মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কি বিশ্বব্যাপী গণতন্ত্রের মোড়লীপনার অধিকার হারাচ্ছে? 

আপডেট : ০৮ জানুয়ারি ২০২১, ১৬:০৯

যুগ যুগ ধরেই উন্নয়নশীল, স্বল্পোন্নত তথা তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোকে গণতন্ত্র, মানবাধিকার আর আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার নামে চাপে রেখে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পৃথিবীব্যাপী তাদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে মোড়লের ভূমিকা পালন করে যাচ্ছিল। ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বে চার বছর আগে রিপাবলিকান সরকারের আগমনে ক্রমান্বয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার নৈতিক ভিত্তি দুর্বল হতে থাকে।

ডোনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হয়ে একের পর এক বিতর্কিত বিষয়কে সামনে এনে দিকভ্রান্ত, বর্ণবাদী, আদর্শহীন অযোগ্য রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবেই বিশ্ববাসীর সামনে প্রতিভাত হয়েছেন। ক্ষমতার অন্ধে মাতোয়ারা এই বিলিওনিয়ার প্রেসিডেন্ট, ব্যবসা-বাণিজ্যে সফল হলেও রাষ্ট্র পরিচালনা তথা বিশ্ব নেতৃত্বে কতটা অযোগ্য তার লক্ষ্মণগুলো আরও দু'বছর আগে থেকেই সুস্পষ্ট হতে থাকলেও বিগত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে সামনে রেখে তা পুরোপুরি বিশ্ববাসীর সামনে উন্মোচিত হয়। নির্বাচনে কারচুপির সম্ভাবনাকে সামনে এনে ডোনাল্ড ট্রাম্প যেকোনো মূল্যে ক্ষমতায় থাকার লক্ষ্যে দিশাহীন হয়ে পড়েন, করোনাকালে নিজ দেশের সরকার আর বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ঘোষিত বিধিনিষেধ অমান্য করে আইনের প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে গোঁয়ার্তুমির রাজা হিসেবেই নিজেকে তুলে ধরেছেন, তবুও আশ্চর্যজনকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের ভোটের ইতিহাসে রেকর্ডতম প্রতিদ্বন্দ্বিতা তৈরি করতে সক্ষম হয়েছিলেন।

প্রথমেই আসা যাক যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচন কি প্রশ্নবিদ্ধ ছিল? মোটেই তা নয়, ডোনাল্ড ট্রাম্প সময়ের পরিক্রমায় নানা অভিযোগ উত্থাপন করলেও প্রশাসন আর নির্বাচন সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো তার কোন অভিযোগের ভিত্তি আবিষ্কার করতে সক্ষম হয়নি। দেশটির জনগণ একটি নিরপেক্ষ, পক্ষপাতমুক্ত, অবাধ এবং সকল বিধিবিধান অনুসরণ করেই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে বলেই বিশ্বাস করে। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হচ্ছে, ক্ষমতায় থেকেও ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন যন্ত্রকে তার অনৈতিক পরিকল্পনায় ব্যবহার করতে সক্ষম হননি, আবার খোদ তার দল রিপাবলিকানকে ও সামগ্রিকভাবে তার চাপের কাছে নতি স্বীকার করাতেও ব্যর্থ হয়েছেন। তাই এটি অত্যন্ত দৃঢ়চিত্তেই বলা যায়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে গণতন্ত্র একটি অত্যন্ত সুদৃঢ় প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত বলেই অর্থ, বিত্ত, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা তদুপরি হোয়াইট সুপ্রিমেসির জোড়ে প্রচণ্ড জনপ্রিয়তা কোনো কিছুই ডোনাল্ড ট্রাম্পকে রক্ষা করতে পারেনি। 

আধুনিক রাষ্ট্র ব্যবস্থায় বর্ণবাদ, মানবাধিকারের লঙ্ঘন, উগ্র সাম্প্রদায়িক মৌলবাদের উত্থান কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। ডোনাল্ড ট্রাম্প অত্যন্ত সচেতনভাবেই এর সব কয়টি ধারণ করেছিলেন বলেই রেকর্ড পরিমাণ জনপ্রিয়তায় প্রতিটি রাজ্যেই শক্তিশালী প্রতিযোগিতা গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছিলেন, নির্বাচনে হেরেও ক্যাপিটাল হিলের সামনে নজিরবিহীন গণজমায়েত করে আক্রমণাত্মক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছিলেন। দুঃখজনক ভাবে আহত-নিহতের মধ্য দিয়ে এর সাময়িক পরিসমাপ্তি ঘটলেও পৃথিবীর ইতিহাসে ১৮১৪ সালের পর ২০২১ সালের ৬ জানুয়ারি ক্যাপিটাল হিলের এই সংঘবদ্ধ আক্রমণ একদিকে যেমন কলঙ্কজনক ইতিহাস হয়ে থাকবে অন্যদিকে বর্ণবাদীদের এই সাময়িক ব্যর্থতা ভবিষ্যতে তাদের আরও সংঘটিত হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করলেও অবাক হওয়ার কিছুই থাকবে না।

৬ জানুয়ারি ২০২১ ডেমোক্র্যাট আর রিপাবলিকান সমন্বয়ে মার্কিন কংগ্রেসের অধিবেশন, জো বাইডেন আর কমলা হ্যারিসের নেতৃত্বাধীন ডেমোক্র্যাটদের বিজয়কে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতির মাধ্যমে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শক্তিশালী গণতান্ত্রিক ভিত্তিকে বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরতে সক্ষম হলেও মার্কিনী সমাজে শক্তিশালী বর্ণবাদ আর উগ্র ধর্মান্ধতা কতটা শিকর গেড়েছে, এটিই এখন সবচেয়ে বড় আতঙ্ক আর উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। 

নানা প্রতিকূলতা ডিঙিয়ে জো বাইডেন আর কমলা হ্যারিস এর নেতৃত্বে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন সরকার সকল সাংবিধানিক প্রক্রিয়া প্রায় সম্পন্ন করেছেন, আর ক'দিন পরেই আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব পালন শুরু করবেন। ডোনাল্ড ট্রাম্প মার্কিন সমাজে বিদ্যমান বর্ণবাদ আর উগ্রবাদের যে চেহারা তুলে ধরেছেন, জো বাইডেনের সরকার এই চ্যালেঞ্জকে মোকাবেলা করতে ব্যর্থ হলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র একদিকে যেমন মানবাধিকার, সাম্য, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় বিশ্ব সমাজে নেতৃত্ব দেয়ার নৈতিক মনোবল হারাবেন, বিপরীতে গণতন্ত্রের মোড়লীপনা ও একদিন প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে উঠতে পারে!

লেখক : কলামিস্ট, উন্নয়ন গবেষক ও সমাজতাত্ত্বিক বিশ্লেষক 


ইত্তেফাক/ইউবি