শীত ও করোনায় পথশিশুর জীবন

আপডেট : ২৩ জানুয়ারি ২০২১, ২২:২৭

 ‘হে  সূর্য তুমি আমাদের স্যাঁতসেঁতে ভিজে ঘরে উত্তাপ আর আলো দিও/ আর উত্তাপ দিও রাস্তার ধারের ঐ উলঙ্গ ছেলেটাকে’ (প্রার্থী, সুকান্ত ভট্টাচার্য)

শীতের তীব্রতায় নিজেকে অসহায় মেনে গলায় গলাবন্ধ, মাথায় কান ঢাকা বানর টুপি, উলের বাহারি সব সোয়েটার, সুট-কোট কিংবা পশমি শাল দিয়ে শীতকে প্রতিহত করার কত আপ্রাণ চেষ্টা আমাদের। অন্যদিকে প্রাণপাখিকে বাঁচিয়ে রাখার কত আয়োজন ঠাঁইহীন দিশাহীন পথশিশুদের। অসহায় এই পথশিশুদের জীবন কত নিদারুণ কষ্টের, অসহায়ত্বের তার প্রমাণ পায় পৌষ-মাঘের রাতে। পুরোনো কাগজ, খড়কুটো দিয়ে কখনো আগুন জ্বালিয়ে আবার কখনো গায়ে ছেঁড়া বস্তা, কখনো পলিথিন এবং ছেঁড়া কাঁথা মুড়িয়ে শীতকে প্রতিহত করার আপ্রাণ চেষ্টা তাদেরও। কিন্তু সব আয়োজনকে ব্যর্থ প্রমাণ করে শীত যেন হুল হয়ে ফোটে তাদের রিক্তময় শরীরের পশমে পশমে। কখনো যেন মৃত্যুর রূপে হানা দেয় অর্ধউলঙ্গ জীর্ণ দেহের ওপর। শুষ্কতায়, রিক্ততায়, হাহাকারে টইটম্বুর শিশুরা কুয়াশাচ্ছন্ন আকাশ পানে চেয়ে থাকে একমুঠো রোদ্দুরের প্রার্থী হয়ে। শীতের কাঁপুনিতে দাঁতে দাঁত ঘেঁষে অপেক্ষারত শিশুরা ভাবে এই বুঝি ভোর হলো, এখনি বুঝি লাজুক সূর্য কুয়াশার বুক চিরে উঁকি দেবে পুব আকাশে। অবশেষে শত অপেক্ষার প্রহর শেষে যখন সূর্য ওঠে ফুটপাত, রেলস্টেশন, ওভারব্রিজের নিচ থেকে বেরিয়ে আসে নির্ঘুম রাত্রিযাপনকারী এ শিশুরা। ললাট দোষে সব কষ্ট মেনে নিয়ে বাঁচার স্বপ্ন দেখা এ স্বপ্নচারীরা বড় দুর্বিপাকে এই করোনাকালীন সময়ে। এ যেন মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা। শীতের ভয়াবহতাকে উপেক্ষা করে পেট চালানো গেলেও করোনার প্রথম দিকে লকডাউনের কারণে দিনে একবেলাও খাবার সংগ্রহ কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ে। লকডাউনের কারণে সবকিছু বন্ধ থাকায় তাদের টিকে থাকায় কষ্টকর হয়ে দাঁড়ায়। এ সংকটে ‘ঘরে থাকুন, নিরাপদ থাকুন’ এই প্রতিপাদ্য ‘ঘরে থাকুন, মৃত্যু দেখুন’ এর রূপ নিয়েছে। যে শিশুরা যত্রতত্র ঘুমিয়ে ওঠে চিন্তা করে ‘এখন খাবো কী?’ তাদের কাছে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা যেন নিছক প্রহসন। পেটে ক্ষুধার আগুন জ্বললে মুখে মাস্ক থাকে না। স্ট্রিট চিলড্রেন অ্যাক্টিভিস্টস (স্ক্যান) ৪৫২ জন পথশিশুর ওপর জরিপ করে দেখে তারা কেউই মাস্ক পরে না। তারা করোনা বলে কিছু আছে বিশ্বাসই করতে চায় না। কারণ তাদের কাছে জীবন মানেই দুমুঠো খেতে পাওয়া। হোক তা উচ্ছিষ্ট, হোক ভালো। করোনা ও শীতের হাহাকার মিলে পথশিশুর জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছে। পেটে নেই ভাত, গায়ে নেই কাপড় এ যেন কুরুক্ষেত্র। যেখানে বাঁচার ধর্মই অনবরত যুদ্ধ করা। লাইন ধরে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকে বিতরণকৃত খাদ্য না পাওয়া, ক্ষুধা নিরাময়ের জন্য মানুষের দ্বারে দ্বারে ঘোরা, সবই যেন যুদ্ধের অংশ। তাদের এ কষ্ট কিছুটা নির্মূল করতে বিত্তবানদের এগিয়ে আসতে হবে। অসহায়দের পাশে দাঁড়ানো বাক্যবন্ধনীতে নয়, বাস্তবে যেন এর প্রতিফলন ঘটে সে দিকে নজর দিতে হবে। তবেই হবে মনুষ্যত্বের জয়গান, মানবতার মুক্তি।

n  লেখক :শিক্ষার্থী, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট।