হোয়াইট হাউজে বাইডেন

আপডেট : ২৩ জানুয়ারি ২০২১, ২২:২৭

অবশেষে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসের সবচেয়ে আলোচিত-সমালোচিত প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পতন হলো। ৪৬তম প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নিলেন জো বাইডেন। এটা সবারই জানা যে, ট্রাম্প আমলে বিশ্ব রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান ছিল অনেকটা লেজেগোবরে। তবে বাইডেনের পূর্বরাজনৈতিক ও প্রশাসনিক দক্ষতা থাকায় মার্কিনিরা এবার আশার আলো দেখতে পারে। বাইডেনের জয়ে আমেরিকানরা আনন্দে ভাসলেও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিদ্বন্দ্বীদের কপালে ঠিকই চিন্তার ভাঁজ পড়েছে। বিশেষ করে চিরবৈরী শত্রু রাশিয়ার জন্য এটা অশনিসংকেত। ট্রাম্পের দুর্বলতার সুযোগে বিশ্বে পুতিন যেভাবে অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠছিলেন, তবে কি তা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ল? সুতরাং ট্রাম্প-পরবর্তী সময়ে বিশ্বে তথা মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতির মেরুকরণ নিয়ে  নতুন করে হিসাব মেলানোর  সময় এসেছে।   

বাইডেন ও পুতিনের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার  ইতিহাস তুলনা করলে দেখা যায়, হোয়াইট হাউজ অধিপতি ক্রেমলিন অধিপতির চেয়ে এগিয়ে। জো বাইডেনের ১৯৭০ সালে সিনেটর হওয়ার মধ্য দিয়ে রাজনীতিতে  অভিষেক হয়। অন্যদিকে পুতিন ১৯৮৫ সালে রুশ গোয়েন্দা বিভাগে যোগ দেওয়া একজন কর্মকর্তা মাত্র। ১৯৯০ সালে সোভিয়েত পতন-পরবর্তী সময়ে রাশিয়ায় গণতন্ত্র চালু হলে পুতিন ১৯৯৯ সালে বরিস ইয়েলিসন সরকারের প্রধানমন্ত্রী হবার সুযোগ পান। আবার জো বাইডেন ওবামা সরকারের দুই মেয়াদে (২০০৯-২০১৭ সাল) ভাইস প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করেন। দুই নেতার পূর্বরাজনৈতিক অতীত বিশ্লেষণ করে নিশ্চিত হওয়া যায় যে, অচিরেই আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে আধিপত্যের লড়াইর সাক্ষী হতে যাচ্ছে বিশ্ববাসী।    

