মানুষের জীবন দুর্বিষহ হইয়া উঠিতেছে

আপডেট : ২৫ জানুয়ারি ২০২১, ২১:৪৭

বাংলাদেশ একটি কল্যাণকর রাষ্ট্র হইয়া উঠার পরিক্রমার মধ্যে রহিয়াছে। প্রতিটি দেশের কল্যাণব্যবস্থা সেই দেশের আর্থসামাজিক কাঠামোর উপর ভিত্তি করিয়া গড়িয়া উঠে। আমাদের অর্থনীতি উঠতি পর্যায়ের। সেই কারণে আমাদের বিদ্যমান আর্থিক ও উন্নয়ন অপচয়ের দিকটি সবিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। উন্নয়নের আর্থিক লেনদেন রাষ্ট্রকেই করিতে হয়। কিন্তু আমরা দেখিতে পাইতেছি, এই অনিয়ম এখন গ্রাম পর্যায় পর্যন্ত পর্যবসিত হইয়াছে। বলা যায়, আর্থিক অনিয়মের কারণে সাধারণ মানুষের জীবন দুর্বিষহ হইয়া উঠিতেছে। কিছুদিন পূর্বে একটি জরিপে দেখা গিয়াছে, সংসদীয় আসনের সংসদ সদস্যদের অনুকূলে পল্লি অবকাঠামো উন্নয়নে যেই সকল কাজ করা হইয়াছে, তাহার প্রায় এক-তৃতীয়াংশেরই মান খারাপ। উপরন্তু কাজ সম্পন্ন করা এবং কাজের বিল দেওয়া পর্যন্ত বিভিন্ন ধাপে রহিয়াছে কমিশন বাণিজ্য। ইহা ছাড়াও, গোটা দেশে উন্নয়নের জন্য যেই সরকারি বরাদ্দ দেওয়া হয়, তাহার বৃহত্ একটি অংশ অসম্পন্নই থাকিয়া যায়। অনেক ক্ষেত্রে যেইটুকু কাজ সম্পন্ন হয়, সেইটুকুও বহুলাংশে মানসম্পন্ন হয় না। কিন্তু কেন এই রকম হইবে? এই সকল কাজ তদারকির জন্য সরকারি বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা রহিয়াছেন। তাহারা কী করেন? এমন নহে যে, এই তদারকি করা হয় ঢাকা হইতে। প্রতিটি জেলায় সংশ্লিষ্ট উন্নয়নকাজের কর্মকর্তারা রহিয়াছেন। এসও, এসডি, এক্সিকিউটিভ ইঞ্জিনিয়ার, সুপারিনটেনডেন্ট ইঞ্জিনিয়ার, চিফ ইঞ্জিনিয়ার—এই সকল কর্মকর্তার কাজ কী তাহা হইলে? অন্যদিকে, স্থানীয় পর্যায়ে নানা স্তরে আমাদের জনপ্রতিনিধিগণ রহিয়াছেন। একেবারে তৃণমূল ইউনিয়ন পর্যায়ে রহিয়াছেন চেয়ারম্যান-মেম্বারগণ। তাহার পরও সরকারি কাজ ঠিকমতো না হইবার কারণ কী?

আমরা দেখিয়াছি, অসংখ্য ক্ষেত্রে অন্যের লাইসেন্সে ভাগবাঁটোয়ারা করিয়া ঠিকাদারি কাজ করা হয়। আবার, একজন ঠিকাদার শত কোটি টাকার কাজের পূর্বাভিজ্ঞতা না থাকিলে তিনি একটি নির্দিষ্ট অঙ্কের কাজের যোগ্য হইবেন না। প্রশ্ন হইল—এই রকম শর্ত থাকিলে ছোট ঠিকাদার অভিজ্ঞতা পাইবেন কোথায়? আর অভিজ্ঞতাই যদি এত গুরুত্বপূর্ণ হয়, তাহা হইলে ‘অভিজ্ঞ’ কর্মকর্তারা রহিয়াছেন কেন? সার্বিকভাবে দেখা যাইতেছে, অন্যের নিকট কাজ বিক্রয় করিয়া দেওয়া, বিলম্বে কাজ শুরু করা, কিছুটা কাজ করিয়া বিলের টাকা তুলিয়া পুনরায় কাজ বন্ধ রাখা—এইগুলি খুব সাধারণ চিত্র। ইহা ছাড়াও প্রকল্পে অর্থ ছাড়ে বিলম্ব, পূর্ণকালীন প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ না করা, দক্ষ ও কারিগরি জ্ঞানসম্পন্ন জনবলের অভাব, বারবার প্রকল্প পরিচালক পরিবর্তন, ডিপিপি তৈরির সময় দ্রব্যের মান ও মূল্য নির্ধারণে অদূরদর্শিতা, সম্ভাব্যতা সমীক্ষা ছাড়াই প্রকল্প গ্রহণ এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের বিভিন্ন পর্যায়ে নূতন নূতন অঙ্গ সংযোজনের সমস্যা তো রহিয়াছেই। এমতাবস্থায় প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্ব না হইয়া যাইবে কোথায়? প্রশ্ন হইল—সরকারের এতগুলি দায়িত্বরত পদের জাল ছিঁড়িয়া একজন ঠিকাদার কাজ অসম্পূর্ণ রাখিয়া কিংবা কাজের অনিয়ম করিয়া অতিরিক্ত অর্থ কী করিয়া হাতাইয়া লইয়া যান? কেনই-বা তাহাকে এহেন অপরাধে কলো তালিকাভুক্ত করা হয় না? এই ক্ষেত্রে ইহা অনুধাবন করা খুব কঠিন নহে যে, ‘কালো লেনদেনের’ কারণেই এইরূপ ঘটিয়া থাকে। অথচ যেই নিয়মকানুন বিদ্যমান রহিয়াছে, তাহা যথাযথভাবে অনুসরণ করিলেও এই পরিস্থিতি হইবার কথা নহে।

এই সকল জটিলতার ভিতর দিয়াই দুর্নীতির শিকড় ছড়াইয়া পড়িতে পারে অনায়াসে। প্রকৃতপক্ষে এইভাবে রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় হইলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কিছুই আসে-যায় না। কারণ, ইহার জন্য তাহাদের শাস্তি ভোগ করিতে হয় না। বরং বহু ক্ষেত্রেই অনিয়মের মাধ্যমে নিজেদের আখের গুছাইতে পারেন। বলিবার অপেক্ষা রাখে না, সীমিত সম্পদের সর্বোচ্চ সদ্ব্যবহারই দক্ষতার প্রথম শর্ত। সুতরাং উন্নয়নকাজে সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তাদের দক্ষতার বিষয়ে বিশেষ নজরদারি প্রয়োজন। এই সকল আর্থিক ও বিভিন্ন অনিয়মের কারণে সৃষ্ট জনগণের দুর্বিষহ অবস্থা হইতে পরিত্রাণ দেওয়া একটি কল্যাণকর রাষ্ট্রের অন্যতম লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য। এই সারসত্য রাষ্ট্রযন্ত্র যেন ভুলিয়া না যায়।