করোনা আসিয়া সকল কিছু এলোমেলো করিয়া দিয়াছে। লঘু হইতে গুরু—জীবনের সকল কিছুর মধ্যে প্রবলভাবে প্রবিষ্ট হইয়াছে করোনার প্রভাব। প্রায় ১০ মাস ধরিয়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ। এখনো অস্বাভাবিক বাতাবরণ বহিয়া যাইতেছে সকল দিকে। এমন অবস্থায় প্রচলনের পর হইতে অমর একুশে গ্রন্থমেলা এইবারই প্রথম পহেলা ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত হইবে না। প্রথম দিকে অবশ্য ভাবনা ছিল, বইমেলা উত্সবটি ভার্চুয়াল করিবার। অবশ্য গত রবিবার সংস্কৃতি বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী জানাইয়াছেন, ২০২১ সালের অমর একুশে বইমেলার তারিখ নির্ধারণ হয় নাই বটে, তবে করোনা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসিলে শারীরিক উপস্থিতিতেই বইমেলা হইবে। একুশে ফেব্রুয়ারিকে সামনে রাখিয়া ২০ ফেব্রুয়ারি, মুজিববর্ষকে সামনে রাখিয়া ১৭ মার্চ অথবা স্বাধীনতা দিবসকে সামনে রাখিয়া ২৭ মার্চ—এই তিন তারিখের যে কোনো একটিতে মেলা শুরু হইতে পারে। এই মর্মে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নিকট প্রস্তাব রাখিবার কথা জানা গিয়াছে।
করোনার এই মহামারির মধ্যে গ্রন্থমেলা অনুষ্ঠিত হওয়া উচিত কি না—এই বিষয়ে উভয় দিকেই যুক্তি রহিয়াছে। তবে মনে রাখিতে হইবে, করোনা পরিস্থিতি ক্রমশ উন্নত হইলেও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলিবার মতো সাহসী সিদ্ধান্ত সরকার কিন্তু এখনো গ্রহণ করিতে পারে নাই। ইহাতে কোটি কোটি শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবন একরকম থমকাইয়া থাকিলেও শিক্ষার্থীদের জীবনের ঝুঁকি লইবার মতো অনুকূল পরিস্থিতি এখনো তৈরি হয় নাই। বইমেলার ক্ষেত্রেও বলা যায়, বর্তমান অবস্থা একটি যুদ্ধকালীন পরিস্থিতির মতো, সুতরাং সকল উত্সব পূর্ববর্তী বত্সরগুলির মতো নাও অনুষ্ঠিত হইতে পারে। ইহাতে হতাশার কিছু নাই। কারণ, ইহা জীবন-মরণের প্রশ্ন। যদিও বলা হইতে পারে, কোনো কিছুই তো থামিয়া নাই, তাহা হইলে বইমেলা কেন স্থগিত হইবে বা পিছাইতে হইবে? আসলে অর্থনীতিকে সচল রাখিবার জন্য যতটুকু সচল না রাখিলেই নহে, ততটুকুই সচল রহিয়াছে। এই জন্য আমরা করোনা সংক্রমণকে বহুলাংশে সফলভাবে মোকাবিলা করিতে পারিতেছি। ইহা ঠিক যে, মননশীল সৃজনশীল মানুষের নিকট গ্রন্থমেলার গুরুত্ব অপরিসীম। ভালো বই এক অর্থে অমূল্য রতন। অন্ধ-জ্ঞানশূন্য জগতের উলটাপাশে শক্ত প্রাচীরের মতো দাঁড়াইয়া রহিয়াছে বই, যেইখানে ঝলমল করিতেছে মুক্তির আলো। এই জন্যই বলা হয়, ভালো বই হইল অজ্ঞজগতের মধ্যে সবচাইতে সুন্দর একটি জানালা—যাহার বাহিরে অপেক্ষা করিয়া থাকে অপরূপ এক সুবিশাল জগত্। বই এমনই এক মহাসেতু, যাহার উপর দিয়া না হাঁটিলে ডুবিয়া থাকিতে হয় চির অমানিশায়। ব্রিটিশ মিউজিয়ামে বই লইয়া লেখা আছে—‘যে দ্রব্যটি তুমি ধরিয়া আছ তাহাকে যত্ন করো—ইহা যে সোনার চাইতেও দামি। যদি বই না থাকে তাহা হইলে টুকরা হইয়া যাইবে এই সভ্যতা।’
অমর একুশে গ্রন্থমেলায় বিগত কয়েক বত্সর ধরিয়া গড়ে ৫ সহস্রাধিক নূতন বই প্রকাশ হইয়া থাকে। বাংলাভাষী প্রায় ১৬ কোটির একটি দেশে গ্রন্থমেলায় ৫ হাজার বইয়ের প্রকাশ খুব বেশি নহে। যদিও জনসংখ্যার তুলনায় আমাদের পাঠকসংখ্যার অনুপাত খুব ভালো নহে। তবে প্রতি বত্সরই পূর্বের বত্সরের তুলনায় বই বিক্রয় বাড়িতেছে। আমাদের প্রায় সকল সৃজনশীল প্রকাশন সংস্থা সারা বত্সর ধরিয়া তাকাইয়া থাকে অমর একুশে গ্রন্থমেলার দিকে। অন্যদিকে গ্রন্থমেলায় অংশগ্রহণের জন্য যাবতীয় প্রস্তুতি ও পরিচালনার জন্য যথেষ্ট সময়ের প্রয়োজন। সুতরাং গ্রন্থমেলা যদি করিতেই হয়, তবে তাহা যেন শেষ মুহূর্তে ঘোষণা করিয়া হযবরল পরিস্থিতি সৃষ্টি না করা হয়। সকল দিক ঠিক রাখিয়া গ্রন্থমেলা করা সম্ভব কি না—তাহা স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও বোদ্ধামহলের পরামর্শ মোতাবেক সিদ্ধান্ত নেওয়া হউক।
