শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের এনার্জি পলিসি ইনস্টিটিউটের তথ্য
মোরশেদা ইয়াসমিন পিউ
রাজধানীর একটি স্কুলের গণিতের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক রফিকুল ইসলাম (৬৭)। শ্বাসকষ্টের রোগী রফিকুল ইসলাম বলেন, শিক্ষার্থী পড়িয়েই তার সংসার চলে। অথচ শীতের সময় পড়াতে তার খুব কষ্ট হয়। শুষ্ক মৌসুমে বাইরে বের হলেই অসুস্থ হয়ে পড়েন। একই সমস্যা তার ছোট নাতনিরও। রাস্তায় বের হলেই বাচ্চাটা হাঁচি-কাশিতে অসুস্থ হয়ে পড়ে। শুধু সড়কের ধুলার কারণে এমনটা হয় বলে জানান তিনি।
বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোয় বায়ুদূষণের কারণে মানুষের গড় আয়ু দুই থেকে পাঁচ বছর পর্যন্ত কমে যাচ্ছে। বায়ুদূষণের কারণে বাংলাদেশে বছরে ১ লাখ ২২ হাজার ৪০০ মানুষের মৃত্যু হচ্ছে। শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের এনার্জি পলিসি ইনস্টিটিউট (ইপিআইসি) পরিচালিত এয়ার কোয়ালিটি লাইফ ইনডেক্সের তথ্য এটি। আর বাংলাদেশের পরিবেশ অধিদপ্তরের দায়িত্বপ্রাপ্তরা বলেছেন, শীতে বায়ুদূষণের মাত্রার পাশাপাশি বাড়ে সংক্রমণ রোগের ঝুঁকি। তাদের মতে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এখনই কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে দুর্ভোগ আরো বাড়াতে পারে। পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্য মতে, ঢাকার চার পাশে থাকা ইটভাটাগুলো বায়ুদূষণের অন্যতম প্রধান কারণ। সাধারণত ইটভাটাগুলো প্রতি বছর শীত মৌসুমে অর্থাত্ নভেম্বর থেকে পুরোদমে চালু হয়। আর এগুলোয় ইট উত্পাদন চলে মে থেকে এপ্রিল পর্যন্ত। সংস্থাটির গবেষণা মতে, রাজধানীর চারপাশে থাকা ইটভাটাগুলো ৫০ শতাংশ ক্ষেত্রেই বায়ুদূষণের জন্য দায়ী।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, শুষ্ক মৌসুমে ঢাকা মহানগরীতে ধুলাদূষণের প্রকোপ অত্যন্ত বেড়ে যায়। এই মৌসুমেই হাজার হাজার ইটভাটায় ইট প্রস্তুত ও পোড়ানোর পাশাপাশি মহানগরীতে অপরিকল্পিতভাবে গ্যাস, বিদ্যুত্, পানি, ড্রেনেজ এবং রাস্তাঘাট উন্নয়ন, মেরামত ও সংস্কার কার্যক্রমের আওতায় রাস্তাঘাট খোঁড়াখুঁড়ির পাশাপাশি আচ্ছাদনহীন ট্রাকে করে শহরে পরিবহন করা, ড্রেন পরিষ্কার করে রাস্তার পাশে ময়লা স্তূপ করে রাখা, দোকানপাট ও গৃহস্থালির আবর্জনা যেখানে সেখানে ফেলে রাখা, মেরামতহীন ভাঙাচোরা রাস্তায় যানবাহন চলাচল, পাকা ভবন নির্মাণের সময় মাটি, বালু, ইটসহ অন্যান্য নির্মাণসামগ্রী রাস্তা-ফুটপাতে ফেলে রাখা, শিল্পপ্রতিষ্ঠানের ধোঁয়া, ইত্যাদি ধুলাদূষণের অন্যতম উত্স। এসব উত্স থেকে বিপুল পরিমাণ ধুলা বাতাসে মিশে জনস্বাস্থ্য, পরিবেশ ও অর্থনীতিতে বিরূপ প্রভাব ফেলছে।
প্রিভেনটিভ মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী বলেন, বিশ্বে দূষিত বায়ুর শহরগুলোর মধ্যে দ্বিতীয় অবস্থানে ঢাকা। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা সংস্থা হেলথ ইফেক্টস ইনস্টিটিউট এবং ইনস্টিটিউট ফর হেলথ মেট্রিকস অ্যান্ড ইভালুয়েশনের যৌথ উদ্যোগে প্রকাশিত ঐ প্রতিবেদন বলা হয়—বায়ুদূষণের কারণে বাংলাদেশে বছরে ১ লাখ ২২ হাজার ৪০০ মানুষের মৃত্যু হচ্ছে।
বায়ুদূষণ পর্যবেক্ষণকারী আন্তর্জাতিক সংস্থা ‘এয়ার ভিজুয়াল’-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০১৯ সালের নভেম্বর থেকে ২০২০ সালের মার্চ পর্যন্ত এক দিনের হিসাবে বায়ুদূষণের তালিকায় বেশ কয়েক বার ঢাকার নাম ১ নম্বরে উঠে আসে। যদিও গত বছর করোনার কারণে এ মাত্রা অনেকটা কমে গিয়েছিল। কিন্তু স্বাভাবিক জীবনযাত্রা শুরুর সঙ্গে আবার বায়ুদূষণের মাত্রা উদ্বেগজনক পর্যায়ে চলে যায়। জানা যায়, প্রতি বছর প্রায় আড়াই হাজার কোটি ইট বিভিন্ন কাজে ব্যবহূত হয়। এর প্রায় ৪০ শতাংশ সরকারি নির্মাণকাজে ব্যবহূত হয়। কিন্তু এ পরিমাণ ইটের বদলে যদি পরিবেশসম্মত ব্লক ব্যবহার করা যায় তাহলে দূষণ অনেকাংশে কমে আসবে।
আন্তর্জাতিক গবেষণা বলছে, বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোয় বায়ুদূষণের কারণে মানুষের গড় আয়ু দুই থেকে পাঁচ বছর পর্যন্ত কমে যাচ্ছে। বায়ুদূষণের সবচেয়ে বেশি শিকার হচ্ছে শিশু ও বয়স্করা। গ্লোবাল বার্ডেন অব ডিজিজ স্টাডির তথ্যে, বাংলাদেশে বায়ুদূষণ ১১ শতাংশ ডায়াবেটিস, ১৬ শতাংশ ফুসফুসের ক্যানসার, ১৫ শতাংশ দীর্ঘমেয়াদি ফুসফুসের রোগ, ১০ শতাংশ হূদেরাগ ও ৬ শতাংশ স্ট্রোকের জন্য দায়ী। পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের (পবা) চেয়ারম্যান আবু নাসের খান বলেন, ঢাকায় বায়ুদূষণের মাত্রা ক্রমেই বেড়ে চলেছে। বায়ুদূষণের প্রধান উত্সগুলো চিহ্নিত করে, সেগুলোর উত্স কমানো বা বন্ধ করার ফলপ্রসূ উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
