ক্যালেন্ডারের পাতায় তারিখ ১০ জানুয়ারি, ১৯৭২। বাঙালির ইতিহাসের এক অসম্ভব গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়। ভোরের মৃদু হিমেল হাওয়ায় ঝরাপাতা সরে যায় রাজপথ থেকে। অধীর আগ্রহে লাখ লাখ মানুষ অপেক্ষা করেন তাদের মহান নেতার জন্য। সকাল পেরিয়ে দুপুর গড়ায়, তার মধ্যে পথে নেমে এসেছে অজস্র মানুষের ঢল। দলে দলে লাখ লাখ মানুষ বিমানবন্দর থেকে রেসকোর্স ময়দানের (বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) দিকে এগিয়ে যায়। কি অসম্ভব সুন্দর একটি দিন! যেই রাজপথে বায়ান্নয় বাংলার দামাল ছেলেরা রক্ত দিয়েছে, যেই রাজপথ ১৯৭১ সালে রাঙিয়েছে বাংলার দামাল ছেলেরা সেখানে কী ভীষণ সুন্দর মুক্তির উৎসব! স্বাধীন দেশের রাজপথে স্বাধীন কণ্ঠে মুক্তির গান—এ যেন এক অবর্ণনীয় অনুভূতি। ঢাকার রাজপথ কেঁপে উঠেছে চেতনার উচ্ছ্বাসে। সমবেত জনতা স্বতঃস্ফূর্তভাবে এগিয়ে যাচ্ছেন দৃপ্ত পদক্ষেপে। বিজয়ের আনন্দে উজ্জ্বল প্রতিটি মুখ। তাতে নেই কোনো ভয়, দ্বিধা, সংকোচ। বিজয়ের মিছিলে যেন সমুদ্রের মতো গভীরতা সেই জনতার ঢলে। পূর্ব আকাশে আঁধার ভেঙে যে রক্তলাল সূর্য উঠেছে, লাখ লাখ বিজয়ী জনতা তার দিকে মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। রক্ত ও ভালোবাসার দামে কেনা বাংলাদেশ, যার ডাকে স্বাধীন হয়েছে আজ তার ঘরে ফেরার দিন। আর তাই তো এই ভালোবাসার মিছিল।
১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সর্বস্তরের জনগণকে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ-লড়াই শুরু করার ডাক দেন।
এরপর পাকিস্তানের সামরিক শাসক জেনারেল ইয়াহিয়া খানের নির্দেশে বঙ্গবন্ধুকে তার ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের বাসা থেকে গ্রেফতার করে তদানীন্তন পশ্চিম পাকিস্তানের কারাগারে নিয়ে আটক রাখা হয়। জাতির জনক পাকিস্তান থেকে ছাড়া পান ১৯৭২ সালের ৭ জানুয়ারি দিবাগত রাতে। সকাল সাড়ে ৬টায় তিনি পৌঁছান লন্ডনের হিথরো বিমানবন্দরে। পরে ব্রিটেনের বিমান বাহিনীর একটি বিমানে করে ৯ জানুয়ারি প্রিয় স্বদেশের পথে যাত্রা করেন এই মহান নেতা। ১০ জানুয়ারি সকালে তিনি দিল্লিতে নামেন। সেখানে ভারতের রাষ্ট্রপতি ভি ভি গিরি, প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী, সমগ্র মন্ত্রিসভা, প্রধান নেতৃবৃন্দ, তিন বাহিনীর প্রধান এবং অন্যান্য অতিথি ও সে দেশের জনগণের কাছ থেকে উষ্ণ সংবর্ধনা লাভ করেন তিনি। বঙ্গবন্ধু ঢাকা এসে পৌঁছান ১০ জানুয়ারি।
বাঙালি জাতি বারবার বহিঃশত্রুর শোষণ-বঞ্চনার শিকার হয়ে আসছিল। বঙ্গবন্ধুর নামের সঙ্গে তার বাংলাদেশ একাত্ম হয়ে আছে। তার দীর্ঘ সংগ্রাম, বিপ্লব, ত্যাগ এবং আপসহীন মানসিকতার কারণেই পৃথিবীর মানচিত্রে জন্ম নিয়েছে একটি স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের, একটি পতাকার এবং একটি মানচিত্রের। বঙ্গবন্ধুকে নানা ঘাত-প্রতিঘাত পার হয়ে হাঁটতে হয়েছে স্বাধীনতার পথে। ৫২-এর ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ছয় দফা, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা, ৬৯-এর গণআন্দোলন, ৭০-এর নির্বাচন এবং সবশেষে মুক্তিযুদ্ধ। এসব ঘাত-প্রতিঘাত পার হয়ে তিনি দেশ স্বাধীন করেছেন।
