যুক্তরাষ্ট্র কেন বিশ্বের অধিকাংশ মানুষের নিকট সবচাইতে আরাধ্য দেশ? এই পৃথিবীকে যদি ফুলবাগান বলিয়া ধরিয়া নেওয়া যায়, তাহা হইলে অনেকের মতে যুক্তরাষ্ট্র হইল সেই ফুলবাগানের বিচিত্র ও সুন্দর ফুল লইয়া তৈরি হওয়া নান্দনিক একটি ফুলের মালা। অর্থাত্ ইউরোপীয় উপনিবেশবাদের ভিতর দিয়া দক্ষ ও যোগ্য অভিবাসীদের মাধ্যমেই যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের সবচাইতে শক্তিশালী রাষ্ট্রে পরিণত হয়। এই জন্য যুক্তরাষ্ট্রে রহিয়াছে বিশ্বের সর্বাপেক্ষা বৈচিত্র্যমণ্ডিত বহুজাতিক সমাজব্যবস্থা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরও যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক নেতৃত্বের পথ সুগম হইবার অন্যতম কারণ ছিল বিশ্বের সকল প্রান্তের দক্ষ ও মুক্তমানুষের অভিবাসন ঘটানো। কিন্তু সেই যুক্তরাষ্ট্রকেই ‘আমেরিকাই প্রথম’ নীতির মাধ্যমে এক বিষমকালের বিভাজিত দেশে পরিণত করেন সদ্য বিদায়ি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। নানান অঘটন-ঘটনের মধ্য দিয়া গতকাল ২০ জানুয়ারি বুধবার আমেরিকার ৪৬তম প্রেসিডেন্ট হিসাবে শপথ লইয়াছেন জো বাইডেন। বাইডেন ইতিপূর্বে বলিয়াছেন—তিনি নির্বাচন লড়িয়াছেন আমেরিকার আত্মাকে রক্ষা করিতে, জাতির মেরুদণ্ড মধ্যবিত্ত সম্প্রদায়কে পুনর্গঠিত করিতে এবং বিশ্বের আঙিনায় আমেরিকাকে পুনরায় সম্মানজনক অবস্থানে লইয়া যাইতে। ইহার সহিত বিভাজিত আমেরিকাকে ঐক্যবদ্ধ করিবার প্রত্যয়ও তিনি ব্যক্ত করিয়াছেন।
ইহা ঠিক যে, এই কথাগুলি বলা সহজ, তবে বাস্তবতা এত সহজ নহে। ইতিহাস বলিয়া থাকে, দুনিয়ার চূড়া হইতে একবার পিছলাইয়া পড়িলে সেইখানে পুনরায় উঠিয়া আসা খুব সহজ নহে। এতকাল ধরিয়া গণতন্ত্র, উদারনীতি ও সাম্যের যে মতাদর্শ লইয়া আমেরিকা নিজেকে প্রকাশ করিত, সেই ভাবমূর্তিতে কিছু গভীর ভাঙন ধরিয়াছে বলিয়া মনে করেন অনেকে। সুতরাং আমেরিকার ভিতরকার বিভাজনের ভাঁজ আরো বাড়িতে পারে। যদিও বিভাজন বিশ্বের কোথায় নাই—ইহা একটি সর্বজনীন প্রশ্ন। কেবল আমেরিকা নহে, সমগ্র বিশ্বই বিভাজন, অবিশ্বাস, আস্থাহীনতাসহ বিবিধ সংকটে ভুগিতেছে। এই সকল বিষয় একবার অন্ধকারে নিপতিত হইলে তাহাকে আলোকিত করা সহজ কাজ নহে। ইতিপূর্বে ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রেসিডেন্সির চারটি বত্সর আমরা দেখিয়াছি, ট্রাম্পের সহিত উষ্ণ সম্পর্ক ছিল বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের কর্তৃত্ববাদী শাসকদের সহিত। বলা যায়, প্রথাগত রাজনৈতিক কাঠামোর বাহির হইতে উঠিয়া আসা ডোনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রকে ক্রমশ আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক কাঠামোর বাহিরে লইয়া গিয়াছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রকে প্যারিস জলবায়ু চুক্তি হইতে প্রত্যাহার কিংবা ইরানের সহিত ছয় জাতির চুক্তি হইতে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার, অথবা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা হইতে বাহির হইয়া আসা—এমনকি জাতিসংঘেও চার বত্সরে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা ছিল মলিন। অভিবাসন নীতি লইয়াও ট্রাম্পের ভূমিকা ছিল যুক্তরাষ্ট্রের নীতির পরিপন্থি। ডোনাল্ড ট্রাম্পের অভিবাসীদের প্রতি বিরূপ মনোভাব বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাপারে একটি নেতিবাচক ভাবমূর্তি গড়িয়া উঠে। মেক্সিকো সীমান্তে প্রাচীর নির্মাণে মরিয়া ছিলেন তিনি। সাতটি মুসলিম দেশ হইতে পুরাপুরিভাবে বন্ধ করিয়াছিলেন অভিবাসী গ্রহণ। ট্রাম্প যা যা উলটপালট করিয়াছেন, তাহা আপাতদৃষ্টিতে সমাধান করা বাইডেনের জন্য হয়তো খুব কঠিন নহে; কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের ভিতরের যেই সকল ক্ষত হইতে রক্তক্ষরণ ঘটিতেছে—সেই ক্ষত সারাইয়া তুলা অত্যন্ত কঠিন কাজ।
বাইডেন অবশ্য ইতিপূর্বে বলিয়াছেন—যন্ত্রণা হইতেই সম্ভাবনা তৈরি হয়। হতাশা জন্ম দেয় অগ্রগতির। কিন্তু তাহা যেন গ্রিক পুরাণে কথিত সিসিফাসের পাথর ঠেলিয়া পাহাড়ে উঠাইবার মতো অন্ততকালের কাজ। সিসিফাস বেচারা একটা পাথর খাড়া পাহাড়ের উপরে ঠেলিয়া তুলে, আর পাথরটি গড়াইয়া নিচে পড়িয়া যায়। সিসিফাস পুনরায় পাথরটিকে ঠেলিয়া উপরে তুলে। যতবার তুলে, ততবার পড়িয়া যায়। বাইডেনের অবস্থা কি সিসিফাসের মতো হইবে? নাকি আমরা ইতিবাচক স্বপ্ন দেখিতেই পারি বাইডেনের সাফল্যের ব্যাপারে? আগামী চার বত্সরে ইহার উত্তর পাওয়া যাইবে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ৪৬তম প্রেসিডেন্ট হিসাবে অভিষিক্ত হওয়া জো বাইডেনকে জানাই অভিনন্দন ও সাদর সম্ভাষণ।
