‘আসাদের শার্ট’—আহা, বরেণ্য কবি শামসুর রাহমানের সে কী আবেগ, দরদ আর হূদয়স্পর্শী কথামালা! উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানে ২০ জানুয়ারি শহিদ হন ছাত্রনেতা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আমানুল্লাহ মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান। গণ-অভ্যুত্থানের দিনগুলিতে ‘খুনের বদলে খুন চাই, আইয়ুব খানের রক্ত চাই’, আইয়ুব মোনেম দুই ভাই, এক দড়িতে ফাঁসি চাই’, ‘আসাদের মন্ত্র, জন-গণতন্ত্র’—এমন সব স্ল্লোগানে মুখরিত হয় এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত; দেশের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে আইয়ুববিরোধী ক্রোধের দাবানল। আসাদের নামে গোটা জাতি পাগলপ্রায়। মুহূর্তে তিনি জাগ্রত জাতির হূদয়ের মণিকোঠায় ঠাঁই করে নিলেন। আসাদ নামটিতে সে কী জাদু আর অনুপ্রেরণা ভর করেছিল সেদিন! বিক্ষুব্ধ ছাত্ররা ঢাকায় নির্মিত ‘আইয়ুব গেট’-এর নামফলক ছুড়ে ফেলে দিয়ে নতুন নাম দেয় আসাদ গেট (এখনো বর্তমান); শুধু তা-ই নয়, পাকিস্তানের দ্বিতীয় রাজধানী বলে পরিচিত ‘আইয়ুবনগর’ নামটিও বদলে রাখা হয় আসাদনগর (বর্তমান শেরেবাংলা নগর)। মোটকথা, দেশের যেসব প্রতিষ্ঠান ও স্থাপনায় আইয়ুব খান নামটি ছিল তা তুলে দিয়ে সেখানে বসিয়ে দেওয়া হয় শহিদ আসাদের নাম। এই সেই উনসত্তরের আসাদ।
স্বাধীনতার পর থেকেই দিনটি আসাদ দিবস হিসেবে পালিত হয়ে আসছে। সরকার ২০১৮ সালে শহিদ আসাদকে স্বাধীনতা পদকে (মরণোত্তর) ভূষিত করে। আসাদ দিবস উপলক্ষ্যে আমাদের রাষ্ট্রপতি মো. আবদুুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাণী দিয়েছেন।
গতকাল ছিল শহীদ দিবস। কিন্তু বাস্তবতা, আশ্চর্য ও অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো দেশের সংবাদপত্রগুলিতে শহিদ আসাদ দারুণভাবে উপেক্ষিত ও অবহেলিত। অনেকগুলি সংবাদপত্রে দিবসটির খবর থাকবে তো দূরের কথা আসাদের নামটিও নেই! দিবসটির গুরুত্ব বিবেচনায় রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী পৃথকভাবে বাণী দিলেও কোনো কোনো সংবাদপত্রে তারও কোনো উল্লেখ নেই! আবার এমনও দেখা গেছে প্রধানমন্ত্রীর বাণীটি ছাপানো হলেও খোদ রাষ্ট্রপতির বাণীটিরই কোনো হদিস নেই! প্রতিটি পত্রিকাতেই সম্পাদকীয়-উপসম্পাদকীয় মিলে মোটামুটি দুই পৃষ্ঠা জুড়ে চার-ছয়টি কিংবা আরো বেশিসংখ্যক নিবন্ধ-ফিচার প্রতিদিন ছাপা হয়। পণ্ডিত-গবেষক-বুদ্ধিজীবীদের পাশাপাশি অনেক সাধারণ লেখাও ঠাঁই পায় তাতে। কিন্তু ২০ জানুয়ারি ২০২১ বুধবার অন্তত ৮-১০টি কাগজ ঘেঁটে দেখেছি; তেমন উল্লেখযোগ্য কোনো আয়োজন চোখে পড়েনি শহিদ আসাদকে নিয়ে। দীনতা ছাড়া এটিকে আর কী বলা যায় এবং এমন দীনতা থেকে উত্তরণের উপায়ই-বা কী। এমনটি হতে থাকলে নতুন বা ভবিষ্যত্ প্রজন্ম জাতির ইতিহাস ঐতিহ্য সম্পর্কে শিক্ষালাভ করবে কীভাবে?
কথায় কথায় এবং বক্তৃতা-বিবৃতিদানের সময় প্রায়শই আমরা বলি, আবেগভরা কণ্ঠে খুব গর্বের সঙ্গে বলে থাকি জাতীয় চেতনার কথা। কোনো সভা-অনুষ্ঠানে রাজনীতিবিদ ও ছাত্রনেতাদের বক্তৃতার শুরুটাই হয় অনেকটা এভাবে—‘বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, ছেষট্টির ৬ দফা আন্দোলন, উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, সত্তরের নির্বাচন ও একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে ত্রিশ লাখ শহিদের তাজাপ্রাণ আর দুই লাখ নারীর সম্ভ্রমের বিনিময়ে পাওয়া আমাদের এ স্বাধীনতা।’ কিন্তু মনের মধ্যে প্রশ্নের উদ্রেক হতেই পারে যে জাতীয় চেতনার এই গৌরব-গরিমা ও আবেগকে আমরা মনেপ্রাণে কতটুকু লালন ও ধারণ করি?