১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালের এই দিনে পাকিস্তানের বন্দিত্ব থেকে মুক্তি পেয়ে এই অবিসংবাদী নেতা তার স্বাধীন-সার্বভৌম সোনার বাংলায় পা রাখেন। বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের মধ্য দিয়ে বাঙালি জাতির আশা-আকাঙ্ক্ষা পরিপূর্ণতা পায়। ৯ মাসের সশস্ত্র ও রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধে দেশ স্বাধীন হলেও প্রকৃতপক্ষে তার দেশে ফিরে আসার মধ্য দিয়েই বাঙালির বিজয় পরিপূর্ণতা লাভ করে।
আর অবরুদ্ধ বাংলাদেশে যখন পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ চলছে, ঠিক তখন পশ্চিম পাকিস্তানে প্রহসনের বিচারে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ফাঁসির আদেশ দেওয়া হয়। কারাগারের সেলের পাশে তার জন্য কবর পর্যন্ত খোঁড়া হয়। কিন্তু বাঙালির বুকভরা নিখাদ ভালোবাসা তাদের নেতার প্রতি আর আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের চাপে অবিসংবাদিত নেতা শেখ মুজিবুর রহমানকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয় পাকিস্তান সরকার। বিজয়ীর বেশে তার প্রিয় স্বদেশে ফিরে আসেন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ এই বাঙালি। স্বয়ং জাতির পিতা তার এ স্বদেশ প্রত্যাবর্তনকে আখ্যায়িত করেছিলেন ‘অন্ধকার হতে আলোর পথে যাত্রা’। বিকাল পাঁচটায় রেসকোর্স ময়দানে প্রায় ১০ লাখ লোকের উপস্থিতিতে ভাষণ দেন স্বাধীনতার স্বপ্নদ্রষ্টা, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। শেখ মুজিব সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে দাঁড়িয়ে তার ঐতিহাসিক সম্মোহনী বক্তৃতায় বলেন, ‘যে মাটিকে আমি এত ভালোবাসি, যে মানুষকে আমি এত ভালোবাসি, যে জাতিকে আমি এত ভালোবাসি, আমি জানতাম না সে বাংলায় আমি যেতে পারব কি-না। আজ আমি বাংলায় ফিরে এসেছি বাংলার ভাইয়েদের কাছে, মায়েদের কাছে, বোনদের কাছে। বাংলা আমার স্বাধীন, বাংলাদেশ আজ স্বাধীন।’
প্রিয় নেতাকে ফিরে পেয়ে সেদিন সাড়ে ৭ কোটি বাঙালি আনন্দাশ্রুতে সিক্ত হয়ে জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু ধ্বনিতে প্রকম্পিত করে তোলে রেসকোর্সের আকাশ বাতাস। সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালির ঘরে ফেরার আনন্দে বাংলার মানুষের গাল বেয়ে অশ্রু ঝরে পড়ে স্বাধীন বাংলার মাটিতে। অস্তমিত সূর্যের আলোয় চিকচিক করে ওঠে সে অশ্রুকণা। ‘অন্ধকার হতে আলোর পথে যাত্রা’ শুরু হয় বাঙালি জাতির। আজ জাতির পিতার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবসে সমগ্র জাতির প্রার্থনা বঙ্গবন্ধুকন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাত ধরে, বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নকে হৃদয়ে ধারণ করে যাতে এই আলোর পথে যাত্রা অব্যাহত থাকে।
লেখক : আইনজীবী, সুপ্রিম কোর্ট
ইত্তেফাক/এমআর
