প্রকল্প নকশা তৈরিতে বছরে দেড় হাজার কোটি টাকার বেশি গচ্চা

আপডেট : ১৯ জানুয়ারি ২০২১, ২২:৪৯

প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়ন পর্যায়ে বিপুল অঙ্কের অর্থ গচ্চার কথা নতুন নয়। করদাতাদের অর্থের অপচয়ের কথা চিন্তায় না রেখে বরং প্রকল্প ব্যয় বেড়েছে। প্রকল্প ব্যয় হ্রাসের উদ্ভাবনী কোনো চিন্তা না থাকায় ফি বছরই হাজার হাজার কোটি টাকা গচ্চা যাচ্ছে, যার সিংহভাগ চলে যাচ্ছে দেশের বাইরে—এমনটি বলেছে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো। শুধু গণপূর্ত অধিদপ্তরের উদাহরণ দিয়ে সূত্রগুলো বলেছে, প্রকল্প নকশা তৈরি ও প্রাক্কলন পর্যায়ে দেড় হাজার কোটি টাকার বেশি গচ্চা যাচ্ছে। প্রকল্প গ্রহণ পর্যায়ে যদি তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে প্রাক্কলন করা যেত, তাহলে বছরে প্রকল্প ব্যয়ের প্রায় ২০ শতাংশের মতো সাশ্রয় করা সম্ভব হতো।

বর্তমানে প্রকল্পের খসড়া তৈরিতে ব্যয়ের প্রাক্কলন করার ক্ষেত্রে আধুনিক পদ্ধতি ব্যবহার করা হয় না। এখানে নকশা করার পর পরামর্শকের ওপর সব ছেড়ে দেওয়া হয়। পরামর্শকেরা নিজেদের ইচ্ছামতো দরদাম ধরে মোট ব্যয়ের প্রাক্কলন করে থাকেন। মূলত শুরুতেই কয়েক গুণ বেশি ব্যয় ধরার সুযোগ তৈরি হয়ে যায়। প্রতিটি প্রকল্পেই গড়ে ২০ শতাংশ অতিরিক্ত অর্থ ধরা থাকে, যাকে ফ্রন্ট লোডিং বলা হয়। এই ফ্রন্ট লোডিংয়ের টাকাটা শুরুতেই ভাগবাঁটোয়ারা হয়ে যায় বলে সূত্র জানায়। কাজ শুরু না হতেই ১০ শতাংশ মোবিলাইজেশন বা অগ্রিম বিল করা হয়। এভাবে পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন ধাপে টাকা উত্তোলন করা হলেও প্রকৃত অর্থে প্রকল্পের কাজ সূচারুভাবে সম্পন্ন করা যায় না। তখন প্রকল্প ব্যয় বাড়াতে হয়। যেহেতু এই প্রক্রিয়ায় সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের যোগসাজশ থাকে, তাই মনিটরিংয়ের বিষয়টি খুব একটা গুরুত্ব পায় না।

এমনও হয় যে, পরামর্শকদের টাকা প্রদান করা হলেও প্রকল্প চূড়ান্ত অনুমোদন লাভ করে না। সম্প্রতি একটি সংস্থার ২৯ তলাবিশিষ্ট প্রধান কার্যালয় নির্মাণ ব্যয় ৯০০ কোটি টাকা ধরা হয়। প্রতি বর্গফুট নির্মাণ ব্যয় ধরা হয়েছিল ৯ হাজার ২৬৫ টাকা, যা মোটেই বাস্তবসম্মত নয়। এখন পর্যন্ত বেসরকারিভাবে সর্বোচ্চ নির্মাণ ব্যয় প্রতি বর্গফুট ২ হাজার ৮০০ থেকে ৩ হাজার টাকার বেশি হয় না। অথচ সরকারি প্রকল্প বিধায় তিন গুণের বেশি ব্যয় ধরা হয়েছে। যদিও শেষ পর্যন্ত সেটি অনুমোদিত হয়নি। কিন্তু পরামর্শকদের  সাড়ে ৫ কোটি টাকা প্রদান করতে হয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলেন, সর্বত্রই এখন নকশার পর মডেলিং করা হয়। বিল্ডিং ইনফরমেশন মডেলিং বা বিম পদ্ধতিতে মডেলিং করার মাধ্যমে খরচ প্রায় ২২ থেকে ২৫ শতাংশ কমে যায়। এতে সময়ও বাঁচে প্রায় ১৯ থেকে      ২৩ শতাংশ। তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা বলেন, পূর্ত অধিদপ্তরের ব্যয় বরাদ্দ সাড়ে ৮ হাজার কোটি টাকা ধরে হিসাব করলে দেখা যায়, শুধু থ্রিডি মডেলিংয়েই বছরে ব্যয় দাঁড়ায় প্রায় ২৫ কোটি টাকা। তিন বছরে এই ব্যয় দাঁড়ায় ৭৫ কোটি টাকা। যদিও বিল্ডিংয়ের উচ্চতা অনুযায়ী এই ব্যয় ভিন্ন ভিন্ন হয়ে থাকে। অথচ মাত্র ২ কোটি টাকা ব্যয়ে এটি  করা সম্ভব। তাও তিন বছরের জন্য। কারণ একটি লাইসেন্সের মেয়াদ তিন বছর থাকে। এজন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কিছু কর্মীকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার প্রয়োজন হবে মাত্র। তাতে ভবিষ্যতের জন্য দক্ষতা বৃদ্ধি হবে।

বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতের বিশেষজ্ঞ ড. মুহম্মদ মাহবুব আলী বলেন, তথ্যপ্রযুক্তি খাতে বাংলাদেশ এখন অনেক এগিয়ে। এই খাতের অবকাঠামো উন্নয়নও ত্বরান্বিত হচ্ছে। উন্নয়ন প্রকল্প প্রণয়নে তথ্যপ্রযুক্তির মিশেল ঘটিয়ে ব্যয় যেমন সাশ্রয় সম্ভব, তেমনি গুণমান নিশ্চিত করাও সহজ হবে।

এদিকে টেন্ডার প্রক্রিয়া নিয়েও নানা প্রশ্ন রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, ই-টেন্ডারের আইনি মারপ্যাঁচে ঘুরেফিরে কাজ পাচ্ছে কিছু ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। তাই ছোট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলো বাধ্য হয়ে দ্বিতীয় পক্ষ হয়ে কাজে অংশ নিচ্ছে। কয়েক হাত ঘুরে বাস্তাবয়ন হওয়া উন্নয়ন প্রকল্প সময়মতো শেষ হচ্ছে না। ফলে একই প্রকল্পে বারবার ডিপিপি সংশোধিত হচ্ছে। বাড়ছে প্রকল্পের ব্যয়ও। আর একই প্রতিষ্ঠান বেশি কাজ পাওয়ায় সময়মতো শেষ হচ্ছে না প্রকল্প।