জলমহাল নিয়ে উত্তেজনা এক সপ্তাহে দুই মৃত্যু

আপডেট : ১৮ জানুয়ারি ২০২১, ২২:৩৬

সিলেট বিভাগের জলমহালগুলোতে এখন বিরাজ করছে টান টান উত্তেজনা। শীত মৌসুমে প্রতি রাতেই মাছের প্রধান উত্স জলমহালের দখল ও মাছ লুটপাট নিয়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। বিশেষ করে হাওর প্রধান সুনামগঞ্জ জেলায় মৌসুম শুরু হতে না হতেই শুরু হয় নানা অঘটন। এবারও এক সপ্তাহের ব্যবধানে দুটি সহিংস ঘটনায় হাওরের জলরাশি রঞ্জিত হয়েছে। ঝরে গেছে দুটি তাজা প্রাণ। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে জলমহালের পাহারাদার, ইজারাদার ও হাওর পাড়ের বাসিন্দাদের ঘুম হারাম। তবে পুলিশ কর্মকর্তারা বলেছেন, পরিস্থিতির ওপর তারা সজাগ দৃষ্টি রাখছেন।

গত বৃহস্পতিবার দক্ষিণ সুনামগঞ্জের শিমুলবাঁক ইউনিয়নের ধামাইবিল জলমহালের দখলকে কেন্দ্র করে দুটি মত্স্যজীবী সমবায় সমিতির লোকজনের সংঘর্ষে নিহত হন জয়নুদ্দিন (৬০) এবং আহত হন ১০ জন। এর আগে গত ৭ জানুয়ারি সুনামগঞ্জের ধর্মপাশায় সুনই মত্স্যজীবী সমবায় সমিতি লিমিটেডের শ্যামাচরণ বর্মণ (৬৫) নামে এক সদস্যকে গলা কেটে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। এ সময় জলমহালের পাড়ে নির্মিত সমিতির দুটি ঘর আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হয়।

স্থানীয় অধিবাসীরা জানান, পৌষ থেকে চৈত্র-এ চার মাস সুনামগঞ্জের জলমহালে থাকে মাছ আহরণের সময়। এ সময় কাঁচা টাকার নেশায় শুরু হয় প্রভাবশালীদের দখল-পালটা দখলের খেলা। আর এই খেলার নেপথ্যে থাকেন হাওর পাড়ের ‘ওয়াটার লর্ডরা’। অভিযোগ রয়েছে, মত্স্যজীবীদের আর্থিক অসচ্ছলতার সুযোগে প্রভাবশালীরা জলমহাল দখলে নিয়ে খুনখারাবির পাশাপাশি মামলায় জড়াচ্ছেন মত্স্যজীবীদের। কাগজে-কলমে মত্স্যজীবীরা জলমহাল ইজারা নিলেও তাদের পেছনে অর্থের জোগান দেয় জলমহালের নিয়ন্ত্রণে থাকা ‘ওয়াটার লর্ডরা’। তাছাড়া অনেক সময় সাধারণ মত্স্যজীবীরা হাওরে মাছ ধরতে গেলে প্রভাবশালী ইজারাদাররা লুটপাটের মামলা দিয়ে তাদের হয়রানি করে।

সরকারি সূত্র মতে, সুনামগঞ্জ জেলায় ইজারাযোগ্য জলমহাল রয়েছে ১ হাজার ১১৮টি। এ থেকে প্রতি বছর সরকারের ১২ কোটি টাকা রাজস্ব আয় হয়। ২০ একর আয়তনের বেশি জলমহাল জেলা প্রশাসন এবং এর চেয়ে কম আয়তনের জলমহাল উপজেলা প্রশাসন ৩ বছরের    জন্য ইজারা দিয়ে থাকে। উভয় ধরনের জলমহাল নিবন্ধিত মত্স্য সমিতিকে ২০০৯ সালের নীতিমালা অনুসরণ করে ইজারা দেওয়া হয়। এছাড়া উন্নয়ন প্রকল্প হিসেবে ছয় বছরের জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ইজারা দিয়ে থাকে। কিন্তু কোনো সময়ই নীতিমালা অনুযায়ী প্রকৃত মত্স্যজীবীরা জলমহাল ভোগ দখল করতে পারেন না।

জলমহাল ব্যবস্থাপনা নীতিমালা কাগজে আছে, বাস্তবে নেই, এই মন্তব্য করে হাওর বাঁচাও, সুনামগঞ্জ বাঁচাও আন্দোলনের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা অ্যাডভোকেট বজলুল মজিদ খসরু বলেন, সরকারি জলমহাল ব্যবস্থাপনা নীতি-২০০৯ এ উল্লেখ আছে, ‘জাল যার জলা তার’, কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে ক্ষমতা যার, তারাই জলমহাল ভোগ করে আসছেন। তিনি বলেন, যে প্রক্রিয়ায় জলমহাল বন্দোবস্ত দেওয়া হয়, তার আড়ালে রয়েছে অন্য চিত্র। বছরের পর বছর জলমহাল ভোগ করেন ক্ষমতাধরেরাই।

সংশ্লিষ্টরা জানান, আইন অনুযায়ী নিবন্ধিত সমিতির নামে ব্যাংক অ্যাকাউন্টটি সচল থাকতে হয়। কিন্তু যারা সমিতির নামে টেন্ডার করেন তারা এসব আইন না মেনে সংশ্লিষ্টদের ম্যানেজ করেই ইজারা পেয়ে যান। অনেক সমিতির সভাপতি বা সাধারণ সম্পাদক প্রকৃত মত্স্যজীবী নন। প্রতিটি সমিতিই নিয়ন্ত্রণ করেন প্রভাবশালীরা।

এ প্রসঙ্গে সুনামগঞ্জের সহকারী কমিশনার (রাজস্ব) মো. আব্দুল হান্নান বলেন, নীতিমালা অনুযায়ীই প্রকৃত মত্স্যজীবী ও সমিতিকে জলমহাল ইজারা দেওয়া হয়। কিন্তু তাদের পেছনের অদৃশ্য শক্তির বিষয়টি অনেকে জানলেও ধরার সুযোগ নেই। তবে মত্স্যজীবীরা ঐক্যবদ্ধ হলে প্রভাবশালীরা এই সুযোগ পাবে না বলে তিনি মন্তব্য করেন।