প্যারাসাইট

আপডেট : ০১ জানুয়ারি ২০২১, ০৭:৩৭

Parasite। কোরিয়ান ভাষায় বলে— Gisaengchung। বাংলায় এর অর্থ পরজীবী। পরের ওপর যার জীবন নির্ভর করে। ভাষাগত অর্থের বাহিরে চিকিত্সা বিজ্ঞানে এর উদাহরণ হলো কৃমি। শরীরের বাহিরে এরা বেঁচে থাকতে পারে না।

যে প্যারাসাইটের কথা বলছি—এটি কোরিয়ান একটি মুভি। সাউথ কোরিয়ান মুভি। গত বছরে অস্কার পাওয়া মুভি। দক্ষিণ কোরিয়ার বিখ্যাত চিত্র পরিচালক Bong Joon Ho ২০১৯ সালে এই ছবি নির্মাণ করেন। ১৩৫ মিনিটের এই ছবির বাজেট ছিল মাত্র ১১ মিলিয়ন ডলার। আয় করেছে আড়াইশো মিলিয়ন ডলারের ওপরে। আয় ব্যয়ের হিসাবের চেয়ে মুভিটির পুরস্কারের হিসেব চোখে পড়ার মতো।

২০২০ সালে মুভির ওপর যতগুলো প্রধান আন্তর্জাতিক পুরস্কার আছে, প্যারাসাইট সবগুলোতেই ভাগ বসিয়েছে। অস্কার, যা একাডেমি এওয়ার্ডস নামে পরিচিত, ছয়টি বিভাগে মনোনীত হয়ে চারটিতে পুরস্কার, ব্রিটিশ ফিল্ম এওয়ার্ড বাফটায় চারটাতে নোমিনেটেড হয়ে দুটোয় পুরস্কার, ক্যান ফেস্টিভ্যালে একটি এবং গোল্ডেন গ্লোবে একটি পুরস্কার পেয়েছে। বেস্ট মুভি, বেস্ট পিকচার, বেস্ট স্ক্রিন প্লে, বেস্ট ডিরেক্টর, বেস্ট ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম, এমন করে একের পর এক বিভাগে প্যারাসাইটের জয় জয়কার ছিল।

২০১৯ সালের সেরা মুভি প্যারাসাইট গত বছরে সারা বিশ্বের বিভিন্ন ফিল্ম উত্সবে ৩৩০ বার বিভিন্ন বিভাগে নোমিনেটেড হয়ে বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে ১৯৭টি পুরস্কার পেয়েছে।

মেটাক্রিটিকের জরিপে গত ১০০ বছরের সেরা পঞ্চাশ মুভির মধ্যে প্যারাসাইটের অবস্থান ৪২তম। পুরস্কারের গালগল্পের পর মুভিটি নিয়ে আসল কথায় আসি।

দক্ষিণ কোরিয়ার রাজধানী সিউল শহরের দুটো পরিবার নিয়ে গল্প। কিম এবং পার্ক ফ্যামিলি। কিম পরিবার শহরের দরিদ্র এলাকায় একটি বেইজমেন্ট থাকে। বাবা কিম, স্ত্রী চুং, ছেলে অও এবং মেয়ে জাং। পার্ক ফ্যামিলি ধনী। স্বামী পার্ক শহরের এলিট পাড়ায় স্ত্রী, টিনেজ কন্যা হায়ে এবং বালক পুত্র সংসহ থাকে। পার্ক পরিবারে ঘর এবং বাচ্চাদের দেখাশোনার জন্যে হাউজকিপার মুন এবং একজন ড্রাইভার আছে। দশটি প্রধান চরিত্রের বাহিরে মুভির শুরুতে কিমের ছেলে অও এর এক বন্ধু এবং শেষের ক্লাইম্যাক্সের আগে পার্ক ফ্যামিলির হাউজকিপার মুনের স্বামী প্লটে প্রবেশ করে।

