শুভ জন্মদিন, নির্মূল কমিটি

আপডেট : ১৮ জানুয়ারি ২০২১, ২১:৩২

পুরো নাম ‘একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি’, একটি সংগঠনের জন্য নামটি যথেষ্ট লম্বা, বলতে সময় লাগে। কিন্তু গত ২৯ বছরে এটি এই দেশের জন্য এতবার ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন করেছে যে, আজকাল আর পুরো নাম বলতে হয় না, নির্মূল কমিটি বললেই সবাই বুঝে নেয় , কাদেরকে নির্মূল করার জন্য এই সংগঠন। এটি যখন জন্ম নেয়, ১৯৯২ সালের ১৯ জানুয়ারি, আমি তখন আমেরিকায়। তখন ইমেইল ইন্টারনেটের জন্ম হয়নি, দেশের খবরাখবর সরাসরি পাই না, ঘুরেফিরে পেতে হয়। যেটুকু খবর পাই শুনে মন খারাপ হয়ে যায়। কিছু একটা করার ইচ্ছে করে, কী করব বুঝতে পারি না। সমমনা যারা আছি তারা মিলে ভাবলাম, মুক্তিযুদ্ধের পর ঠিক দুই দশক পার হয়েছে, ‘বিশ বছর পর’ নাম দিয়ে একটা সংকলন বের করা যাক, যেখানে মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের সব বিশিষ্ট মানুষজনের লেখা ছাপা হবে। দেশের বিশিষ্ট মানুষজনের ভেতর হুমায়ূন আহমেদ ছাড়া আমি কাউকে চিনি না, আমাকেও কেউ চেনে না; তাই বললাম, আমি সম্পাদনার কাজটুকু করে দেব। কেউ যেন মনে না করে সম্পাদনার কাজটুকু খুব সহজ, কারণ অনেকে নিশ্চয়ই অনুমানও করতে পারবে না, ৩০ বছর আগে আমেরিকাতে বাংলায় একটা বই বের করতে হলে সেই বইটি কম্পোজ করার দায়িত্বও সম্পাদকের! কাজটুকু তখন গুরুতর কঠিন কারণ, তখনো কম্পিউটারে বাংলা লেখার কাজটি মোটেও সহজ ছিল না। দায়িত্ব ঠিক আমার ঘাড়ে এসে পড়েছে, তার কারণ আমি কম্পিউটারে বাংলা লেখার একটা পদ্ধতি দাঁড়া করিয়েছি, উত্তর আমেরিকার অনেকেই সেই পদ্ধতি ব্যবহার করে তখন পত্রপত্রিকা বের করে।

সেই বইটি প্রকাশনার দায়িত্ব নিয়েছিলেন মুক্তিযোদ্ধা ডক্টর নুরুন নবী। সবার সঙ্গে যোগাযোগ আছে, সবাইকে চেনেন! তিনি সবার কাছ থেকে লেখা বের করে আনলেন, আমি সেই লেখাগুলো টাইপ করি আর দীর্ঘশ্বাস ফেলি। শহিদজননী জাহানারা ইমামের লেখার শিরোনাম, ‘বিশ বছরের বিষ-বাষ্প’, ভেতরে লিখেছেন, ‘বিশ বছর পর একটি কথাই চিত্কার করে বলতে ইচ্ছা করছে ‘বিশ বছরের বিষবাষ্পে সারা দেশ এবং জাতি আজ শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থায় মৃত্যুর প্রহর গুনছে।’ কী ভয়ংকর একটি কথা! কবীর চৌধুরীর লেখাটির শিরোনাম, ‘স্বাধীন বাংলাদেশের বিশ বছর : হিসাব কি মেলে?’ প্রফেসর আনিসুজ্জামানের লেখার প্রথম লাইনটিই ছিল, ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতা লাভের কুড়ি বছর পর দেশের হতশ্রী অবস্থা দেখে স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে, আমরা কী চেয়েছিলাম আর কী পেলাম?’ হুমায়ূন আহমেদ লিখেছেন যুদ্ধাপরাধী শর্ষিনার পিরের স্বাধীনতা পদক প্রাপ্তি নিয়ে, তার লেখার শেষ লাইন, ‘হায়, এই দুঃখ আমি কোথায় রাখি?’ দেশ স্বাধীন হওয়ার ২০ বছর পর কেন শুধু দুঃখ, হতাশা ও ক্ষোভ থাকবে?