আসাদ হত্যার প্রতিবাদে কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ প্রদেশব্যাপী তিন দিনের শোক পালন শেষে ২৪ জানুয়ারি হরতালের ডাক দেয়। সেদিনের মিছিলে পুলিশ আবারও গুলি চালালে ঢাকার নবকুমার ইনস্টিটিউটের ছাত্র মতিউর রহমান প্রাণ হারান। ১৮ ফেব্রুয়ারি পুলিশের গুলিতে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. শামসুজ্জোহা শহিদ হন। গণ-আন্দোলন সর্বাত্মক রূপ নেয়। আওয়ামী লীগ নেতা শেখ মুজিবুর রহমানকে মুক্তিদান এবং তাকে বঙ্গবন্ধু খেতাবে ভূষিতকরণ—এ সবকিছুই গণ-অভুত্থান পর্বের বিজয়। ইতিহাসের কেমন বাস্তবতা; আসাদ হত্যার মাত্র দুই মাসের মাথায় ২৫শে মার্চ পাকিস্তানের ‘দণ্ডমুণ্ডের মালিক’ কথিত লৌহমানব প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান পদত্যাগ করতে বাধ্য হন।
শহিদ আসাদ ছিলেন প্রগতিশীল রাজনীতির মূলমন্ত্রে দীক্ষিত। অন্যায়-অবিচার ও শোষণ থেকে মুক্তি এবং জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠা করা ছিল তার ধ্যান-জ্ঞান। আসাদদের বাড়ি বর্তমান নরসিংদী জেলার শিবপুর উপজেলার ধানুয়া গ্রামে। তার বাবা এম এ তাহের ছিলেন শিবপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এমএ, অসাধারণ মেধাবী এবং অত্যন্ত সজ্জন ব্যক্তি হিসেবে তাকে এলাকার সবাই সম্মানের চোখে দেখত। আর মা মতিজাহান খাদিজা খাতুন নারায়ণগঞ্জ শহরের খ্যাতনামা আইটি স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা প্রধান শিক্ষিকা।
আসাদদের সুপরিসর বাড়িটি এলাকায় ‘মিয়াজিবাড়ি’ নামে সমধিক পরিচিত। আসাদের বাবা এম এ তাহের ছিলেন একজন পণ্ডিত ব্যক্তি। বাবার আদর্শের ছোঁয়ায় সন্তানরাও গড়ে ওঠে। তাহের-মতিজাহান দম্পতি এমনই পরম সৌভাগ্যবান যে সেরা সেরা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষা শেষে ছয় ছেলে ও দুই মেয়ে প্রত্যেককেই তারা যার যার কর্মক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত হিসেবে দেখে যেতে পেরেছেন।
শহিদ আসাদের বৃদ্ধ বাবা মারা যান ১৯৯৬ সালে আর আগের বছর ১৯৯৫ সালে তার রত্নগর্ভা মা। একমাত্র আসাদ ছাড়া সব সন্তানেরই লেখাপড়া, বেড়ে ওঠা ও কর্মোদ্যম সবকিছু সচক্ষে দেখে যান তারা। আরো গর্বের বিষয় যে তাদের একটি সন্তানের আত্মবলিদানের বিনিময়ে গণ-অভ্যুত্থান সফল পরিণতির দিকে এগোয়। আইয়ুবের পতন, সত্তরের সাধারণ নির্বাচন ও একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ—এ সবকিছুর প্রেরণা আসাদের আত্মত্যাগ।
এমনিতে ১৯৬৯ সালে গণ-অভ্যুত্থানের সময় পরিবারটি ছিল খুবই বিকাশমান। আট ভাইবোনের মধ্যে শহিদ আসাদ ছিলেন চতুর্থ। সবার বড় কে এম খুরশীদুজ্জামান (পদস্থ সরকারি কর্মকর্তা), দ্বিতীয় এন এম মুরশীদুজ্জামান (চিকিত্সক), তৃতীয় এফ এম রশীদুজ্জামান (প্রকৌশলী), চতুর্থ এ এম আসাদুজ্জামান (১৯৬৮ সালের নভেম্বর মাসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাস বিষয়ে এমএ পরীক্ষা দিয়ে ফলাফলের জন্য অপেক্ষমাণ), পঞ্চম এইচ এম মনিরুজ্জামান (অগ্রজ আসাদের পাশে বসে একই সঙ্গে এমএ পরীক্ষা দিয়ে ফলাফলের জন্য অপেক্ষমাণ), ষষ্ঠ আনোয়ারা ফেরদৌসী (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী), সপ্তম এ এম নূরুজ্জামান (ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের ছাত্র) এবং সবার ছোট বোন দেলোয়ারা ফেরদৌসী সে সময় (১৯৬৯) ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী। এমন আলোকময় পরিবার সেকালে তো বটেই, আজকালও খুব একটা দেখা যায় না।
শহিদ আসাদ ও গণ-অভ্যুত্থান আমাদের জাতীয় ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ। নানা বীরত্বগাথাসহ জাতির আন্দোলন-সংগ্রাম ও উত্থানের সঠিক ইতিহাস জানার কোনো বিকল্প নেই। মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতিপর্বে গণ-অভ্যুত্থান ও শহিদদের আত্মবলিদান নতুন প্রজন্মের কাছে অফুরন্ত অনুপ্রেরণার উত্স হয়ে থাকবে।
n লেখক : অবসরপ্রাপ্ত কলেজ শিক্ষক