আমরা জানি, আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ইউরোপের অবস্থান কৌশলগতভাবে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। দুইটি বিশ্বযুদ্ধের ভয়ানক অভিজ্ঞতা আছে ইউরোপের। উল্লেখ্য, সে সময় বিভিন্ন পশ্চিমি দেশের রাজধানীর দিকে তাক করে মোতায়েন ছিল রুশ পরমাণু অস্ত্রবাহী ক্ষেপণাস্ত্র। সংগত কারণেই রাশিয়ার সঙ্গে সীমান্ত থাকায় ইউরোপের দ্বন্দ্ব নিয়মিত বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। যেমন—ইউরোপের দেশ ইউক্রেনে ২০১৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে রুশপন্থি প্রেসিডেন্ট ইয়ানকোভিচের পতনের এক সপ্তাহে সীমান্তে সেনা মোতায়েন করেন পুতিন। এর পরের মাসেই অর্থাত্ মার্চে ক্রিমিয়া দখল করেন। সেই সঙ্গে রুশপন্থি বিদ্রোহীদের সহায়তা করতে থাকেন পুতিন। ফলে ইউক্রেনে সরকার বনাম রুশপন্থি বিদ্রোহীদের মধ্যকার লড়াই দীর্ঘায়িত হয়। পরবর্তী সময়ে ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে আর্জেটিনার রাজধানী বুয়েন্স আয়ার্সে জি-২০ শীর্ষ সম্মেলনে পুতিন বলেন, ইউক্রেনে পাশ্চাত্যপন্থি রাজনীতিবিদরা ক্ষমতায় থাকলে সমস্যার সমাধান হবে না। এদিকে ইউরোপের আরেক প্রভাবশালী দেশ যুক্তরাজ্যের সঙ্গেও বিরোধ হয় পুতিনের। বিরোধের সূত্রপাত্র হয় ২০১৮ সালের মার্চে সাবেক রুশ গোয়েন্দা সের্গেই স্কিপালের ওপর হামলাকে কেন্দ্র করে। তখন তেরেসা মের সরকার রাশিয়াকে সরাসরি দায়ী করেন; উপরন্তু ২৩ জন কূটনীতিককে বহিষ্কার করেন। যুক্তরাজ্য রাশিয়াকে কতটুকু হুমকিতে দেখে ব্রিটিশ সেনাপ্রধান মার্ক কার্লটনের একটি মন্তব্যে তা স্পষ্ট হয়। তিনি ঐ বছরের নভেম্বরে বলেন, রাশিয়া আইএসের চেয়ে বড় হুমকি! এ অঞ্চলের আরেক উদীয়মান শক্তিশালী দেশ তুরস্কের সঙ্গে ২০২০ সালের আগস্ট মাসে গ্রিসের দ্বন্দ্ব শুরু হয়। দ্বন্দ্ব চলাকালীন রাশিয়া তুরস্ককে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এস-৪০০ দিতে সম্মত হয়। অথচ ২০১৮ সালে সিরিয়া যুদ্ধে রুশ বিমান তুরস্ক ভূপাতিত করলেও পুতিন কৌশলগত সম্পর্ক রক্ষায় মূলত এ কাজটি করেন। তুরস্ক ও সাইপ্রাসের বিরোধ বহু পুরোনো। এখানেও বিরোধ মেটাতে এগিয়ে আসেন পুতিন। এর ফলে সাইপ্রাসের সঙ্গে দহরম-মহরম সম্পর্ক স্থাপিত হয় রাশিয়ার। তার প্রমাণ মেলে ২০২০ সালের সেপ্টেম্বর মাসে সাইপ্রাসের প্রেসিডেন্ট আনাস্তাসিয়াদাসের রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী ল্যাভরভের হাতে গ্র্যান্ড ক্রস উপহার তুলে দেওয়ার মাধ্যমে। তুরস্ক ও সাইপ্রাস তথা এই দুই দেশের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখার মাধ্যমে মূলত শ্যাম এবং কুল দুই-ই রাখলেন পুতিন। এদিকে আবার সাবেক সোভিয়েতভুক্ত দেশ আর্মেনিয়া এবং আজারবাইজানের সঙ্গে যুদ্ধ শুরু হয় গত বছরের অক্টোবর মাসে। উল্লেখ্য, আর্মেনিয়ায় রাশিয়ার সামরিক ঘাঁটি আছে। পুতিন এখানেও দুই পক্ষে শান্তিচুক্তির মাধ্যমে সমঝোতা করে দেন।

পুতিন সম্প্রতি এশিয়াতেও প্রভাব বিস্তারে উঠে পড়ে লেগেছেন। বলা হয়ে থাকে, যুক্তরাষ্ট্র ভারতের চশমা দিয়ে এশিয়াকে দেখে।

এবার তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ঐতিহাসিক মিত্র ও এশিয়ার অন্যতম পরাশক্তি ভারতের কাছে এস-৪০০ বিক্রির চুক্তি করে ফেললেন। আনন্দ বাজারের খবর অনুযায়ী, ভারত ২০২৫ সালের মধ্যেই এস-৪০০ পেতে যাচ্ছে। এ চুক্তিটি এমন সময় হলো যখন ট্রাম্পের বিদায়ঘণ্টা বেজে গেছে এবং বাইডেন নতুন প্রেসিডেন্ট হিসেবে ক্ষমতা গ্রহণ করতে যাচ্ছেন। যুক্তরাষ্ট্র বিষয়টি হালকাভাবে নেয়নি এবং দেরি না করে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে। দেখা যাচ্ছে, পুতিন এখানেও দাবার ঘুঁটি সুনিপুণভাবেই বসালেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, পুতিনের কার্যক্রমে সাম্রাজ্যবাদী রাশিয়ার জারদের প্রভাব স্পষ্ট। পরাক্রমশালী রুশ জারদের যে Warm Water Policy সেটাই তিনি বাস্তবায়ন করে যাচ্ছেন। বিশেষ করে ভূমধ্যসাগরে সেটা তিনি বেশ সফলভাবেই করছেন। তবে বাইডেন প্রেসিডেন্ট হওয়ায় পুতিনের জন্য কতটুকু চ্যালেঞ্জ তৈরি করল সেটা সময়ই বলে দেবে। আবার আমাদের এটাও মনে রাখতে হবে যে, আমেরিকার ২০১৬ সালের নির্বাচনে পুতিন যা করেছেন, এরপর তার পক্ষে অসম্ভব বলে কিছু নেই, তাও প্রমাণিত হয়ে গেছে। 

n লেখক :শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়