ঠিক তখন দেশ থেকে একটা বিস্ময়কর খবর পেলাম, ১৯৯২ সালের ২৬শে মার্চ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে গণ-আদালত করে সেখানে গোলাম আযমের বিচার করা হবে। আমরা কৌতূহল এবং উত্সাহ নিয়ে অপেক্ষা করতে থাকি। বিচার শেষ হওয়ার পর একটু একটু করে খবর পেলাম। পুলিশ মঞ্চ করতে দেয়নি, মাইকও কেড়ে নিয়েছিল, দুটি ট্রাক পাশাপাশি জোড়া দিয়ে মঞ্চ বানিয়ে সেখানে গণ-আদালত করা হয়েছে। সেই গণ-আদালতে নাকি শুধু মানুষ আর মানুষ, বিশাল সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে তিল পরিমাণ জায়গা খালি ছিল না। বিচারকমণ্ডলীর সভাপতি শহিদজননী জাহানারা ইমাম। গণ-আদালতের বিচারের রায়ে গোলাম আযমকে দোষী সাব্যস্ত করে তার ফাঁসির রায় দেওয়া হয়েছে। বাসা থেকে চিঠিপত্র আসছে, সেখান থেকেও খবর পাচ্ছি, একটা খবর আমার জন্য খুবই চমকপ্রদ। আমার মা গণ-আদালতের সেই ট্রাক দিয়ে তৈরি মঞ্চে ছিলেন, বিশাল একটা ঐতিহাসিক ঘটনায় আমাদের পরিবারেরও একটু স্পর্শ আছে। কী আশ্চর্য!

একটি বিশাল ঘটনা এমনি এমনি হয়ে যায় না। সেটি হওয়ার জন্য তার পেছনে কোনো না কোনো মানুষের কিংবা কোনো না কোনো সংগঠনের কাজ করতে হয়। এই গণ-আদালতের আয়োজন করেছে ৭২টি রাজনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক সংগঠন মিলে তৈরি ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন ও একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল জাতীয় সমন্বয় কমিটি’। এর এক মাস আগে ১৯শে জানুয়ারি জন্ম নিয়েছে ‘একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি’। নির্মূল কমিটির সভাপতি শহিদজননী জাহানারা ইমাম। আমি জাহানারা ইমামকে চিনি তার ‘একাত্তরের দিনগুলি’ বই থেকে। তিনি যে এত বড় একটা আন্দোলনের নেতৃত্ব দিতে পারেন, আমি সেটা জানতাম না।

এর মধ্যে একদিন জানতে পারলাম জাহানারা ইমাম নিউ ইয়র্কে আসছেন। আমাদের উত্তেজনার শেষ নেই। যখন এসেছেন একদিন আমি তার সঙ্গে দেখা করতে গেলাম, হাতে তার লেখা ‘একাত্তরের দিনগুলি’ বইটি। খুবই মুখ কাঁচুমাচু করে বললাম, ‘আপনি আমাকে চিনবেন না, আমার বড় ভাই হুমায়ূন আহমেদ—আমার নাম মুহম্মদ জাফর ইকবাল।’

