দেশের অর্থনীতি যেখানে ক্রমশ এগিয়ে যাওয়ার লড়াই করছে, সেখানে এক সময়ের বাংলাদেশের অন্যতম বৃহত্ শিল্প পাটশিল্পের স্থবিরতা সংশয়ে ফেলছে সবাইকে। দেশে যদি আমদানির থেকে রপ্তানি পণ্যের পরিমাণ বৃদ্ধি করতে হয়, তাহলে পাটশিল্পের মতো বড় একটা শিল্পের অগ্রগতি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। পাটশিল্পের অগ্রযাত্রার পরে এই শিল্পের অগ্রগতি লক্ষ করা গেলেও বর্তমানে শিল্পের অবস্থা আশঙ্কাজনক, যেটা থেকে অতি দ্রুত পাটশিল্পকে উত্তরণ করা প্রয়োজন।
১৯৭২ সালে ৬৭টি ব্যক্তিমালিকানাধীন ও পরিত্যক্ত পাটকল তদারকি, পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে ‘বাংলাদেশ জুট মিলস করপোরেশন’ গড়ে তোলা হয়। এছাড়া পাটশিল্পকে আরো সুদূরপ্রসারী করতে ১৯৭৪ সালের অ্যাক্টের মাধ্যমে দেশের অন্যতম প্রাচীন গবেষণা প্রতিষ্ঠান হিসেবে বর্তমান ‘বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট’ প্রতিষ্ঠিত হয়। তবে কিছুদিনের মধ্যেই এগুলোর অনাগ্রহতা প্রকাশ পায় যার ফলস্বরূপ পাটশিল্পে বর্তমানে নানা সমস্যা বিদ্যমান। দুর্নীতি, অদক্ষতা, অব্যবস্থাপনা অবহেলা এগুলোর কারণে একের পর এক পাটকল বন্ধ হতে থাকে। এছাড়া শ্রমিকের ঠিকমতো মজুরি না দেওয়ার ফলে এই শিল্পের ওপর থেকে তাদের আগ্রহ কমতে থাকে, যার ফলে শ্রমিক সংকট দেখা দেয়। পাটকলগুলো বন্ধের প্রধান একটি কারণ হিসেবে দেখানো হয়েছে লোকসান। তবে সরকারি পাটকল বন্ধের ক্ষেত্রে প্রধান কারণ হলো কাঁচা পাট কেনায় অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতি। এছাড়া অন্যতম লক্ষণীয় বিষয় হলো উত্পাদনশীলতা কম কিন্তু উত্পাদন খরচ বেশি। সরকারি পাটকলগুলোতে যন্ত্রপাতি পুরোনো হওয়াতে উত্পাদনক্ষমতা হ্রাস পাচ্ছে। অন্যদিকে বেসরকারি পাটকলগুলোতে আগের থেকে অবস্থা অনেকটা ভালো লক্ষ করা যাচ্ছে। বাংলাদেশের আবহাওয়া ও ভূমি পাট চাষের জন্য উপযোগী হলেও দিনদিন চাষিদের পাট চাষের প্রতি আগ্রহ কমে যাচ্ছে। ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় অনেকে পাট চাষ থেকে নিজেকে সরিয়ে নিচ্ছে, তবে উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে উত্পাদন বাড়ানো যায় বলে এখনো এর চাহিদা রয়েছে তাদের কাছে। নব্বইয়ের দশকে এদেশে পাট উত্পাদন হতো ১২ লাখ হেক্টর জমিতে। ক্রমশ সেই পাটের জমির পরিমাণ কমতে কমতে ৩০-৪০ বছর ধরে ৪ বা সাড়ে ৪ লাখ হেক্টর জমিতে পাটের চাষ হয়েছে। পরবর্তী সময়ে পরিবেশ সচেতনতা, প্রাকৃতিক আঁশের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধির কারণে সেই জমির পরিমাণ কিছুটা বৃদ্ধি পেয়ে ৭-৮ লাখে এসেছে। তবে অপেক্ষাকৃত উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে তার উত্পাদন আগের তুলনায় বেড়েছে। পাটশিল্প বরাবরই বাংলাদেশের জন্য সম্ভাবনাময় একটি শিল্প। এই শিল্পের প্রতি যথাযথ দৃষ্টি দিতে হবে। করোনা মহামারিতে যেখানে অন্য সব ক্ষেত্রে ধস নেমেছে, সেখানে পাটশিল্পের রপ্তানি বৃদ্ধি পেয়েছে। পাটশিল্পের ক্ষেত্রে বিদ্যমান যে সমস্যাগুলো রয়েছে সেগুলোকে দূর করার জন্য যথাযথ উদ্যোগ নিতে হবে। গত অর্থবছরে ৮৮ কোটি ২৩ লাখ ডলারের পাট ও পাটজাত পণ্য রপ্তানি হয়েছে। এই আয় তার আগের অর্থবছরের চেয়ে ৮ দশমিক ১০ শতাংশ বেশি।
পাটশিল্পকে টিকিয়ে রাখতে পারলে রপ্তানি খাতে এক উজ্জ্বলময় ভবিষ্যত্ তৈরি করতে পারবে। বাংলাদেশ সরকারি পাটকলগুলোতে আরো বেশি নজর দিতে হবে সেখানে বিদ্যমান শ্রমিক সমস্যা, অদক্ষতা, দুর্নীতি এগুলোকে প্রতিহত করতে হবে। বাংলাদেশের অর্থনীতির অগ্রগতির জন্য পাটশিল্পকে টিকিয়ে রাখা একান্ত প্রয়োজন।
n লেখক :শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়
