গৌরবোজ্জ্বল পথচলার ৭৩ বছর

আপডেট : ০৪ জানুয়ারি ২০২১, ০৮:৫০

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যথার্থ বলেছিলেন, ‘বাংলাদেশের ইতিহাস, ছাত্রলীগের ইতিহাস’। ১৯৪০ সালে লাহোর প্রস্তাবের মাধ্যমে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলগুলোতে দুটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার রূপরেখা প্রদান করা হয়েছিল। জিন্নাহর চক্রান্তে শেষ পর্যন্ত হাজার কিলোমিটার ব্যবধানযুক্ত দুটি ভূখণ্ড কোনো ধরনের সাংস্কৃতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক সাযুজ্য ছাড়াই শুধু ধর্মের ভিত্তিতে পাকিস্তান নামে আত্মপ্রকাশ করে। পূর্ববঙ্গীয় নেতৃবৃন্দের যুক্ত বাংলা গঠনের প্রস্তাব ব্যর্থ হলে তারাও এটি একপর্যায়ে সানন্দে মেনে নেন। কিন্তু ক্ষমতার ভাগ-বাটোয়ারার নিরিখে উত্তর ভারতীয় উর্দুভাষী মুসলিমরা যে পাকিস্তান রাষ্ট্র আদায় করে নিলেন, স্বভাবতই স্বাধীনতার পর পরই নতুন রাষ্ট্রটির সামরিক-বেসামরিক প্রশাসন এরাই দখল করে নেয় এবং বাঙালি অধ্যুষিত পূর্বাংশকে নতুন উপনিবেশে পরিণত করে। স্বাধীনতার দুই বছরের মধ্যেই যখন ভারত সংবিধান প্রণয়ন করে সাধারণ নির্বাচন দিতে সক্ষম হয়, তখন পাকিস্তানের সংবিধান প্রণয়নে গড়িমসিসহ গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানসমূহ শক্তিশালীকরণে পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর ইচ্ছাকৃত বিলম্বকরণ এই রাষ্ট্রের রাজনৈতিক দেউলিয়াপনার মুখোশ উন্মোচন করে দেয়। পাকিস্তানের স্বাধীনতাকে বঙ্গবন্ধু আখ্যায়িত করেছিলেন ‘ফাঁকির স্বাধীনতা’ বলে। বাঙালিদের অবস্থা দাঁড়ায় ‘এক শকুনির হাত থেকে আরেক শকুনির হাতে পড়া’র মতো। বাংলাদেশের অনিশ্চিত ভবিষ্যত্ বঙ্গবন্ধুকে ভাবিয়ে তোলে। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন মুসলিম লীগের রাজনৈতিক আদর্শের অনুসারী ছাত্র-জনতাকে নিয়ে পরিস্থিতির উত্তরণ সম্ভবপর হবে না। এজন্য তিনি সমাজের প্রগতিশীল এবং প্রতিশ্রুতিশীল অংশকে ঐক্যবদ্ধ করার প্রচেষ্টা চালান। সেই প্রচেষ্টার প্রথম প্রয়াস ছিল বাংলাদেশ ছাত্রলীগের প্রতিষ্ঠা। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার মাত্র ৪ মাস ১৯ দিন পর (৪ জানুয়ারি, ১৯৪৮) প্রতিষ্ঠিত হলো বাংলাদেশের ইতিহাসের সঙ্গে ওষ্ঠেপৃষ্ঠে জড়িয়ে থাকা উপমহাদেশের সর্ববৃহত্ এবং প্রাচীন সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগ।

১৯৪৮ সালেই মাতৃভাষার প্রশ্নে আপসহীন নেতৃত্বের মধ্যদিয়ে শুরু যে পথচলা, তা পরবর্তী সময়ে বাঙালির প্রতিটি ন্যায়সঙ্গত অধিকার আদায়ের আন্দোলনে আলোকবর্তিকা হয়ে আভা ছড়িয়েছে। ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনকালে ২১ দফাকে জনতার দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার মাধ্যমে মুসলিম লীগকে পূর্ববাংলার রাজনীতি থেকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া, ১৯৫৬ সালে প্রণিত পাকিস্তানের সংবিধানে বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি আদায়, ১৯৫৭ সালের শিক্ষক ধর্মঘট এবং ১৯৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলনের পালে বাতাস দেয় ছাত্রলীগ। শেরেবাংলা এবং সোহরাওয়ার্দীর মৃত্যুর পরে বঙ্গবন্ধুর একক নেতৃত্বে যখন বাঙালি জাতি পশ্চিমা সামরিক শাসকগোষ্ঠীর সব নিপীড়ন ও অত্যাচারের বিরুদ্ধে লড়ছিলেন, তখনই বঙ্গবন্ধুসহ প্রথমসারির সব রাজনৈতিক নেতৃত্বকে কারান্তরীণ করার ফলে এক রাজনৈতিক শূন্যতার সৃষ্টি হয়। এমতাবস্থায় মুক্তির ঝাণ্ডা নিয়ে এগিয়ে আসে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ। বাঙালির মুক্তির সনদ ছয় দফাকে জনগণের দোয়ারে পরিচিত করে স্বাধিকার আন্দোলনের ভিত গড়ে তোলে ছাত্রলীগ। ছাত্রলীগের নেতৃত্বেই স্বৈরাচার আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে দুর্বার আন্দোলন গড়ে ওঠে, আন্দোলন সামাল দিতে না পেরে সরকার আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা বাতিল করে শেখ মুজিবকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়। অভূতপূর্ব গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে আইয়ুব সরকারকে বিতাড়িত করে শেখ মুজিবকে ছাত্রলীগের নেতৃত্ব বঙ্গবন্ধু উপাধি প্রদান করে। মহান মুক্তিযুদ্ধে ছাত্রলীগের ১৭ হাজার নেতাকর্মী আত্মবলিদান দিয়েছিলেন। মুজিব বাহিনী, ক্রাক প্লাটুনসহ মুক্তিযুদ্ধকালে সম্মুখ সমরে একাধিক বাহিনীকে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা নেতৃত্ব দিয়েছিলেন।

স্বাধীনতা-উত্তর যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ গঠনেও ছাত্রলীগের ভূমিকা অগ্রগণ্য ছিল। ১৫ আগস্টের পরপরই সামরিক রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে একমাত্র ছাত্রলীগই স্লোগান তুলেছিল ‘মুজিব হত্যার পরিণাম, বাংলা হবে ভিয়েতনাম’। সামরিক শাসকের বৈষম্যমূলক শিক্ষানীতির বিরুদ্ধে ১৯৮৩ সালের শিক্ষা আন্দোলন ও সর্বদলীয় সংগ্রামে ১০ দফা দিয়ে নেতৃত্ব দেয় ছাত্রলীগ। নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনেও নেতৃত্ব দেয় ছাত্রলীগ। সর্বোপরি স্বাধীনতা ও স্বাধিকার আদায়ের আন্দোলনের সাত দশকের সবচেয়ে সফল সাহসী সংগঠনের নাম বাংলাদেশ ছাত্রলীগ।

সারা বিশ্বে উগ্রপন্থা ও চরমপন্থি জাতীয়তাবাদী শক্তির উত্থানের বিপরীতে ছাত্রলীগ শুনিয়েছে তারুণ্যের জয়গান—ধর্মনিরপেক্ষ, উন্নয়নকামী এবং স্বাধীনতার পক্ষের গণতান্ত্রিক ধারাকে চলমান রাখতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে। আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, সাম্প্রদায়িক অপশক্তির বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক সময়ে একটি প্রগতিশীল ও অসাম্প্রদায়িক প্রজন্ম গঠনে ছাত্রলীগ সবচেয়ে অগ্রগণ্য ভূমিকা পালন করেছে—এটিই মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বাংলাদেশ গঠনে ছাত্রলীগের দেশবাসীকে উপহার। ভিশন রূপকল্প-২০২১ এবং ২০৪১ সালের উন্নত এবং সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়তে ডেমোগ্রাফিক ডেভিডেন্ড পিপলের যে ৩ কোটি তারুণ্যের শক্তি রয়েছে, সেই তারুণ্যকে জনসম্পদে পরিণত করতে হবে শিক্ষার সঙ্গে প্রযুক্তির সমন্বয় ঘটিয়ে, যাতে আগামী চতুর্থ শিল্পবিপ্লবে তারা নেতৃত্ব দিতে পারে। মৌলবাদ, জঙ্গিবাদ ও দারিদ্র্যমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয় হোক ছাত্রলীগের ৭৩তম জন্মদিনে। শুভ জন্মদিন।

লেখক :সাংগঠনিক সম্পাদক, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ

ইত্তেফাক/টিআর

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন