বইমেলা কি হচ্ছে? এ প্রশ্ন এখন দেশের সবার মনে। করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ের ঝুঁকি বিবেচনায় ইতিমধ্যেই বইমেলা আয়োজন থেকে পিছিয়ে এসেছে বাংলা একাডেমি কর্তৃপক্ষ। করোনা পরিস্থিতির উন্নতি হলে বইমেলা হতে পারে বলে সবাই বলাবলি করলেও তার নিশ্চিত কোনো আশার বাণী শোনায়নি বাংলা একাডেমি কর্তৃপক্ষ কিংবা সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়। তাই, বইমেলা হওয়া না হওয়া নিয়ে আশা-নিরাশার দোলাচলে প্রকাশকরা।
প্রকাশকরা বলছেন, করোনার অজুহাত দেখিয়ে বইমেলা পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে। অথচ দেশ জুড়ে সব মার্কেট, শপিং মল. বিয়ের অনুষ্ঠান, বাস, ট্রেন চালু রয়েছে। অর্থনীতি সচল রাখতে সবকিছু চালু রাখার পক্ষে সরকার। তাহলে শুধু বইমেলা বন্ধ রাখার যৌক্তিকতা কী? তারা দ্রুত সময়ের মধ্যে বইমেলা আয়োজনের দাবি জানান।
দেশে করোনা সংক্রমণ শুরুর পর আর সবকিছুর মতো বই বিক্রিও বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। প্রকাশক, বই বিক্রেতারা নিদারুণ সংকটের মুখোমুখি হন। প্রণোদনা চেয়ে দেন-দরবার করেছিলেন প্রকাশকরা। কিন্তু তা আলোর মুখ দেখেনি। কোনো কিছু না হওয়ায় শেষমেশ বইমেলাকে ঘিরেই আশা বুনছিলেন প্রকাশকরা। সেই বইমেলা আয়োজনও এখন অনিশ্চিত।
বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক কবি হাবীবুল্লাহ সিরাজী ইত্তেফাককে বলেন, করোনার ঝুঁকি থাকায় নির্দিষ্ট সময়ে বইমেলা হচ্ছে না। করোনার প্রকোপ কমে এলেই বইমেলার আয়োজন করা হবে। প্রকাশকদের সঙ্গে বসে সে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। বইমেলা আয়োজনের জন্য পূর্বপ্রস্তুতির প্রয়োজন হয়। সেজন্য কমপক্ষে দুই মাস আগে কাজ শুরু করতে হয়।
এদিকে, বইমেলার জন্য দুই মাসের প্রস্তুতি খুব বেশি সময় বলে জানাচ্ছেন প্রকাশকরা। তারা বলছেন, এতে বইমেলা মার্চের আগে আয়োজন করা যাবে না। এতে একুশে বইমেলার আবহ রইবে না।
অন্যপ্রকাশের প্রধান নির্বাহী মাজহারুল ইসলাম জানান, প্রকাশকদের রুটিরুজি থমকে আছে। দেশের কোথাও করোনা মহামারির সময় সৃজনশীল বই বিক্রি একেবারেই কমে গেছে। সেদিক থেকে বইমেলা আয়োজন করা হলে প্রকাশকরা কিছুটা হলেও আয় করতে পারতেন। সেটা এখন হচ্ছে না। ফলে, সামনের দিনগুলো সত্যিই কুয়াশাচ্ছন্ন।
গত কয়েক দিন ধরেই অমর একুশে বইমেলা হবে কি হবে না—ঘুরপাক খাচ্ছিল সেই আলোচনা। মেলার আয়োজক বাংলা একাডেমিও জনস্বার্থ বিবেচনায় বইমেলায় স্থগিতের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছিল। সেই প্রেক্ষাপটে মুখে মুখে রটে গিয়েছিল এবার আর বইমেলা সরাসরি হবে না। ভার্চুয়ালি অনুষ্ঠিত হবে একুশে গ্রন্থমেলা। পরে ভার্চুয়াল আয়োজন থেকে পিছিয়ে আসে বইমেলার আয়োজক প্রতিষ্ঠান বাংলা একাডেমি। যদি হয় তবে সেটা সোহরাওয়ার্দী উদ্যানেই হবে।
এ প্রসঙ্গে বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খান বলেন, বইমেলা হবে কি হবে না সেটা সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। এছাড়া, আমরা কিছু বলতে পারব না।
সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদ জানান, করোনা পরিস্থিতি গতিপ্রকৃতি বুঝে বইমেলা হবে কি হবে না তা সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
এদিকে, বইমেলার তারিখ নির্ধারণের জন্য সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদের সঙ্গে বৈঠক করেন প্রকাশকদের দুই সংগঠনের নেতৃবৃন্দ। সেসময় প্রকাশকরা বইমেলার সময় পরিবর্তন করে ১৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ১৭ মার্চ পর্যন্ত করার প্রস্তাব দেন। কিন্তু করোনা পরিস্থিতি কোথায় গিয়ে দাঁড়ায় তা আগে থেকে বোঝার উপায় নেই। সে কারণে কোনো নির্দিষ্ট তারিখ নির্ধারণ ছাড়াই সে বৈঠক শেষ হয়।
এর আগে গত ১০ ডিসেম্বর মেলার আয়োজক প্রতিষ্ঠান বাংলা একাডেমির নির্বাহী পরিষদের বৈঠকে ২০২১ সালের অমর একুশে বইমেলা সাময়িকভাবে স্থগিত করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। গণমাধ্যমে এ খবর প্রকাশিত হওয়ার পর থেকেই ক্ষোভ প্রকাশ করেন লেখক, প্রকাশক থেকে সাধারণ পাঠক।
এ পরিস্থিতিতে বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক হাবীবুল্লাহ সিরাজীর সঙ্গে বৈঠকে বসেন প্রকাশকদের দুই সংগঠন বাংলাদেশ জ্ঞান ও সৃজনশীল প্রকাশক সমিতি এবং বাংলাদেশ পুস্তক প্রকাশক ও বিক্রেতা সমিতির নেতৃবৃন্দ। বৈঠক শেষে একাডেমির মহাপরিচালক হাবীবুল্লাহ সিরাজী জানান, আসন্ন অমর একুশে গ্রন্থমেলা বাতিলের কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। আমরা আমাদের নির্বাহী পর্ষদের বৈঠকে আলোচনার ভিত্তিতে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের কাছে কিছু প্রস্তাবনা পাঠানো হয়েছিল। সে প্রস্তাবনায় বইমেলা করোনার কারণে না হলেও অমর একুশে অনুষ্ঠানমালা ভার্চুয়ালি করার সিদ্ধান্তের কথা মন্ত্রণালয়কে জানানো হয়েছিল।
এ বিষয়ে জ্ঞান ও সৃজনশীল প্রকাশক সমিতির সভাপতি ফরিদ আহমেদ বলেন, আলোচনার পর লেখক, প্রকাশক ও পাঠকদের সরাসরি উপস্থিতিতেই অমর একুশে বইমেলা অনুষ্ঠিত হবে।
ইত্তেফাক/জেডএইচডি