জাহানারা ইমাম আমাকে থামিয়ে বললেন, “আমি তোমাকেও চিনি, তোমার একটা বই আছে বইটার নাম ‘কপোট্রনিক সুখ দুঃখ’।” তারপর আমার সেই বইটা সম্পর্কে খুবই দয়ার্দ্র কিছু কথা বললেন। শুনে আমি হতবাক হয়ে গেলাম এবং সেই মুহূর্তে আমার জীবনের একটা বড় পরিবর্তন হলো। আমি একটু-আধটু লেখালেখি করি, দেশে মাঝেমধ্যে সেই বই প্রকাশিত হয়, বইয়ের ভালোমন্দ জানি না, কেউ সেই বই কোনো দিন পড়ে কি না তারও খবর পাই না, কাজেই তখন লেখালেখি নিয়ে আমার কোনো উত্সাহ বা আগ্রহ নেই। শহিদজননী জাহানারা ইমামের দয়ার্দ্র কথা শুনে আমার মনে হলো, তার মতো একজন মানুষ যদি আমার বই নিজ থেকে আগ্রহ নিয়ে পড়তে পারেন, তাহলে আমি কেন লিখব না? আমাকে লিখতেই হবে। যা হয় হোক, আমি লিখে যাব। সেই যে লেখালেখি শুরু করেছি আর থামিনি—এখনো লিখে যাচ্ছি!

আমি ‘একাত্তরের দিনগুলি’ বইটিতে জাহানারা ইমামের অটোগ্রাফ নেওয়ার জন্য তার হাতে দিয়ে বললাম, ‘এই বইটি পড়তে আমার খুব কষ্ট হয়েছে।’ জাহানারা ইমাম বললেন, ‘এই বইটি লিখতে আমারও খুব কষ্ট হয়েছে, আমি বুকে পাথর বেঁধে এই বইটি লিখেছি।’

শহিদজননী জাহানারা ইমামের সঙ্গে সেই যে আমার একটা আন্তরিক সম্পর্ক হয়ে গেল, সেটি তার জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত বজায় ছিল। আমেরিকায় গাড়ি করে যাওয়ার সময় পেছনের সিটে তার সঙ্গে বসে কত কী গল্প করেছি! আমি খুব অবাক হয়ে দেখতাম, যেই মানুষটি বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধীর বিরুদ্ধে একটি বিশাল আন্দোলন গড়ে তুলেছেন, যার ভয়ে রাজাকার-আলবদরেরা  থরথর কম্পমান, সেই মানুষটি আসলে একেবারে ছোট একটি বাচ্চা মেয়ের মতো সহজ-সরল!

মনে আছে, যখন আমরা টের পেলাম এই পৃথিবীতে তার সময় ফুরিয়ে এসেছে তখন নিউ ইয়র্ক, নিউ জার্সি এলাকা থেকে আমরা অনেকে সারা রাত গাড়ি চালিয়ে মিশিগানে তার সঙ্গে শেষবারের মতো দেখা করতে গিয়েছিলাম। হাসপাতালের কেবিনে অল্প কিছক্ষণের জন্য আমরা দুজন দুজন করে তার সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছি, তখন মুখে আর কথা বলতে পারেন না। কাগজে লিখে আমাদের সঙ্গে বক্তব্য বিনিময় করলেন। আমাদের সান্ত্বনা দিলেন, তারপর কাগজে লিখলেন, একদিন দেশের মাটিতে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হবে।

এর কয় দিন পর তিনি মারা গেলেন। বিশ্বাস করা কঠিন, তখনো তিনি খালেদা জিয়া সরকারের দেওয়া দেশদ্রোহীর মামলার আসামি! যুদ্ধাপরাধীদের বিচার সম্পর্কে তার কথা অবশ্য ভুল হয়নি। প্রায় আট বছর আগে এই দেশে সত্যিই যুদ্ধাপরাধীর বিচার শুরু হয়েছে। সেই বিচারে অনেকের অপরাধ প্রমাণিত হয়ে রায় হয়েছে, শাস্তি হয়েছে, শাস্তি কার্যকর হয়েছে। বিচার শেষ হয়নি, এখনো চলছে। গণ-আদালত দিয়ে সেই যে মানুষের ভেতর মুক্তিযুদ্ধের জন্য ভালোবাসা এবং যুদ্ধাপরাধীদের জন্য প্রবল ঘৃণার জন্ম হয়েছিল, সেটি কখনোই থেমে যায়নি। 

