শিশুর প্রারম্ভিক বিকাশে বড়দের করণীয়

আপডেট : ২৫ জানুয়ারি ২০২১, ২১:৪৯

পরিবার ও সমাজে শিশুদের সুষ্ঠুভাবে বেড়ে ওঠার পেছনে বড়দের ভূমিকা অত্যধিক। শৈশব হচ্ছে অবারিত আনন্দে বেড়ে ওঠার সময়। শৈশবে শরীরের বৃদ্ধি ও মনের বিকাশ একসঙ্গে সঠিকভাবে বৃদ্ধি হতে থাকলে সত্যিকার অর্থে শিশুর পরিপূর্ণ বিকাশ ঘটে। পাশাপাশি শিশু সুস্থ সবল, উদ্যমী ও দক্ষ হয়ে ওঠে। বাংলাদেশে শিশুর যত্ন ও প্রতিপালন বিষয়ে মা-বাবা তথা বড়দের জ্ঞান ও সচেতনতা সীমিত। অন্যদিকে আমাদের ঘনবসতিপূর্ণ দেশে বিভিন্ন কারণে ফুলের মতো অসংখ্য শিশুকে শৈশবেই কঠোর পরিশ্রম করতে হয়। ফলে তারা বঞ্চিত হয় পরিপূর্ণ বিকাশ ও মানবসম্পদে রূপান্তরিত হওয়ার সুযোগ থেকে। জন্মের পর থেকেই শিশু শিখতে শুরু করে। যখন একটি শিশু তার পরিবার থেকে পর্যাপ্ত পুষ্টি ও যথাযথ স্বাস্থ্যপরিচর্যার পাশাপাশি আদর, মনোযোগ ও উদ্দীপনা পায়, তখন শিশুদের শেখার গতি বেড়ে যায়। শিশু মনোবিদ ও শিশুর মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে পরিবারে, সমাজে শিশুর নিরাপদে বেড়ে ওঠার জন্য এবং শিশু মানবসম্পদে রূপান্তরিত ও সুষ্ঠু বিকাশের জন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন বড়দের ভালোবাসা, যত্ন আর স্নেহশীলতা। বাংলাদেশে শিশুদের মধ্যে মাত্র ১৩.৪ শতাংশ শিশু শৈশবের প্রারম্ভিক শিক্ষা পায় আর ৮৬.৬ শতাংশ শিশু বঞ্চিত হয়। শিশুরা বড়দের কাছ থেকে সবকিছু শেখে। জন্মের পর থেকেই শিশুরা দ্রুত শিখতে থাকে। শিশুরা দৃষ্টি, শ্রবণ, ঘ্রাণ, স্বাদ ও স্পর্শ এসব দিয়ে অনুভব করে তার আশপাশের জগত্, প্রকৃতি ও পরিবেশকে। এভাবেই ধীরে ধীরে জগত্ সংসার সম্পর্কেও জানতে ও বুঝতে পারে শিশুরা।

শিশুর প্রথম পাঁচ বছরকে প্রারম্ভিক শৈশবকাল বলা হয় এবং শৈশবের বিকাশকে বলা হয় শিশুর প্রারম্ভিক বিকাশ। প্রতিটি শিশুর ৯০ শতাংশ জ্ঞান ও উপলব্ধির পরিধি প্রথম তিন বছরে বৃদ্ধি পায়। কিন্তু আমাদের দেশে বিভিন্ন প্রতিকূলতার জন্য এই তিন বছরে ২০ শতাংশ শিশু বিভিন্ন অবহেলা ও অযত্নের শিকার হয়। যার ফলে এসব শিশু অঙ্গপ্রত্যঙ্গের সঠিক ব্যবহার এবং ভাষা, চিন্তা-চেতনায়, অনুভূতি, জ্ঞান, বুদ্ধি, মেধা ও ভাবের আদান-প্রদানের ক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়ে আর অযোগ্য ও অদক্ষ হয়ে ওঠে। শিশুরা শৈশবে যা শেখে এবং যেভাবে শেখে তার ওপরই গড়ে ওঠে শিশুর ভবিষ্যত্ বুদ্ধিমত্তা ব্যক্তিত্ব এবং বিভিন্ন নৈতিক আচরণ। প্রারম্ভিক কালে শিশুরা পরিচিত মুখ ও মুখের অভিব্যক্তি দেখে এবং বোঝে। আর পরিচিত জনের কণ্ঠস্বর শিশুকে উত্সাহিত করে।

শিশুদের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার তাদেরকে জেদি ও হিংস্র করে তুলতে পারে। আর শারীরিক নির্যাতন ও শাস্তি শিশু বিকাশের জন্য দারুণ ক্ষতিকর। শিশুর সঙ্গে কথা বলে, শব্দ ও ধ্বনির মাধ্যমে আনন্দ দিয়ে, দেশাত্মবোধক গান, নাতে রসুল, ছড়া ও কবিতা আবৃত্তির মধ্য দিয়ে তাদের লুক্কায়িত প্রতিভাগুলো আবিষ্কারের চেষ্টা করতে হবে। এজন্য ধৈর্য, সহমর্মিতা ও দক্ষতার মাধ্যমে খেলাধুলা আর আনন্দের সঙ্গে শিশুকে শিক্ষা দিতে হবে। এতে শিশুর বিকাশ সুন্দর সুষ্ঠু ও ভালোভাবে সম্পন্ন হবে। কথা বলতে শেখার বহু আগেই শিশুরা ভাষা বোঝার ক্ষমতা অর্জন করে। তবে শিশুদের জন্য কঠিন কাজ হচ্ছে কথা বলতে শেখা এবং ভাষা বোঝা। সাধারণত শিশুরা এক বছর বয়সে কথা বলা শুরু করে। চার বছর বয়সে সম্পূর্ণ বাক্য কিংবা একসঙ্গে একাধিক বাক্য বলতে শেখে। ছয় বছর বয়স হলে শিশুরা ভাষায় মোটামুটি দক্ষতা অর্জন করে। তাই শিশুদের জীবনে এই ছয়টি বছর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সময়। এ সময় তাদের ভাষার মৌলিক চারটি দক্ষতা শোনা-বলা-পড়া-লেখা এসব বিষয়ে আন্তরিকতা ও যত্ন সহকারে শেখানো ও অনুশীলন করা দরকার। আর কোনো অবস্থাতেই তাদের ওপর মাত্রাতিরিক্ত কিছু চাপিয়ে দেওয়া যাবে না। আর আমাদের দেশে প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থায় পরীক্ষার চাপ বেশি। বিশেষ করে, প্রাইভেট স্কুলগুলোতে এতে তাদের সুপ্ত প্রতিভা সহজে বিকাশ লাভ করে না। তাই প্রাথমিক শিক্ষা সংস্কারেও উদ্যোগ নিতে হবে। মা-বাবা ও পরিবারের অন্য সদস্যদের সহযোগিতা ও অনুরাগ এবং স্নেহশীলতা ছাড়া শিশুর সুষ্ঠু প্রারম্ভিক বিকাশ সম্ভব নয়। আসুন, আমরা বড়রা ‘সবার আগে শিশু’ ও ‘শিশুদের জন্য ত্যাগ করি’, তাহলেই শিশুদের ভুবন হবে সুন্দর আর হাজার হাজার শিশুর বিকাশ হবে শোভাময় ও সাবলীলভাবে।

n লেখক :শিক্ষার্থী, অর্থনীতি বিভাগ, চট্টগ্রাম কলেজ