দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সাধারণ নিরীহ লোকদের ফ্রি ভিসা বা কোনো ধরনের শ্রম চুক্তিপত্র ছাড়াই ভালো চাকরি, বিয়ের সুযোগসহ নানান সুবিধার প্রলোভন দেখিয়ে, বিশেষ করে মালয়েশিয়ায় ট্রলারে করে সমুদ্রপথে এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ যেমন—সৌদি আরব, লেবানন, বাহরাইন প্রভৃতি দেশে পাঠানো হয়। এ প্রসঙ্গে টেকনাফে বর্তমানে আউটসোর্সিংয়ে চাকরিরত একজন চালক ভুক্তভোগীর করুণ বক্তব্য শেয়ার করলাম। তা হলো, টেকনাফ উপজেলার সাবরাংয়ের খুরেরমুখ থেকে চাকরির আশায় বেশ কয়েকটি ট্রলার পরিবর্তনের মাধ্যমে দীর্ঘ প্রায় তিন মাস উন্মুক্ত আকাশের নিচে রোদ-বৃষ্টি সয়ে খুব সামান্য জায়গায় হাঁটু গেড়ে বসে গিয়েছিলাম। পা টেনে বসার সুযোগ পর্যন্ত ছিল না এবং মাঝে মাঝে পা-জোড়া অবশ হয়ে যেত। চোখের সামনে মা-বোনের ওপর অনেক নির্যাতন দেখেছি। আমাকে জিম্মি করে পরিবার থেকে টাকা আদায় করা হয়েছিল। তিন মাসে প্রতিদিন একবেলা রুটি আর সামান্য সিদ্ধ আলু ছাড়া কিছু খেতে দেয়নি। প্রথমে যখন মালয়েশিয়ায় গিয়ে ভাত পেলাম, তখন খুব ক্ষুধায় খেতে খেতে আমি বেহুঁশ হয়ে পড়ে যাই এবং আমাকে মৃত ভেবে ডাস্টবিনে ফেলে দেওয়া হয়েছিল। কেউ যাতে আমার মতো ভুল করে এ পথে পা না বাড়ায়।
তবে যতই সচেতনতামূলক প্রচারণা হোক না কেন, জীবিকার মানোন্নয়ন ছাড়া মানব পাচার প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। এ লক্ষ্যে সরকার নানামুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের মাধ্যমে বিভিন্ন ট্রেডে যেমন—মত্স্য চাষ, গবাদি পশু ও হাঁস-মুরগি পালন, গবাদি পশু হূষ্টপুষ্টকরণ, ভ্রাম্যমাণ কম্পিউটার প্রশিক্ষণের পাশাপাশি ক্ষুদ্র ঋণ প্রদান করছে। উপবৃত্তি প্রকল্পের আওতায় দরিদ্র জনগোষ্ঠীর শিক্ষা অর্জনে সহায়তা করছে। সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় বয়স্ক ভাতা, বিধবা বা স্বামী নিগৃহীত ভাতা এবং অসচ্ছল শনাক্তকৃত প্রতিবন্ধী ভাতাসহ অন্যান্য ভাতা দেওয়া হচ্ছে। ভিজিডির আওতায় দুস্থ, অসহায় ও হতদরিদ্র, স্বামী পরিত্যক্তা ও বিধবা নারীদের প্রতি মাসে পুষ্টিসমৃদ্ধ চাল বিতরণ ছাড়াও আয়বর্ধনমূলক প্রশিক্ষণসহ ভাতা প্রদান করা হয়। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর অগ্রাধিকার প্রকল্প ‘আমার বাড়ি আমার খামার’-এর সমিতির মাধ্যমে স্বাবলম্বী করে তোলার লক্ষ্যে সাধারণ ঋণ দেওয়া হচ্ছে, যাতে সমাজের কেউ পিছিয়ে না পড়ে। তাছাড়া, ইকোনমিক জোন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে হাজার হাজার লোকের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে, যেগুলো সার্বিকভাবে নিঃসন্দেহে মানব পাচার থেকে রক্ষা পেতে অবদান রাখছে।
তবে মানব পাচার প্রতিরোধে ও দমনে জেলা কর্মসংস্থান ও জনশক্তি অফিস আরো শক্তিশালী করা জরুরি। সকল পর্যায়ের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জনবল বৃদ্ধিসহ, যানবাহনের সংখ্যা এবং বিশেষ করে কোস্টগার্ডের টহল বোটের সংখ্যা বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। তদুপরি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের মানব পাচারবিষয়ক কর্মশালার মাধ্যমে প্রশিক্ষিত করা গেলে মূল্যবান ভূমিকা পালন করবে। যেসব পথে বা পয়েন্ট দিয়ে সাগরপথে মানব পাচার হওয়ার আশঙ্কা থাকে, সেসব জায়গা আলোকিত করে সিসিটিভির আওতায় আনা যেতে পারে। মানব পাচারবিষয়ক নিয়মিত সভা এবং এতে সংশ্লিষ্ট সবার আরো কার্যকর অংশগ্রহণ দরকার। মানব পাচার চক্রান্তে জড়িতদের ট্রাইব্যুনালের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ট্রাইব্যুনালের জনবলও বাড়ানো প্রয়োজন।
জাতীয়ভাবে বিভিন্ন দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থাসমূহের সঙ্গে যোগাযোগ, চুক্তি সম্পাদন ও সমন্বয়ের মাধ্যমে উপযোগী নতুন শ্রমবাজার অনুসন্ধান করা সময়ের দাবি। এ ক্ষেত্রে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর অবস্থান আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে ভূমিকা পালন করতে পারে। তাছাড়া অভিবাসন ব্যবস্থাপনায় বিনিয়োগ বৃদ্ধিসহ ৫০টিরও বেশি দেশে শ্রমকল্যাণ উইং (যা বর্তমানে ৩০টি মাত্র) চালু করা গেলে প্রবাসে সরকারি সেবার মান বাড়ার পাশাপাশি মানব পাচার হ্রাস ও রেমিট্যান্স অনেকাংশে বৃদ্ধি পাবে।
উল্লেখ্য, প্রতি বছর বাংলাদেশ ১৪ থেকে ১৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স পাচ্ছে, যা দেশের ভাবমূর্তি ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে। এ প্রসঙ্গে নির্বাচনি ইশতেহারে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর অঙ্গীকার প্রতি বছর প্রতি উপজেলা থেকে ১ হাজার দক্ষ নাগরিক বৈধভাবে অভিবাসন। জনসংখ্যার চাপ কমাতে এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নে এটি একটি সুদূরপ্রসারী দৃষ্টিভঙ্গি বটে এবং তা বাস্তবায়নে উপজেলা পর্যায়ে আগ্রহীদের ডাটাবেস করে বিশ্ব চাহিদা মোতাবেক সরকারি-বেসরকারি সংস্থার সহযোগিতায় প্রশিক্ষণ দিয়ে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির মাধ্যমে বৈধভাবে বিদেশ গমনের লক্ষ্যে প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। এভাবেই আমরা দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন নিশ্চিতপূর্বক মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমনে কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারি।
n লেখক :উপজেলা নির্বাহী অফিসার,
টেকনাফ, কক্সবাজার
