অপচয় তো হইবার কথা নহে

আপডেট : ১৯ জানুয়ারি ২০২১, ২১:৫৪

বহু পূর্ব হইতেই একটি প্রবাদ চালু আছে, ‘সরকারকা মাল, দরিয়া মে ঢাল’। অর্থাত্ সরকারের সম্পদ নদীতেও ফেলিয়া দেওয়া যায়, উহার যেন কোনো মূল্য নাই। এই প্রবাদ আজও বাংলাদেশের জন্য একটি বাস্তবতা হইয়া রহিয়াছে। এই বাস্তবতা দেশের পরিকল্পনামন্ত্রী মহোদয়ের চোখ এড়ায় নাই নিশ্চয়ই। তাই তিনি বলিয়াছেন, ‘সরকারের টাকা খরচে সকলকে সতর্ক হইতে হইবে।’ ইহা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বিভিন্ন সময়, বিভিন্নভাবে উল্লেখ করিয়াছেন। কিন্তু তাহাতে কোনো কাজ হইয়াছে কি? হয় নাই। তাহার প্রধান কারণ, ব্যবস্থাপনার মধ্যেই যত অব্যবস্থাপনা ঢুকিয়া ঘুণের মতো বাসা বাঁধিয়া লইয়াছে। উহা হইতে পরিত্রাণেরও কোনো প্রচেষ্টা কোথাও লক্ষ করা যায় না।

দেশে অসংখ্য অবকাঠামোগত উন্নয়নের কাজ চলিতেছে। রাস্তাঘাট, ফ্লাইওভার হইতে শুরু করিয়া নদীর বাঁধ অথবা গৃহহীনদের আশ্রয়ণ—এক কথায় মহাকর্মযজ্ঞ চলিতেছে। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অব্যবস্থাপনা ও অস্বচ্ছতা দৃশ্যমান। আজ আমরা ঠিকাদারি কাজের কথাই বলি।  দেশের উন্নয়নমূলক কাজগুলি সাধারণত করিয়া থাকে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল বিভাগ, সড়ক ও জনপদ, পানি উন্নয়ন বোর্ড ও জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল। তাহারা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের নিকট হইতে কাজের ঠিকা দেওয়ার জন্য টেন্ডার আহ্বান করিয়া থাকেন। দেশে হাজার হাজার কোটি টাকার টেন্ডার হইয়া থাকে প্রতি বত্সর।  এই টেন্ডার আহ্বানের শুরু হইতে অযৌক্তিক শর্তাবলি, অব্যবস্থাপনা ও অস্বচ্ছতা লক্ষ করা যায়। প্রথম কথা হইল, সরকার ধরা যাউক ২ কোটি টাকার কাজের জন্য ট্যাক্স, হাইট্যাক্সসহ নানাবিধ অর্থ কাটিয়া লয়। আগাম কাটিয়া লওয়া হয় সরকারি যন্ত্রপাতি ব্যবহারের বাধ্যবাধকতার অর্থ, অথচ দেখা যায় সেই যন্ত্র হয় অকেজো অথবা কাজের উপযুক্ত নহে। তাহার উপর একটি কাজ ঠিকাদারকে গ্রহণ করিতে হয় নির্ধারিত নির্মাণ ব্যয় হইতে ৫-১০ শতাংশ কম মূল্যে। ইহার পর রহিয়াছে কাজ পাইবার জন্য ‘দেনদরবারের খরচ’। স্বচ্ছ প্রতিযোগিতার বদলে সংশ্লিষ্ট বিভাগের কর্মকর্তাদের যোগসাজশের প্রয়োজনে খরচ হইয়া যায় মোটা অঙ্কের অর্থ। আবার কাজের জন্য যেই সকল শর্ত জুড়িয়া দেওয়া হয় সেইখানেও থাকে অসংগতি। একটি কাজের জন্য নির্দিষ্ট অঙ্কের অর্থের কাজের অভিজ্ঞতার কথা শর্তে জুড়িয়া দেওয়া হয়। একজন ঠিকাদার ১০০ কোটি টাকার কাজের অভিজ্ঞতা পূর্বে না থাকিলে তিনি একটি নির্দিষ্ট অঙ্কের কাজের যোগ্য হইবেন না। এই রকম শর্ত থাকিলে ছোট ঠিকাদার অভিজ্ঞতা পাইবে কোথায়? আর অভিজ্ঞতাই যদি এত গুরুত্বপূর্ণ হয়, তাহা হইলে ‘অভিজ্ঞ’ কর্মকর্তারা রহিয়াছেন কেন?

এই সকল অসংগতির বাইপ্রোডাক্ট হইতেছে-কাজ অসম্পূর্ণ রাখিয়া বেশির ভাগ কাজের বিল তুলিয়া লইয়া যাওয়া। এইখানেও একটি কথা আছে। একটি এলাকার একটি কাজের জন্য স্তরে স্তরে দায়িত্বরত প্রকৌশলীরা রহিয়াছেন। ওয়ার্ক অ্যাসিস্ট্যান্ট, এসও, সহকারী প্রকৌশলী, নির্বাহী প্রকৌশলী, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী। তাহার উপর রহিয়াছেন সহকারী প্রধান প্রকৌশলী, অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী এবং প্রধান প্রকৌশলী। মন্ত্রণালয়ের সচিব পর্যন্ত অর্গানোগ্রামের কথা না-ই বা বলিলাম। ইহা ছাড়া মড়ার উপর খাঁড়ার ঘায়ের মতো দেখা যায় টাস্কফোর্স। ইহা সরকারি চাকুরির অর্গানোগ্রামের কোনো পদ-পদবি-সেকশন-বিভাগ না হইলেও ছড়ি ঘুরাইবার শক্তি তাহাদের আছে। এই এতগুলি দায়িত্বরত পদের জাল ছিঁড়িয়া একজন ঠিকাদার কাজ অসম্পূর্ণ রাখিয়া কাজের অতিরিক্ত অর্থ কী করিয়া হাতাইয়া লইয়া যান? কেনই-বা তাহাকে এহেন অপরাধে কলো তালিকাভুক্ত করা হয় না? ইহা অস্পষ্ট নহে যে ‘কালো লেনদেনের’ কারণেই এইরূপ ঘটিয়া থাকে। যে নিয়মকানুন বিদ্যমান রহিয়াছে, তাহাই অনুসরণ করিলে এই পরিস্থিতি হইবার কথা নহে। অন্যদিকে কাজ না করিবার কারণে এক অঞ্চলের অর্থ অন্য অঞ্চলে চলিয়া যাইবার ঘটনাও কম নহে। এমনও শুনা যায়, খোদ প্রধানমন্ত্রীর এলাকার কাজের অর্থও অন্য এলাকায় চলিয়া গিয়াছে। সুতরাং এই সকল অব্যবস্থা দূর হইলেই সরকারের অর্থ অপচয় তথা ‘দরিয়া মে’ ঢালার রাশ টানিয়া ধরা যাইবে।