প্রতি বছর বাঙালি জাতির জীবনে যখন জানুয়ারি মাস ফিরে আসে, তখন ১৯৬৯ সালের অগ্নিঝরা দিনগুলি স্মৃতির পাতায় ভেসে ওঠে। প্রত্যেক মানুষের জীবনে উজ্জ্বলতম দিন আছে। আমার জীবনেও কিছু ঐতিহাসিক ঘটনা আছে। ‘ঊনসত্তর’ আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ কালপর্ব। এই কালপর্বে আইয়ুবের লৌহশাসনের ভিত কাঁপিয়ে বাংলার ছাত্রসমাজ ’৬৯-এর ২৪ জানুয়ারি গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ইতিহাস সৃষ্টি করেছিল।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ষাটের দশকের গুরুত্ব অনন্য। এই বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই ’৪৮ ও ’৫২-এর ভাষা আন্দোলন, ’৬২-এর শিক্ষা আন্দোলন, ’৬৬-এর ৬ দফা ও ’৬৯-এর ১১ দফা আন্দোলন হয়েছে। বঙ্গবন্ধু ৬ দফা দেওয়ার পর আমাদের বলেছিলেন, ‘সাঁকো দিলাম স্বাধিকার থেকে স্বাধীনতায় উন্নীত হওয়ার জন্য।’ অর্থাত্ এই ৬ দফার সিঁড়ি বেয়ে তিনি স্বাধীনতায় পৌঁছাবেন। ৬ দফা দেওয়ার পর আইয়ুব-মোনায়েমের নির্দেশে দেশের বিভিন্ন জেলায় বঙ্গবন্ধুর নামে ১০টি মামলা দায়ের করা হয়। প্রতিটি মামলায় জামিন পেলেও দেশরক্ষা আইনে তাকে কারাবন্দি করা হয়। আমরা ছাত্রসমাজ এই গ্রেফতারের বিরুদ্ধে তুমুল গণ-আন্দোলন গড়ে তুলি। ’৬৮-এর ১৯ জুন আগরতলা মামলার বিচার যখন শুরু হয়, সেদিন থেকেই আমরা জানতাম আইয়ুব খান রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগ তুলে বঙ্গবন্ধুকে ফাঁসিকাষ্ঠে মৃত্যুদণ্ড দেবে। আইয়ুব খান প্রদত্ত মামলার নামই ছিল ‘রাষ্ট্র বনাম শেখ মুজিব ও অন্যান্য'।
’৬৯-এর ১৭ জানুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা ভবনের বটতলায় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। ১১ দফা প্রণয়নের পর এটাই প্রথম কর্মসূচি। বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে গভর্নর মোনায়েম খান ১৪৪ ধারা জারি করেছে। ১৪৪ ধারা ভঙ্গের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ঘোষণা করে শ-পাঁচেক ছাত্র নিয়ে রাজপথে এলাম। পুলিশ বাহিনী আমাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে বেপরোয়া লাঠিচার্জ করে। আমরাও সাধ্যমতো প্রতিরোধ গড়ে তুলতে চেষ্টা করি। পরদিন ১৮ জানুয়ারি পুলিশি নির্যাতনের প্রতিবাদে বিক্ষোভ মিছিল ও ঢাকা শহরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে ধর্মঘট পালনের কর্মসূচি দিই। ১৮ জানুয়ারি বটতলায় জমায়েত। সেদিনও ১৪৪ ধারা বলবত্ ছিল। ১৪৪ ধারা ভঙ্গের সিদ্ধান্ত নিয়ে রাজপথে নেমে এলাম। দাঙ্গা পুলিশ বেধড়ক লাঠিচার্জ আর টিয়ার গ্যাস নিক্ষেপ করল। সে সময় রবিবার বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ থাকত। কিন্তু প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় খোলা ছিল। কর্মসূচি নেওয়া হলো, ১৯ জানুয়ারি আমরা প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মিছিল করব এবং ১৪৪ ধারা ভাঙব। আমরা মিছিল শুরু করি। শুরু হয় পুলিশের বেপরোয়া লাঠিচার্জ, টিয়ার গ্যাস নিক্ষেপ। ছাত্রলীগের কর্মী প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আসাদুল হক গুলিবিদ্ধ হয়ে লুটিয়ে পড়েন রাজপথে। পুলিশের বর্বরতা ও গুলিবর্ষণের প্রতিবাদে তাত্ক্ষণিকভাবে ২০ জানুয়ারি সোমবার আবার বটতলায় সমাবেশের কর্মসূচি দিই। ২০ জানুয়ারি উনসত্তরের গণ-আন্দোলনের মাইলফলক। এদিন ১১ দফা দাবিতে ঢাকাসহ প্রদেশের সমস্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পূর্ণ ধর্মঘট পালিত হয়। পুনরায় ১৪৪ ধারা ভঙ্গের ঘোষণা দিলাম। লক্ষ মানুষের মিছিল নেমে এলো রাজপথে। মিছিল যখন আগের কলা ভবন বর্তমান মেডিক্যাল কলেজের সামনে, ঠিক তখনই গুলি শুরু হয়। আমি, ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক খালেদ মোহাম্মদ আলী ও আসাদুজ্জামান একসঙ্গে ছিলাম। আমাদের লক্ষ্য করে এক পুলিশ ইন্সপেক্টর গুলি ছোড়ে। গুলি লাগে আসাদুজ্জামানের বুকে। সঙ্গে সঙ্গে ঢলে পড়ে আসাদ। আসাদকে ধরাধরি করে মেডিক্যাল কলেজের দিকে নেওয়ার পথে আমাদের হাতের ওপরেই সে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। তার গুলিবিদ্ধ রক্তাক্ত শার্টটি সংগ্রামের পতাকা করে আসাদের রক্ত ছুঁয়ে শপথ গ্রহণ করে সমস্বরে আমরা বলি, ‘আসাদ তুমি চলে গেছ। তুমি আর ফিরে আসবে না আমাদের কাছে। তোমার রক্ত ছুঁয়ে শপথ করছি, আমাদের দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আমরা মায়ের কোলে ফিরে যাব না।’ এরপর ছুটে গেলাম শহিদ মিনার চত্বরে। আসাদের মত্যুর খবর ঘোষণা করলাম শোকার্ত জনতার মাঝে। আসাদের রক্তাক্ত শার্ট সামনে রেখে সমাবেশের উদ্দেশে বললাম, ‘আসাদের এই রক্ত আমরা বৃথা যেতে দেব না’ এবং ২১ জানুয়ারি পল্টনে আসাদের গায়েবানা জানাজা এবং ১২টা পর্যন্ত হরতালের কর্মসূচি ঘোষণা করি।
২১ জানুয়ারি পূর্বঘোষিত হরতাল কর্মসূচি সফলভাবে পালিত হলো। ২২ জানুয়ারি ঢাকা নগরীতে এমন কোনো বাঙালি দেখিনি, যার বুকে কালো ব্যাজ নেই। বাড়িতে, অফিসে সর্বত্রই কালো পতাকা উড়ছে। একমাত্র ক্যান্টনমেন্ট ছাড়া ঘৃণা প্রকাশের এই প্রতীকী প্রতিবাদ ছিল সর্বত্র। ২৩ জানুয়ারি, শহরের সমস্ত অলিগলি থেকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে বের হয় মশাল মিছিল। ২৪ জানুয়ারি সর্বাত্মক হরতাল পালিত হলো। হরতালের পরও মিছিলের বিরাম নেই। সমগ্র বাংলাদেশ গণ-অভ্যুত্থানের প্রবল বিস্ফোরণে প্রকম্পিত, অগ্নিগর্ভ। কিছুক্ষণের মধ্যে সেনাবাহিনী, ইপিআর ও পুলিশ মরিয়া হয়ে ওঠে বিক্ষোভ দমনে। যত্রতত্র গুলি চালাতে থাকে। সেই গুলিতেই শহিদের তালিকায় যুক্ত হয় মতিউর, মকবুল, আনোয়ার, রুস্তম, মিলন, আলমগীরসহ আরো অনেক নাম।
ঢাকার নবকুমার ইনস্টিটিউশনের দশম শ্রেণির ছাত্র মতিউর রহমানের লাশ নিয়ে আমরা পল্টনে যাই। লক্ষ লক্ষ মানুষ পল্টনে সমবেত হয়। ২৪ জানুয়ারি গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে আমরা ১১ দফার প্রতি ছাত্র, শ্রমিক, কৃষক, পেশাজীবী, বুদ্ধিজীবীসহ বাংলার সর্বস্তরের মানুষের সমর্থন আদায় করতে পেরেছিলাম।
অনেক সময় চিন্তা করি, যদি বঙ্গবন্ধু ৬ দফা কর্মসূচি না দিতেন, তবে আগরতলা মামলা তথা ‘রাষ্ট্র বনাম শেখ মুজিব ও অন্যান্য’ মামলা হতো না; আগরতলা মামলা না হলে প্রিয় নেতা বঙ্গবন্ধু মুজিবসহ সব রাজবন্দির নিঃশর্ত মুক্তির দাবিতে ১১ দফাভিত্তিক গণ-আন্দোলন ও গণ-অভ্যুত্থান সংঘটিত হতো না; আর ’৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থান না হলে এক মাথা এক ভোটের ভিত্তিতে ’৭০-এর ঐতিহাসিক নির্বাচন হতো না এবং সেই নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন না পেলে আন্তর্জাতিক বিশ্বে জাতীয় মুক্তি সংগ্রাম চিহ্নিত হতো ‘বিচ্ছিন্নতাবাদী’ আন্দোলন হিসেবে। ফলত, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের ডাকে ধর্ম-বর্ণ-শ্রেণী-গোষ্ঠীনির্বিশেষে সবার জাতীয় ঐক্য যে নিশ্চিত হয়েছিল, তার ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছিল ৬ দফা ও ’৭০-এর নির্বাচনি ফলাফল। সুতরাং, ৬ দফা থেকে ১১ দফা হয়ে ১ দফা তথা স্বাধীনতার কর্মসূচিতে পৌঁছানোর এই নিরবচ্ছিন্ন প্রক্রিয়া এক সূত্রে গাঁথা। এসব অর্জনের ড্রেস রিহার্সেল ছিল ’৬৯-এর অগ্নিঝরা দিনগুলি, যা ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা আছে এবং থাকবে চিরদিন।
n লেখক :আওয়ামী লীগ নেতা; সংসদ সদস্য; সভাপতি,
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি
