অণুগল্প

খিল আঁটা সময়

আপডেট : ১৯ জানুয়ারি ২০২১, ২০:১৯

হেনা সুলতানা

 

একটা ম্যাড়মেড়ে সকাল। সকালটা এসে দাঁড়াল ছাপড়া ঘরের ঝাপ তোলা দরজাটার সামনে।

শুরুতেই কোথাও ছিল অলুক্ষণে কাক, কু ডেকে গেল মাথার উপর দিয়ে। কোথায় যেন জমাট বেঁধেছে কিছুটা বিবর্ণ শোক। বালাই ষাট বলে সে আকাশের দিকে তুলে ধরে শঙ্কিত চোখ। তবু অজান্তেই মুখে পুরে দেয় একমুঠো শুকনো মুড়ি। সময় পেরিয়ে যাওয়ার ভয়—ছিল ব্যস্ততা। ঢকঢক করে গলা ভেজানোর তাড়ায় অকারণে তাই হোঁচট খেল চৌকাঠটায়। বাধা পড়ে যাত্রায়। গ্রামে বিছানায় পড়া মার মুখটা মনে পড়ে। খানিকটা কি বসে যাবে?  নাহ!

সময় নেই হাতে।  ঠিক পৌঁছতে হবে কাঁটায় কাঁটায় আটটায়। মাসের শেষ। এতটুকু বিলম্বে হাত পড়বে মায়নায়,  অথবা হতে পারে ছাঁটাই। একে তো করোনা, ঘরেতে এটা ওটা কত কিছুর বাড়ন্ত। ভাবনার কী শেষ আছে? ভাবনার অসংখ্য হাত-পা। হাজার মাথা, প্রকাণ্ড হা। খেই পাবার জো নেই। মুখেতে মাস্ক, ছুটে চলা পা পৌঁছে যায় যথাসময়ে। পৌঁছায় কারখানার গরাদে। হুমড়ি খেয়ে পড়ে মেশিনের পরে।

দুপুরটা খাঁখাঁ পেরিয়ে গেল সেই কাণ্ডজ্ঞানহীন মেশিনের সঙ্গে। বিকেলটা ঝুপ করে সন্ধ্যের কোলে। বেলাটা কি ছেঁটেছুঁটে এতোটুকুন করে দিয়েছে কেউ? তারপর বিরাট এক দৈত্য-আঁধার নেমে এলো চারধার জাঁকিয়ে। বিছিয়ে দিল তার আজানুলম্বিত ভয়াল ডালপালা। গোপনে ফোটে একটি দুটি তারা, ইতিউতি খোঁজে কাকে যেন। বাতাসের গায়ে চাপা বেদনা। দীর্ঘ নিশ্বাসে সঙ্গবিহীন বৃদ্ধ এক চিল জীবনভোর জ্বলছে যার বিষে। কথা না রাখার অপরাধে ক্ষমাহীন চোখ দুটো নিয়ে বৃক্ষশাখায় বসে কাঁপছে অস্থির।

জিঘাংসা কাতর রাত্রি। কিছুতেই ঠেকানো যায় না তাকে।

শ্রমজীবী বালিকা—কিছুটা তো উদ্ধত বটেই। কিন্তু দিব্বি কেটে বলা যায় জীবনের কাছে নেই তার কোনো জটিল জিজ্ঞাসা। উত্তর তো বহুদূরে।  রাস্তার মেয়ে সে নয়। তবু রাস্তায় চলতে হয় একা। লোকাল বাসে উঠে যেতে হয় শেষ গন্তব্যে যেখানে সেই একমাত্র যাত্রী। যেখানে পেটের দায় সেখানেই তো দৈন্যকে সৈন্যে সেজে নামতেই হয় ময়দানে। তাই চলে সাবধানে। পুঁজিপাটা তেমন কিছু নেই। উঁচু-নিচু রাস্তা, সেন্ডেলের ফিতাটা ছিঁড়ে যায় আচমকা। পায়ের তলায় শামুক ভাঙা রক্ত। বিপদ চারিদিকে, পথের সবখানে কাঁটা। কে যেন বারেবারে তার ছায়া মাড়ায়। জড়ায় পায়ে পায়ে। গলা শুকিয়ে ওঠে কনকনে উত্তরে হাওয়ায়। আর কাঁধের ওপর হাত রাখে ক্ষুধার্ত বাঘের থাবা। কুয়াশার পর্দা ভেদ করে তবু ঠান্ডা চাঁদ চেয়ে থাকে একা, কী নির্লিপ্ততা।

ধর্ষিতার আর্তচিত্কারে সে নির্লিপ্ততা ভাঙে খানখান।

মাঘের শীতে বাঘ পালায়। জেগে থাকে কেবল খাল-বিল, নদী-নালার হাড়-পাঁজরা। এবার শীতটা কি একটু বেশি?

গৃহীরা ভালো করে জানালা আঁটে। দরজায় তুলে দেয় আরো শক্ত খিল।

লেপমুড়ি দেয়া কানে পৌঁছায় না সে আর্তচিত্কার।

অলংকরণ :অবিনাশ আচার্য