পুরুষই নারীমুক্তির পথপ্রদর্শক

আপডেট : ২০ জানুয়ারি ২০২১, ২১:৪৫

খুন, ধর্ষণ, যৌতুক, বাল্যবিবাহ, রাস্তাঘাট গণপরিবহনে যৌন নির্যাতন, সাইবার স্পেসে হয়রানি ইত্যাদি নারীদের সঙ্গে ঘটে যাওয়া নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। নারী নির্যাতন মানেই তার নেপথ্যে পুরুষ। কিছুদিন পর পর দেশের বিভিন্ন পর্যায়ের নারীদের প্রতি লোমহর্ষক নির্যাতন হয় আর আমরা সচেতন নাগরিকরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে শুরু করে বিভিন্ন জায়গায় পুরুষ বিদ্বেষমূলক লেখালেখি বা আলোচনা-সমালোচনা করি। কারণ কিছু দুর্ঘটনার ভয়াবহতা এতটাই প্রকট যে, তার পরিপ্রেক্ষিতে ঐ পরিস্থিতিতে পৃথিবীর সবচেয়ে হিংস্র জাতি হিসেবে পুরুষকে নির্বাচন না করে উপায়ন্তর থাকে না। কিন্তু এসবের বাইরে আমাদের মধ্যে এমন অসংখ্য পুরুষ আছেন, যারা সম্পর্কের বাইরেও  প্রত্যেকটি নারীকে যথেষ্ট সম্মান করেন। দায়িত্ববান পুরুষ আমাদের দেশে অনেক আছে কিন্তু আমরা কয়জন সেসব পুরুষ সম্পর্কে ভালো কথা বলি বা তাদের নিয়ে ইতিবাচক মন্তব্য করি?

নারী পুরুষের সমান অধিকার। এটা যেমন বাস্তব একটা দিক ঠিক তেমনি নারী হিসেবে বিভিন্ন জায়গায় আমরা না চাইতেও অনেক পুরুষ শুধু নারী—এটা বিবেচনা করে কনসিডার করেন, এটাও কোনো নারী অস্বীকার করতে পারে না। এই ধরুন লোকাল বাসে উঠেছেন সেখানে উপচে পড়া ভিড়। অনেক পুরুষসহ আপনিও দাঁড়িয়ে আছেন,। এক্ষেত্রে অনেক সময় বাসের বসে থাকা যে কোনো পুরুষ উঠে আপনাকে বসার জন্য জায়গা করে দেন। আবার দোকানে প্রয়োজনীয় দ্রব্য কিনতে গেছেন সেখানে অনেক পুরুষের ভিড়ে নারীর সুবিধার্তে তাকেই আগে সুযোগ করে দেওয়া হয়। কর্মক্ষেত্রেও আমরা নারী হিসেবে বিভিন্ন পজিটিভ সুযোগসুবিধা পেয়ে থাকি। এধরনের বিভিন্ন ঘটনা নারীদের সঙ্গে হরহামেশাই ঘটে থাকে। পরিবারের দুই সন্তানের মধ্যে একজন ছেলে একজন মেয়ে। বাবা সবসময় সেটাই চিন্তা করেন তার মেয়ের কীভাবে কমফোর্ট হবে। মেয়ের কমফোরটের জন্য ছেলের সামান্যতম আনকমফোরটেবল বিষয়টি নিয়ে খুব একটা ভাবা হয় না তার।

আমাদের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী একজন নারী। বিগত ২৮ বছর ধরে রাষ্ট্র পরিচালনায় রয়েছেন নারী। সংসদের স্পিকার একজন নারী। বিরোধীদলীয় নেত্রী একজন নারী। স্থানীয় সরকার থেকে প্রশাসন, ব্যবসা-বাণিজ্য সর্বত্র নারীরা উচ্চাসনে। কৃষিক্ষেত্রেও বাংলাদেশের নারীরা পিছিয়ে নেই। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, নিরাপত্তা বাহিনী, এমনকি সেনাবাহিনীর মতো ঝুঁকিপূর্ণ পেশাতেও নারী তার যোগ্যতার দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করছেন। শিক্ষা-দীক্ষায় নারীরা অনেক অনেক এগিয়েছে। অর্থাত্ নারীরা পিছিয়ে আছে এ কথাটা এখন আর সেভাবে বলা যায় না। বরং নারীসমাজ পরাধীনতার খোলস ভেঙে অপ্রতিরোধ্য গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে। এছাড়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বর্তমানে দেশের ৬২ শতাংশ নারী আয় বৃদ্ধিমূলক কাজে যুক্ত। ৫০ শতাংশ উন্নয়নশীল দেশের তুলনায় এ হার সর্বোচ্চ। নারীরা রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের দিক থেকে বাংলাদেশ এখন বিশ্বের প্রথম ১০টি দেশের একটি।

আজকের নারীর এই বিরাট সফলতার পেছনে নারীর যেমন অসামান্য অবদান রয়েছে ঠিক তেমনি পুরুষেরও অবদান রয়েছে। পুরুষের অবদানটা ঠিক কীভাবে? দিনশেষে আমাদের সবাইকে বাড়ি ফিরতে হয়। কর্মক্ষেত্রের সঙ্গে সংসার, সন্তান ও স্বামীকেও মেইনটেইন করতে হয়। স্ত্রীর প্রতি স্বামী বা অবিবাহিত নারীদের প্রতি বাবা বা ভাই যদি সাপোর্টিভ না হতো তাহলে কর্মক্ষেত্রে নারীরা এতটা এগোতে পারত না। যে কোনো কর্মক্ষেত্রে শুধু নারীরাই কাজ করে না সেখানে অনেক পুরুষও কাজ করে। এক্ষেত্রেও তারা একইভাবে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে কাজ করার মতো সুন্দর পরিবেশ তৈরি করে নারীদের সামনে এগিয়ে যেতে সাহায্য করে।

কিছুদিন পরপরই দেখা যায় মানসিক বিকারগ্রস্ত কিছু পুরুষ নারীদের প্রতি পাশবিক নির্যাতন করে। যা দেখে শুধু নারীরা নয়, পুরুষরাও বাকরুদ্ধ হয়ে যান। কিন্তু আমাদের নারীদের জন্য সবচেয়ে স্বস্তির বিষয় যেটি, সেটি হচ্ছে নারীদের প্রতি এমন নির্যাতনের পর অনেক দায়িত্ববান পুরুষ আমাদের পাশে দাঁড়ান। তারাই প্রথম সারিতে দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ করেন। এমনকি তারা এটাও স্বীকার করেন যে, বিভিন্ন সময় মানুষরূপী কিছু অমানুষের জন্য তারাও লজ্জিত হন। অথচ আমাদের আশপাশেই এখনো এমন অনেক নারীরা আছে, যারা একজন নারী হয়ে অন্য নারীকে সম্মান করতে পারেন না। সম্প্রতি রাজধানীর মাস্টারমাইন্ড স্কুলের এক ছাত্রীকে বন্ধুর বাসায় ধর্ষণের ফলে প্রচুর রক্তক্ষরণ হয়। পরে তাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিত্সক মৃত ঘোষণা করেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে বর্তমানে এ বিষয়ে খুব আলোচনা-সমালোচনা চলছে। কিন্তু হতাশ হয়েছি এটা দেখে যে, সেখানে অনেক পুরুষ ধর্ষকের বিরুদ্ধে কথা বলছেন অথচ অনেক নারী ঐ ছাত্রী সম্পর্কে অত্যন্ত বাজে মন্তব্য করেছেন। এছাড়া যে কোনো অন্যায় হলে শুধু পুরুষ নয় আমরা নারীরাও ভুক্তভোগী নারীর দোষ খুঁজতেই ব্যস্ত হয়ে পড়ি। একজন নারীই যদি অন্য নারীকে সম্মান করতে না পারে, তাহলে পুরুষদের থেকে এতটা সুরক্ষা কীভাবে আশা করি।

প্রকৃত পক্ষে নারী-পুরুষ একে অপরের পরিপূরক। এক পক্ষকে বাদ দিয়ে আরেক পক্ষ পূর্ণতা পায় না। নারীর সুরক্ষায় নারী অধিকার অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে মনে রাখতে হবে পুরুষের কথাও, নচেত্ মানব সমাজ ভারসাম্য হারাবে। কতিপয় কিছু খারাপ মানুষের জন্য প্রত্যেকটি পুরুষকে দোষারোপ করা উচিত নয়। নারীর চলার প্রতিটা ক্ষেত্রকে যারা আরও মসৃণ করে দিচ্ছে তাদেরকে হেয় করে নয়, বরং সম্মান জানাই সেসব পুরুষদের, যারা নারীকে মূল্যায়ন এবং নারী সুরক্ষায় কাজ করেন। যে কোনো বিপদে সুযোগ না নিয়ে নারীকে সাহায্য করেন। সেই সঙ্গে কামনা করি পৃথিবীতে সুপুরুষদের সুসমাজে নারী পরগাছা নয়, মানুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠা পাক।

n লেখক : শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া