কার্যকর জন্মনিবন্ধন আবশ্যক

আপডেট : ২১ জানুয়ারি ২০২১, ২১:৪৯

পৃথিবীতে একটি শিশু জন্মাইবার পর রাষ্ট্র হইতে প্রথম যে স্বীকৃতি পাইয়া থাকে, তাহা হইল জন্মনিবন্ধন। জন্মনিবন্ধনের মাধ্যমে নবজাতকের নাম এবং জাতীয়তা নিশ্চিত করিবার প্রথম আইনগত ধাপও সম্পন্ন হইয়া থাকে। বাংলাদেশের জন্মনিবন্ধন আইনে বলা হইয়াছে—বয়স, জাতি-গোষ্ঠী, ধর্ম কিংবা জাতীয়তা-নির্বিশেষে এই দেশে জন্মগ্রহণকারী প্রত্যেকটি মানুষের জন্য জন্মনিবন্ধন করা বাধ্যতামূলক। জন্মনিবন্ধনের পাশাপাশি মৃত্যুনিবন্ধন কার্যক্রমও সমধিক গুরুত্বপূর্ণ। মৃত্যুনিবন্ধন ব্যতীত মৃত ব্যক্তির সম্পত্তি ও উত্তরাধিকার নির্ধারণ এবং একটি দেশের সামগ্রিক জনসংখ্যা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া এবং স্বাস্থ্য-সম্পর্কিত গবেষণা করা প্রায় অসম্ভব। নাগরিকের জীবনের জন্ম, মৃত্যু, মৃত্যুর কারণ, বিবাহ, তালাক, দত্তক—এই সকল গুরুত্বপূর্ণ জনতাত্ত্বিক বিষয় নিবন্ধন করা এবং এই তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে পরিসংখ্যান প্রস্তুত করার সমন্বিত প্রক্রিয়াকে সিভিল রেজিস্ট্রেশন অ্যান্ড ভাইটাল স্ট্যাটিসটিকস (সিআরভিএস) বলা হয়, যাহার মাধ্যমে একটি দেশের সরকার সেই দেশের প্রত্যেক মানুষকে সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করিবার পাশাপাশি শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সর্বোপরি সামাজিক নিরাপত্তাবিষয়ক পরিকল্পনা গ্রহণ করিতে পারে।

দেশে জন্মনিবন্ধনের কার্যক্রম শুরু হইয়াছিল ২০০১ সালে। পরবর্তী সময়ে ২০০৪ সালে সরকার জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধন আইন, ২০০৪ পাশ করে—যাহা কার্যকর হয় ২০০৬ সাল হইতে। বর্তমানে দেশে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি, বিবাহর নিবন্ধন, জাতীয় পরিচয়পত্র এবং পাসপোর্ট, গ্যাস-বিদ্যুত্-পানির সংযোগ, ব্যাংক হিসাব, যানবাহন ও লাইসেন্স নিবন্ধন, ট্রেড লাইসেন্সসহ ১৬টি রাষ্ট্রীয় সেবা পাইবার জন্য জন্মনিবন্ধন সনদ আবশ্যক। পরিতাপের বিষয় হইল—প্রায় ২০ বত্সর হইয়া গেলেও দেশে কার্যকর জন্মনিবন্ধন-ব্যবস্থা তৈরি করা সম্ভব হয় নাই। সর্বশেষ প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী—দেশে ১৭ কোটি ৬৪ লক্ষের অধিক জন্মনিবন্ধন হইয়াছে অথচ অর্থনৈতিক সমীক্ষা ২০২০ অনুযায়ী দেশের মোট জনসংখ্যা ১৬ কোটি ৬৫ লক্ষ। অভিযোগ রহিয়াছে—জন্মনিবন্ধনে অসংখ্য দ্বৈততা বিদ্যমান। জন্মনিবন্ধনের কাজে যেই অনলাইন সফটওয়্যারটি ব্যবহূত হইত তাহাও ছিল প্রায় এক দশকের পুরোনো। এই সফটওয়্যারটির মাধ্যমে সঠিক তথ্য যাচাই এবং দ্বৈততা চিহ্নিত করার সুযোগ ছিল না। তাহার উপর সার্ভারে প্রবেশ করিবার সমস্যা, দ্রুত গতিতে তথ্য সম্পাদনের সমস্যা ছিল অনুষঙ্গ। তবে আশার কথা হইল—এই সকল সমস্যাকে চিহ্নিত করিয়া সরকার ২০১৯ সালে বার্থ-ডেথ রেজিস্ট্রেশন ইনফরমেশন সিস্টেম নামে নতুন সফটওয়্যার চালু করিবার উদ্যোগ গ্রহণ করিয়াছে। নতুন এই সফটওয়্যারের কার্যক্রম সমগ্র দেশের সকল জায়গায় জন্মনিবন্ধন কার্যালয়ে শুরু হয় নাই, অনেক জায়গায়ই সেই পুরোনো সফটওয়্যারটিতেই জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধনের কাজ চলিতেছে। ইহাতে সার্বিকভাবে তথ্য স্থানান্তর আর সমন্বয়ে সমস্যা তৈরি হইতেছে।

জন্ম-মৃত্যুনিবন্ধনের বিষয়টির গুরুত্ব ও তাত্পর্য অপরিসীম। ইউরোপ আমেরিকার মতো  উন্নত দেশসমূহে নাগরিকদের নিরাপত্তা বিধান আর রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা প্রদানের লক্ষ্যে নিবন্ধন কার্যক্রমকে অত্যন্ত গুরুত্বের সহিত বিবেচনা করা হইয়া থাকে। তাহারা উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করিয়া প্রতিটি নাগরিকের তথ্য কেন্দ্রীয়ভাবে জমা করিয়া থাকে। উন্নত বিশ্বের সহিত তাল মিলাইয়া আমরা যখন সামনে আগাইয়া যাইবার প্রত্যয়ে অঙ্গীকারবদ্ধ, সেইখানে উন্নত বিশ্বের মতো দেশের প্রতিটি নাগরিকের সঠিক জন্ম-মৃত্যুর পুঙ্খানুপুঙ্খ হিসাব সরকারের নিকট থাকা অপরিহার্য। ডিজিটাল বাংলাদেশে উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার ছড়াইয়া গিয়াছে প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চল পর্যন্ত। তাই উন্নত প্রযুক্তির সহায়তায় একটি পূর্ণাঙ্গ জন্ম-মৃত্যুর ডাটাবেজ তৈরি করা সময়ের দাবি। ইহার পাশাপাশি একজন নাগরিকের রাষ্ট্রীয় সকল অধিকার ভোগ করিবার বেলাতেও সঠিক নিবন্ধিত তথ্য বিশেষ ভূমিকা পালন করিয়া থাকে। আমরা আশা করিব, জন্মনিবন্ধন কার্যক্রম প্রক্রিয়ায় যেই সকল কারিগরি সীমাবদ্ধতা, লোকবলসংকট আর সমন্বয়হীনতা রহিয়াছে সেই সকল সমস্যা সমাধানে সরকার আরো কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণ করিবে। ইহার পাশাপাশি জনগণকেও নিজেদের রাষ্ট্রীয় অধিকার আর মৌলিক সেবা পাইবার পূর্বশর্ত জন্মনিবন্ধন কার্যক্রমে সচেতনভাবে অংশগ্রহণ করিতে হইবে।