১৯৯৪ সালে জাহানারা ইমামের মৃত্যুর পর নির্মূল কমিটির আন্দোলন থেমে গেলে কিংবা কমে গেলে অবাক হওয়ার কিছু ছিল না। কিন্তু সেটা হয়নি। একজনের পর একজন নেতৃত্ব দিয়ে গিয়েছেন। মনে হয়, এটি সবচেয়ে দীর্ঘদিন থেকে চলমান একটি আন্দোলন। বাংলাদেশের বিশিষ্টজনদের প্রায় সবাই কোনো না কোনোভাবে এর সঙ্গে জড়িত—সেই কবি সুফিয়া কামাল, কবি শামসুর রাহমান, অধ্যাপক আহমদ শরীফ,  কথাশিল্পী শওকত ওসমান, অধ্যাপক কবীর চৌধুরী থেকে শুরু করে তাদের পরবর্তী প্রজন্মের প্রায় সব বিশিষ্ট কবি, সাহিত্যিক, পেশাজীবীরা, এরপর তার পরের প্রজন্ম, এখন তার পরের প্রজন্মের তরুণেরা এসেছে, আসছে। নামটিতে ‘একাত্তরের ঘাতক দালাল’দের  নির্মূলের কথা বলা হলেও এটি এই দেশে মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রাখা থেকে শুরু করে অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ে তোলা, মৌলবাদীদের বিরুদ্ধে আন্দোলন—এর সবকিছুতে সোচ্চার। মনে হয়, এই দেশের মূল আদর্শের বিরুদ্ধে পান থেকে চুন খসলেও সেটি নির্মূল কমিটির নজর এড়ায় না! তারা এর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায়। নির্মূল সমন্বয় কমিটি আরো একটি বড় কাজ করেছিল, সেটি হচ্ছে কবি সুফিয়া কামালের নেতৃত্বে গণতদন্ত কমিশন তৈরি করে দুটি অসাধারণ রিপোর্ট প্রকাশ করেছিল। জোট সরকার সংখ্যালঘুদের ওপর যে নির্যাতন চালিয়েছিল তার ওপর নির্মূল কমিটি তিন খণ্ডে প্রায় ৩ হাজার পৃষ্ঠার একটা রিপোর্ট প্রকাশ করেছিল, এছাড়াও হেফাজতের তাণ্ডব, মৌলবাদী সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসের ওপর হাজার হাজার পৃষ্ঠায় শ্বেতপত্র প্রকাশ করেছে। শুধু আবেগীয় কথায় নির্মূল কমিটির আগ্রহ নেই, তারা তথ্যপ্রমাণ হাজির করে দেয়। এই দেশে নির্মূল কমিটি যত তথ্যপ্রমাণ সংগ্রহ করেছে, তার কোনো তুলনা নেই।

নির্মূল কমিটির এই বিশাল কর্মকাণ্ডে অনেকেই জড়িত, তাদের সবার কাছে এই দেশ কৃতজ্ঞ থাকবে। আমি শাহরিয়ার কবিরের নাম আলাদাভাবে মনে করিয়ে দিতে চাই, মুক্তিযুদ্ধের জন্য একজন মানুষের এত তীব্র ভালোবাসা থাকতে পারে নিজের চোখে দেখেও বিশ্বাস হতে চায় না! জোট সরকারের আমলে প্রতিহিংসার কারণে শাহরিয়ার কবির জেল খেটেছেন, যেদিন জেল থেকে বের হবেন সেদিন মুনতাসির মামুনের সঙ্গে আমি জেলগেটে হাজির ছিলাম।

এই দেশের বিবেক একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি ২৯ বছরে পা দিচ্ছে। এই অসাধারণ, ঐতিহাসিক সংগঠন এবং তার সঙ্গে জড়িত সবার জন্য অভিনন্দন। নতুন তরুণ প্রজন্ম এই বিশাল সংগঠনটিকে এগিয়ে নিয়ে যাবে আমি সেই স্বপ্ন দেখছি।

n লেখক :শিক্ষাবিদ, বিজ্ঞানী ও কথাসাহিত্যিক।

 জানুয়ারি ১৮, ২০২১