পরিবার দুটো নিয়েই মূল কাহিনি। কৃমি যেমন শরীরের ওপর নির্ভরশীল, এক ধরনের পরজীবী, তেমনি দরিদ্র কিম পরিবার কীভাবে পার্ক ফ্যামিলির ভেতর বেঁচে থাকে, তা দেখানো হয়েছে। দারিদ্রতা একটি পোকা, সোসাইটির ক্লাস সিস্টেম একটি পোকা, সম্পদের বৈষম্য এক ধরনের প্যারাসাইটিজম, আপার ক্লাস লোয়ার ক্লাস একটি সিঁড়ি। এমন সব মেটাফোর মুভিটির আড়ালের কথা।

দরিদ্র কিমের দারিদ্র্যতা কীভাবে বাধ্য করে ধনী পার্কার পোষকের মধ্যে পরজীবী হয়ে বাঁচতে। মুভিটি দেখে প্রথম দৃষ্টিতে অন্তরালের অর্থটি তাই মনে হবে। কিন্তু না, গল্পের প্লট নির্মাতা ছবির পরিচালক নিজেই। পরজীবিতা এখানে একপেশে বুঝায়নি। ধনী পরিবারের লোকেরা কেমন অথর্ব হয়, কেমন করে তাদের দৈনন্দিন জীবন দরিদ্রদের কাজের ওপর নির্ভর করে, অর্থের পরিমাপে তারা সফল হলেও বুদ্ধির মাপে তারা কতটা অর্বাচীন, বৈষম্যের ঝলক বাড়ির গৃহ সজ্জা, ইংরেজি প্রীতি, দরিদ্রদের গায়ের গন্ধ এমন সব সিম্বোলিক বোধের সমাবেশ পুরো ছবি জুড়ে। কিম পরিবার যেমন এক ধরনের পরজীবী, তেমনি পার্ক পরিবারও বেঁচে থাকে কিম পরিবারের পরিশ্রমের ওপর। এই দৃষ্টিতে দুটো পরিবার একে অপরের প্যারাসাইট। কখনো কিম পরিবার প্যারাসাইট, পার্ক পরিবার হোস্ট, কখনো পার্ক পরিবার পরজীবী, কখনো কিম পরিবার হয়ে উঠে পোষক। কিম পরিবারের কর্তার ভাষায়—they are nice because they are rich।

কিম ফ্যামিলির চার জন একটি বস্তির মতো জায়গায় থাকে। রাত হলে মাতাল প্রতিবেশী জানালার ফাঁক দিয়ে পেশাব করে দেয়। একটু বৃষ্টি হলে নর্দমার পানি ভাসতে থাকে চারিদিকে। ঘরে পিজার বক্স বানিয়ে দুটো পয়সা রোজগার করে সবাই। ছেলে অও এর স্কুল বন্ধু, এক দিন একটি প্রস্তাব নিয়ে আসে। বন্ধুটি সচ্ছল পরিবারের। এক ধনী দম্পতির কিশোরী মেয়েটিকে পড়ায়। আমেরিকায় পড়তে চলে যাবে বলে বন্ধুটি অও কে সুযোগটি নিতে বলে। কিন্তু অও এর ভালো রেজাল্ট না থাকার কারণে ভালো কোনো ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হতে পারেনি। বন্ধু পরামর্শ দেয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নকল সার্টিফিকেট বানাতে। অও সুযোগটি নেয়। কম্পিউটারে নকল কাগজ বানিয়ে ভালো একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভালো ছাত্র সেজে ধনী পার্ক ফ্যামিলির কাছে যায়।

শুরু হয় লোভের যাত্রা। লোভ কীভাবে সৃষ্টির আড়ালে ধ্বংস ডেকে আনে ধীরে ধীরে। শ্রেণি বৈষম্য কীভাবে প্রতিযোগিতা করে একে অপরের মাথায় কাঁঠাল ভাঙতে। গড়ে ওঠে সিম্বায়োটিক রিলেশনশিপ। পোষক আর পোষ্য। পোষক হয়ে ওঠে শোষক, পোষ্য বেঁচে থাকে পরান্নভোজী হয়ে। প্যারাসাইট একটি ভালো মুভি।

লেখক : কলামিস্ট

ইত্তেফাক/টিআর

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন