিনি মনোযোগ দিয়ে শোনেন। তিনি প্রবাসীদের কষ্ট অনুভব করেন। জননেত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের দায়িত্ব নেবার পর ৭ বার জার্মানিতে এসেছেন। আমি অত্যন্ত সৌভাগ্যবান ৭ বারই নেত্রীর বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করার সুযোগ হয়েছে আমার। ২০১১ সালে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বার্লিনে এসেছিলেন। তার সংবর্ধনা সভায় বক্তব্য দেবার সুযোগ পাই। বার্লিনে মাদারীপুর এবং শরিয়তপুরের অনেক লোক বসবাস করেন। সকলেই আমাকে অনুরোধ করেন আমি যেন আমার বক্তব্যে পদ্মা সেতুর দাবিটি নেত্রীর কাছে তুলে ধরি। আমি তাদেরকে বলেছিলাম আমাদের মত নেত্রী নিজেও ভুক্তভোগী। পদ্মার দুর্ভোগের কথা তিনি জানেন  এবং বোঝেন। তাকে আমাদের চেয়ে বেশি পদ্মা নদী পার হতে হয়। যখনই কোনো আলোচনায় আমি নেত্রীর সামনে বক্তব্য দেয়ার সুযোগ পেয়েছি তখনি আমি ৩ টি দাবি আমার প্রাণপ্রিয় নেত্রীর কাছে উপস্থাপন করেছি। বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার , যুদ্ধ অপরাধীদের বিচার ও পদ্মা সেতু। আমি জানতাম বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ৩টি দাবিই প্রায় অসম্ভব, তারপরেও আমার মত কোটি মানুষের বিশ্বাস ছিল কেউ যদি পারেন তবে তিনি একমাত্র শেখ হাসিনা।

মিসরের সাবেক প্রেসিডেন্ট নাসের মিসরবাসীর দুঃখ নীল নদের ওপর আসোয়ান বাঁধ নির্মাণ করে ইতিহাসে স্থান করে নিয়েছিলেন। পদ্মা সেতু নির্মাণ করে বঙ্গবন্ধুর কন্যা শেখ হাসিনা বাঙালি জাতির হৃদয়ে স্নান করে নিবেন। বাংলাদেশের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে আমার কিছু চাইবার নাই, তিনি সকল স্বপ্নই পূরণ করেছেন। তার জন্য মহান আল্লাহ্‌র কাছে দোয়া করি যেন তিনি দীর্ঘদিন আমাদের মাঝে বেঁচে থাকেন, সুস্থ থাকেন এবং ভালো থাকেন ।                                              

আমি গর্বিত আমার জাতির জনকের নাম বঙ্গবন্ধু, আমার দেশের নাম বাংলাদেশ, আমার নেত্রী বঙ্গবন্ধুর কন্যা শেখ হাসিনা, আমার আছে গর্বের পদ্মা সেতু।

লেখক: সাবেক সভাপতি বার্লিন আওয়ামী লীগ

ইত্তেফাক/এএএম
 

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন