শপথ গ্রহণের পর ক্যাপিটল ভবনে দেওয়া অভিষেক ভাষণে ঐক্যের ডাক দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের ৪৬তম প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন। তিনি আমেরিকান প্রত্যাশার নতুন গল্প লেখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তরের দিনে তিনি বলেন, ‘আজ আমেরিকার দিন, আজ গণতন্ত্রের দিন। এটি ইতিহাস ও প্রত্যাশার দিন। মহাসংকট ও পরীক্ষার চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে আমেরিকা জেগে উঠেছে। গণতন্ত্রের জন্য আমরা আজকের বিজয় উদ্যাপন করব। জনগণ ও জনগণের ইচ্ছাকে শোনা হয়েছে। আমরা আবারও জেনেছি গণতন্ত্র অতি মূল্যবান। গণতন্ত্র নাজুক অবস্থায় পড়লেও গণতন্ত্র জয়ী হয়েছে, টিকে রয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘কিছুদিন আগেই এই পবিত্র ভূমিতে সহিংসতা হয়েছে ক্যাপিটলের মজবুত ভিতকে আঘাত করার জন্য। কিন্তু আমরা জাতি হিসেবে এক হয়েছিলাম শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তরের জন্য, যা ২০০ বছরের বেশি সময় ধরে চলে আসছে।’
তিনি বলেন, ‘আমি দুই দলের পূর্বসূরিদের হূদয়ের অন্তস্তল থেকে ধন্যবাদ জানাই। আমি কেবল পবিত্র শপথ গ্রহণ করেছি, যা আগে ঐ দেশপ্রেমিকরা নিয়েছিলেন। আমেরিকার ইতিহাস, গল্প কোনো একজন বা কয়েক জনের ওপর নির্ভর করে না বরং আমাদের সবার ওপর নির্ভর করে। শত শত বছরের ঝড়, শান্তির ওপর আঘাত এবং যুদ্ধের মধ্য দিয়ে আমরা এখানে এসেছি। আমাদের এখনো অনেক পথ যেতে হবে। অনেক কিছু করতে হবে, অনেক ক্ষত সারাতে হবে, অনেক কিছু ফিরিয়ে আনতে হবে, অনেক কিছু গড়তে হবে এবং অর্জন করতে হবে।’
জো বাইডেন করোনা মহামারির প্রসঙ্গ উল্লেখ করে বলেন, ‘এক বছরে আমাদের অনেকের জীবন কেড়ে নিয়েছে এই ভাইরাস। কোটি কোটি মানুষ চাকরি হারিয়েছেন, হাজার হাজার ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে। জাতিগত ন্যায়বিচারের জন্য আর্তনাদ দেখা গেছে। সবার জন্য ন্যায়বিচারের স্বপ্ন আর বিলম্বিত হবে না। রাজনৈতিক উগ্রবাদ, শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদ, অভ্যন্তরীণ সন্ত্রাসের মোকাবিলা করব এবং অবশ্যই পরাজিত করব। এসব চ্যালেঞ্জ জয় করতে, বিবেককে ফেরাতে এবং আমেরিকার ভবিষ্যত্ নিরাপদ করতে কথার চেয়ে অনেক বেশি কিছু দরকার। এজন্য দরকার গণতন্ত্রের সবচেয়ে অধরা জিনিস—একতা, ঐক্য।’
তিনি বলেন, ‘আমেরিকাকে ঐক্যবদ্ধ করতে, দেশের মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করতে, জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করতে কাজ করব। ঘৃণা, বিদ্বেষ, উগ্রবাদ, অরাজকতা, সহিংসতা, রোগ, বেকারত্ব ও হতাশার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সবাইকে একতাবদ্ধ হতে আমি আহ্বান জানাই। ঐক্যবদ্ধ হয়েই আমরা বড় কিছু করতে পারি, গুরুত্বপূর্ণ কিছু করতে পারি। আমরা ভুলকে ঠিক করতে পারি, আমরা নিরাপদ স্কুলে আমাদের সন্তানদের শিক্ষা দিতে পারি। আমরা এই প্রাণঘাতী ভাইরাসের বিরুদ্ধে জয়ী হতে পারি, আমরা জাতিগত ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে পারি। আমরা যুক্তরাষ্ট্রকে আবারও বিশ্বের ভালোর জন্য নেতৃত্বের আসনে আনতে পারি।’
তিনি বলেন, ‘আমি জানি, কিছু মানুষের কাছে এই ঐক্যের বার্তা বোকার কল্পনার মতো শোনাবে। আমি জানি, এমন মানুষের কারণে আমরা আজ কতটা বিভক্ত। কিন্তু আমি এটাও জানি যে তারা নতুন নন। আমেরিকার আদর্শের জন্য আমরা আজও লড়াই করে চলেছি।’
বাইডেন বলেন, ‘গৃহযুদ্ধ, মহামন্দা, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, ৯/১১ সন্ত্রাসী হামলা, আত্মত্যাগ ও বিপদের মুখে আমরা এক হয়েছি। একসঙ্গে অগ্রসর হয়েছি এবং আমরা এখন তা-ই করতে পারি। ইতিহাস, বিশ্বাস এবং সমস্যা পথ দেখায়। আর সেই পথ হলো ঐক্যের। আমরা একে-অন্যকে শত্রু না ভেবে প্রতিবেশী হিসেবে দেখতে পারি। একে-অন্যকে সম্মান ও মর্যাদা দিতে পারি। ঐক্য না থাকলে শান্তি থাকবে না। শুধু প্রতিহিংসা, ক্ষোভ থাকবে, বিশৃঙ্খলা হবে।’
তিনি বলেন, ‘এখন ইতিহাসের অন্যতম সংকট ও চ্যালেঞ্জের সময়। ঐক্যই হলো এগিয়ে যাওয়ার পথ। এই মুহূর্তকে মোকাবিলা করতে হবে এক যুক্তরাষ্ট্র হিসেবে। আমরা সেটি করলে পরাজিত হব না। আমরা এক হলে কখনোই ব্যর্থ হইনি। এখন থেকে নতুন শুরু করতে হবে। একে-অন্যকে শুনতে হবে, দেখতে হবে, সম্মান দিতে হবে।’ তিনি বলেন, ‘কিছুদিন আগেই এখানে দাঙ্গাকারীরা সহিংসতা করেছিল মানুষের ইচ্ছাকে দমিয়ে রাখতে। আমাদের গণতন্ত্রের কাজকে আটকে দিতে। সেটা হয়নি আর কখনো হবেও না। আমি অঙ্গীকার করছি, আমি সব আমেরিকানের প্রেসিডেন্ট হব। যারা আমাকে সমর্থন দেননি আমি তাদের জন্যও লড়াই করব। আমরা আমেরিকানরা সম্ভাবনা, নিরাপত্তা, স্বাধীনতা, মর্যাদা, সম্মান চাই, এটিই সত্যি।’
তিনি বলেন, ‘গত কয়েক মাস আমাদেরকে কষ্টদায়ক শিক্ষা দিয়েছে। মিথ্যা সব সময় ক্ষমতা আর লাভের কথা বলে। সংবিধান ও জাতিকে রক্ষার জন্য নেতাদের অবশ্যই সত্যকে রক্ষা এবং মিথ্যাকে পরাজিত করতে হবে। আমাদেরকে নীলের বিরুদ্ধে লালের, শহরের বিরুদ্ধে গ্রামের, উদারতার বিরুদ্ধে রক্ষণশীলতার অভদ্র লড়াই বন্ধ করতে হবে।’
তিনি বলেন, ‘এক জাতি হিসেবে করোনা মহামারির বিরুদ্ধে আমাদের লড়তে হবে।’ বিশ্ব সম্প্রদায়ের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘আমেরিকা পরীক্ষার মুখে পড়েছিল এবং আমেরিকা আরো শক্তিশালী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। আমরা মিত্রদের সঙ্গে সম্পর্ক ঠিক করব। বিশ্বের সঙ্গে আবারও যুক্ত হব। এটি পরীক্ষার সময়, আমাদের গণতন্ত্রের ওপর আঘাত হয়েছে। সবকিছু পেছনে ফেলে আমরা যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসের নতুন অধ্যয় লিখব। সেটা হলো আমেরিকান “স্টোরি”।’
