রহস্যময়তা, প্রায়োগিক দিক কিংবা প্রকৃতির মাঝে খুঁজে পাওয়া বিস্ময়কর অনুপাত গোল্ডেন রেশিও। হাজার হাজার বছর ধরে গণিতবিদ, স্থপতি, চিত্রশিল্পী, দার্শনিক, সংগীতজ্ঞদের চিন্তার খোরাক জুগিয়ে এসেছে আপাতদৃষ্টিতে সাদামাটা গাণিতিক এই অনুপাত। অন্যান্য অনুপাতের মতোই গোল্ডেন রেশিও একটি সাধারণ অনুপাত যার মান ১.৬১৮০৩৩৯৮৮...। গোল্ডেন রেশিও অনুপাতকে প্রকাশ করা হয় ল্যাটিন অক্ষর j (PHI/ফাই) দ্বারা। জ্যামিতির জনক ইউক্লিডের এলিমেন্টস গ্রন্থে গোল্ডেন রেশিওর প্রথম লিখিত সংজ্ঞা পাওয়া যায়। একটি সরলরেখার ওপর এমন একটি বিন্দু কল্পনা করা হয় যাতে রেখাটি এমনভাবে দুই ভাগে ভাগ হয় যেন রেখার বড় অংশ ও ছোট অংশের ভাগফল রেখাটির সম্পূর্ণ অংশ ও বড় অংশের ভাগফলের সমান হয়।
প্রায় ২৪০০ বছর ধরে মানুষ গোল্ডেন রেশিও নিয়ে গবেষণা করে আসছে এবং প্রতিনিয়ত এটি মানুষকে বিস্মিত করেছে। প্রাচীন গ্রিক গণিতবিদেরাই গোল্ডেন রেশিও নিয়ে সর্বপ্রথম গবেষণা শুরু করেন। গোল্ডেন রেশিও কিংবা PHI-এর সঙ্গে ফিবোনচ্চি সিরিজের গভীর সম্পর্ক। ফিবোনচ্চি সিরিজের প্রতিটি পদ আগের দুই পদের যোগফল ১, ১, ২, ৩, ৫, ৮, ১৩, ২১, ৩৪, ৫৫, ৮৯, ১৪৪...। ফিবোনচ্চি সিরিজের যে কোনো পদকে আগের পদ দিয়ে ভাগ করলে PHI কিংবা গোল্ডেন রেশিওর মান পাওয়া যায়। প্রথম কয়েকটি পদের হিসেবে গরমিল মনে হলেও ফিবোনোচ্চি সিরিজের ৩৯তম পদ থেকে ক্রমিক সংখ্যাদ্বয়ের অনুপাত প্রায় ধ্রুব হয়ে যায় এবং এই ধ্রুব সংখ্যাই PHI কিংবা গোল্ডেন রেশিওর মান।
গোল্ডেন রেশিওর উপস্থিতি সমগ্র সৃষ্টিজগতের সর্বত্র—মানুষের হূিপণ্ড, দৈহিক গঠন, ফুল, গাছপালা, গ্রহ, নক্ষত্র সবকিছুতেই PHI-এর মান পাওয়া যায়। পিরামিড, আইফেল টাওয়ার থেকে শুরু করে তাজমহল, কিংবা নটরডেমের মতো দৃষ্টিনন্দন অসংখ্য স্থাপত্যের আর্কিটেকচারাল ডিজাইনে গোল্ডেন রেশিও অনুপাত ব্যবহার করা হয়েছে। লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি গোল্ডেন রেশিওকে বলেছিলেন The Divine Proportion কিংবা স্বর্গীয় অনুপাত। তিনিই প্রথম মানবদেহে PHI-এর উপস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেন। ভিঞ্চি তাঁর বিভিন্ন চিত্রকর্মে ভিন্ন আঙ্গিকে গোল্ডেন রেশিও উপস্থাপন করেন। পিথাগোরাস, ইউক্লিড, কেপলার, রজার পেনরোজসহ পৃথিবীর জ্ঞানীগুণী ব্যক্তিরা গোল্ডেন রেশিওর রহস্যময় এবং বিস্ময়কর উপস্থিতি নিয়ে গবেষণা করেছেন।
মজার ব্যাপার হচ্ছে Apple, Adidas, Honda, Toyota, Mercedes-Benz, CocaCola, Pepsi, National Geography ইত্যাদি অনেক বড় বড় কোম্পানি তাদের লোগোতে গোল্ডেন রেশিও ব্যবহার করেছে। বিস্ময়কর হলেও সত্যি, সৌরজগতের গ্রহগুলোর সূর্যের চারপাশের আবর্তনকাল PHI-এর সঙ্গে সম্পর্কিত। মহাবিশ্বের চরম বিশৃঙ্খল অবস্থার মধ্যেও গোল্ডেন রেশিওর অনুপাত বজায় থাকে। সৃষ্টিজগতের প্রতিটি বস্তুর মাঝে অসাধারণ মেলবন্ধন তৈরি করার জন্য গোল্ডেন রেশিওকে বলা হয় The Number of Life।
