বাংলাদেশের সমৃদ্ধ অর্থনীতিতে রেমিট্যান্সের গুরুত্ব অপরিসীম। রেমিট্যান্স-প্রবাহ সরাসরি দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নকে গতিশীল করছে, পাশাপাশি জনশক্তি রপ্তানির মাধ্যমে দেশের বিপুল বেকারত্ব লাঘব হচ্ছে। বর্তমানে বাংলাদেশ বিশ্বের ষষ্ঠ বৃহত্তম অভিবাসী প্রেরণকারী দেশ। সবচেয়ে বেশি প্রবাসী আয় অর্জনকারী ১০টি দেশের তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান নবম।
বিএমইটিএর হিসাব মতে, ১৯৭৬ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশি অভিবাসীরা বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে প্রায় ২৩২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার সমপরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা দেশে প্রেরণ করে। পোশাক খাতের পরে জনশক্তি রপ্তানি বাংলাদেশের জিডিপিতে অবদান রাখা দ্বিতীয় সর্বোচ্চ খাত। বাংলাদেশের মোট জনশক্তি রপ্তানির ৩২.১১ শতাংশই যায় সৌদি আরবে এবং দেশে মোট আহরিত রেমিট্যান্স-এর ২০ শতাংশের বেশি আসে সে দেশ থেকে।
২০১৭ সালে বাংলাদেশ থেকে রেকর্ডসংখ্যক ১০ লাখ ৮ হাজার ৫২৫ জন কর্মী বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হয়েছিল, তবে ২০১৮ সালে তা কমে দাঁড়ায় ৭ লাখ ৩৪ হাজার ১৮১ জন এবং ২০১৯ সালে রপ্তানি হয় ৭ লাখ ১৫৯ জন। বাংলাদেশ থেকে যেসংখ্যক কর্মী বিদেশে যায় তার ১৫ শতাংশ নারী। ২০২০ সালে বাংলাদেশ থেকে সাড়ে ৭ লাখ নতুন কর্মী পাঠানোর লক্ষ্য থাকলেও করোনা মহামারির কারণে মাত্র ২ লাখ ১৭ হাজার ৬৬৯ জন কর্মীই প্রেরণ করা সম্ভব হয়। ফলে ৫ লাখের বেশি লোক বৈদেশিক কর্মসংস্থানের সুযোগ হারায়। এর ওপর করোনা ভাইরাসের কারণে চাকরি হারিয়ে দেশে ফেরত এসেছেন প্রায় সাড়ে ৩ লাখ কর্মী।
নানা কারণে বিদেশে শ্রমবাজার দিনে দিনে সংকুচিত হচ্ছে, অদক্ষ জনশক্তির চাহিদা দ্রুত কমে আসছে, অনেক দেশ দক্ষ কর্মী ছাড়া নিচ্ছে না। বিশ্বের শীর্ষ ১০ গন্তব্য দেশগুলোর ৭৫ শতাংশ উচ্চ দক্ষ অভিবাসী। বাংলাদেশে ৫ কোটি তরুণের ১১ শতাংশ বেকার। তাছাড়া, টিআইবির তথ্য মতে, বাংলাদেশে বিদেশী দক্ষকর্মী কাজ করছে ০.১৬ মিলিয়ন এর অধিক এবং এরা বছরে প্রায় ৩.১ বিলিয়ন ইউএস ডলার আয় করে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যেসব পেশায় দক্ষ কর্মীর চাহিদা রয়েছে তার মধ্যে; আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স, কম্পিউটার সিস্টেম অ্যানালিস্ট, রোবটিক্স, জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং, বিগ ডাটা অ্যানালিস্ট, সিকিউরিটি এক্সপার্ট, কিউলিনারি সার্ভিস এবং নির্মাণশিল্প ইত্যাদি। তাছাড়া জাপান, কোরিয়াসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে নার্সিং, বয়স্ক সেবা, ওয়েল্ডিং, কেয়ার গিভিং, পাইপ ফিটিং, প্লাম্বার, কৃষি, হোটেল ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড ট্যুরিজম ইত্যাদি পেশার চাহিদা রয়েছে।
শিল্পবিপ্লবের যুগে প্রযুক্তিনির্ভর বিশ্বে দক্ষ জনশক্তির বিকল্প নেই। গত ২০ বছরে বিশ্বে প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশে বিগত ১০০ বছরকেও ছাড়িয়ে গেছে। পরবর্তী পাঁচ বছর এই পরিবর্তন গত ২০ বছরকেও ছাড়িয়ে যাবে। কিন্তু বাংলাদেশের শিক্ষা কারিকুলাম/কারিগরি শিক্ষা পদ্ধতি এখনো পুরোনো ধাঁচের তাত্ত্বিক বিষয়ের ওপর নির্ভরশীল। মধ্যপ্রাচ্যের ৭৫ শতাংশ নিয়োগকারীদের বাংলাদেশি শ্রমিকদের কারিগরি দক্ষতার ওপর আস্থানেই। তারা মনে করেন বাংলাদেশি কর্মীদের প্রযুক্তিগত দক্ষতার অভাব, সাংস্কৃতিক সচেতনতার অভাব, দুর্বল যোগাযোগ ও ভাষায় অদক্ষতা, আচরণগত সমস্যা, নির্মাণকাজের জন্য দুর্বল শারীরিক যোগ্যতা, আধুনিক যন্ত্রপাতি সম্পর্কে নেই তেমন ধারণা, পেশাদারি মনোভাবের অভাব, হোস্ট দেশগুলোর আইনি ব্যবস্থা সম্পর্কে নেই স্বচ্ছ ধারণা, স্বাস্থ্যবিধি এবং স্যানিটেশন সম্পর্কে অজ্ঞ অথবা অনুসরণে অনিহা। তাই বাংলাদেশি শ্রমিকরা ভালো কাজে অগ্রাধিকার পায়না, নিম্নমানের ও নিম্নআয়ের কাজ করে। এছাড়া সৌদি আরব সরকার ‘সৌদিকরণ কর্মসূচি’ (প্রতি কারখানায় ২০ শতাংশ সৌদি নাগরিক থাকা বাধ্যতামূলক) শুরু করেছে, এর মাধ্যমে প্রবাসীদের জন্য ১২ ধরনের চাকরি বন্ধ ঘোষণা করেছে।
আবার সৌদি আরবের ভিশন-২০৩০ অনুযায়ী পুরো সৌদি শ্রমবাজারে ৭০ শতাংশ সৌদি নাগরিককে নিয়ে আসার পরিকল্পনার কারণে দেশটিতে ভবিষ্যত্ শ্রমবাজারও সঙ্কুচিত হতে যাচ্ছে। মালয়েশিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ইরাক ও লিবিয়ায় জনশক্তি রপ্তানি দীর্ঘদিন যাবত্ প্রায় বন্ধ। কুয়েতে মানব পাচারসংক্রান্ত সাম্প্রতিক ঘটনায় বাংলাদেশি শ্রমিক প্রেরণের বিষয়টি পড়েছে হুমকিতে। কাতারে প্রতারক চক্রের কারণে দেশের সুনাম ক্ষুণ্ন হচ্ছে। নানামুখী সংকটের মধ্যে লেবাননের শ্রমবাজার। অনেক ক্ষেত্রেই বাংলাদেশি অভিবাসীরা প্রতারিত হয়, প্রতারিতের বেশির ভাগই দালালনির্ভর হওয়ায় অধিকাংশ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট এজেন্সিগুলোর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা সম্ভব হয় না।
চলমান করোনা মহামারিতে জনশক্তি রপ্তানি উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পেলেও দেশে রেমিট্যান্স-প্রবাহ সচল রয়েছে। ২০২০ সালে প্রায় ৯.৫ মিলিয়ন বাংলাদেশি অভিবাসী ১৬৮টি দেশ থেকে ২১ হাজার ৭৫২ মিলিয়ন মার্কিন ডলার সমপরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা দেশে প্রেরণ করে, যা পূর্ববর্তী বছরের চেয়ে ৩ হাজার ৩৯৭ মিলিয়ন ডলার বেশি। করোনার প্রভাবে এই সময় পারিবারিক প্রয়োজনে প্রবাসীরা বেশি পরিমাণে অর্থ পাঠিয়েছে, সরকারঘোষিত ২ শতাংশ নগদ প্রণোদনা তাদের বৈধ পথে রেমিট্যান্স পাঠাতে উত্সাহিত করেছে এবং আমদানি ব্যয় কমে যাওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই রিজার্ভ বেড়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব মতে, ডিসেম্বর ২০২০ পর্যন্ত দেশে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ প্রায় ৪৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার সমপরিমাণ, যা দিয়ে আট মাসের বেশি আমদানি ব্যয় মেটানো সম্ভব। তাই আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে বাংলাদেশ রয়েছে ভালো অবস্থানে। তবে করোনা মহামারির কারণে বিশ্ব জুড়েই অভিবাসন খাতে অচলাবস্থা সৃষ্টি হওয়ায় এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব সামনে অপেক্ষা করছে। তাছাড়া শ্রমবাজারে চাহিদাভিত্তিক দক্ষ জনশক্তির অভাবে বাজার সংকুচিত হচ্ছে। বিষয়টি অনুধাবন করে সরকারও শ্রমবাজার ধরে রাখতে এবং নতুন নতুন শ্রমবাজারে প্রবেশের জন্য দক্ষকর্মী তৈরিতে গুরুত্ব দিয়ে বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছেন, চাহিদাভিত্তিক দক্ষতা অর্জনে কারিগরি প্রশিক্ষণের ট্রেড সংখ্যা ও সময়কাল বৃদ্ধি করেছেন, বিভিন্ন বিদেশি ভাষা শিক্ষা কোর্স চালু করেছেন, কারিকুলামে পরিবর্তন এনেছেন, সংখ্যার চেয়ে গুণগত অভিবাসনের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন। তাই ২০২০ সালের আন্তর্জাতিক অভিবাসন দিবসে বাংলাদেশের স্লোগান ছিল ‘মুজিব বর্ষের আহ্বান, দক্ষ হয়ে বিদেশ যান’। তবে প্রত্যেক কর্মীর কারিগরি দক্ষতা অর্জনের পাশাপাশি ব্যক্তি সচেতনতাও বহু সংস্কৃতির পরিবেশে কাজ করার সক্ষমতা অর্জন করতে হবে, নিরাপদ অভিবাসনের জন্য সরকার নির্ধারিত করণীয়সমূহ অনুসরণ করতে হবে। বিদেশি নিয়োগকারীদের আস্থা অর্জনেতাদের পর্যবেক্ষণের ওপর কার্যকরি পদক্ষেপ নিতে হবে।
শুধু দক্ষতা অর্জনই নয়, নতুন নতুন শ্রমবাজার সৃষ্টির লক্ষ্যে বাংলাদেশ দূতাবাসসমূহের শ্রম উইংগুলোকে হারানো/ক্ষতিগ্রস্ত বাজার পুনরুদ্ধারে এবং উদীয়মান নতুন ও বিকল্প শ্রমবাজার নিশ্চিত করতে আরো উদ্যোগী হতে হবে। প্রতারণার পথ বন্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ, দালাল নির্ভরতা কমিয়ে প্রকৃত রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে কর্মী প্রেরণ এবং ইমেজ সংকট কাটিয়ে ওঠার কার্যকরি প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে। দক্ষ অভিবাসন শুধু লাভজনক বিনিয়োগই নয়, দেশের সুনাম, দেশে দেশে সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্যের শক্ত সেতুবন্ধনও।
*লেখক: উপ-মহাপরিচালক (বিডি-৭), সেনাকল্যাণ সংস্থা (সেনাকল্যাণ ওভারসিজ এমপ্লয়মেন্ট সার্ভিসেস লিমিটেড)।
ইত্তেফাক/বিএএফ
