বিশ্ব এখন আগাইয়াছে চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের পথে। এই বিপ্লবের মূলে আছে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি। মানুষের জীবনযাত্রার প্রতিটি ক্ষেত্রে লাগিয়াছে প্রযুক্তির ছোঁয়া। সেই দিক হইতে বাংলাদেশও পিছাইয়া নাই। বরং দেশ প্রযুক্তির দিক দিয়া দ্রুত গতিতে আগাইয়াছে, ইহা অস্বীকারের কোনো উপায় নাই। কম্পিউটার প্রযুক্তি, মোবাইল অপারেশন, ভার্চুয়াল অ্যাকটিভিটিজ সাধারণ মানুষের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছাইয়া গিয়াছে। ইহার পিছনে সরকারের গুরুত্ব প্রদান এবং সাধারণ মানুষের আগ্রহ দুই-ই কাজ করিয়াছে। যাহার ফলে সরকারি অফিস-আদালত, প্রাইভেট কোম্পানি, ব্যাবসায়িক প্রতিষ্ঠান হইতে শুরু করিয়া সেবামূলক ছোট-বড় প্রতিষ্ঠান—সর্বত্র ব্যবহার হইতেছে প্রযুক্তির সহায়তা। ফলে সরকারের প্রতিটি দপ্তর প্রযুক্তিকে সরকারি কার্যাবলিতে যুক্ত করিয়াছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারি হইতে শুরু করিয়া সেবামূলক কর্মকাণ্ডে লওয়া হইতেছে প্রযুক্তির সহযোগিতা, শিক্ষা বিস্তারে ও কার্যক্রমে এখন নির্ভর করিতে হইতেছে প্রযুক্তির উপর। এমনকি বিভিন্ন পেশাভিত্তিক কমিউনিটি তাহাদের কর্মকাণ্ড পরিচালনায় ব্যাপকভাবে ব্যবহার করিতেছে প্রযুক্তি এবং সরকারও তাহাদের সঙ্গে যুক্ত হইতেছে প্রযুক্তির মাধ্যমে। বিশেষ করিয়া করোনাকালে আমরা প্রযুক্তির অভাবনীয় ব্যবহার দেখিতে পাইতেছি। টেলি মেডিসিন, অনলাইন প্রশিক্ষণ, বাণিজ্যিক সভা-সম্মেলন, সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্যে মিটিং—সবকিছুই চালাইয়া যাওয়া সম্ভব হইয়াছে প্রযুক্তির সুবাদে।
কিন্তু এই প্রযুক্তির সঙ্গে সঙ্গে মানুষেরও যে মানসিকতায় সমান্তরাল পায়ে আগাইয়া যাওয়া প্রয়োজন সেই জায়গাটায় আমরা খানিকটা পিছাইয়া পড়িয়াছি। তাহা কীরকম উদাহরণ দিলেই বুঝা যাইবে। সরকারের প্রতিটি মন্ত্রণালয়ে জন্য অপরিহার্যভাবে ওয়েবসাইট তৈরি করা হইয়াছে। কিন্তু আমরা লক্ষ করিলেই দেখিতে পাই, অনেক মন্ত্রণালয় এবং অধিদপ্তর পরিদপ্তরের ওয়েব পেইজ হালনাগাদ করা নাই। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ২০১৪-১৫ সালের পর আর একটি তথ্য দিয়াও হালনাগাদ করা হয় নাই অথচ প্রযুক্তির প্রথম শর্তই হইল হালনাগাদ থাকা। প্রশ্ন হইল, যদি হালনাগাদই করা না হয়, তাহা হইলে পুরাতন আমলের খাতাপত্র, তাকের উপর পাঁজা করিয়া রাখা ফাইলের সঙ্গে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের পার্থক্য কী? তাহার মানে মাথা ও মানসিকতা আটকাইয়া আছে পুরাতন ফাইল আমলের চিন্তায়! আমরা জানি, সরকারি বিভাগগুলিতে আইটি শাখার জন্য পদ সৃষ্টি করা হইয়াছে, যাহারা রাজস্ব খাত হইতে বেতন-ভাতা গ্রহণ করিয়া থাকেন। সরকারি কর্মচারীদিগকে নির্দেশনা দেওয়া হইয়াছে অফিশিয়াল ইমেইল ব্যবহার করিতে। অভিযোগ রহিয়াছে, সরকারিভাবে প্রদত্ত ইমেইলগুলি ব্যবহারেও ব্যাপক অনীহা রহিয়াছে। এই অনীহার পিছনে কি শুধুই অবহেলা তাহা কিন্তু একটি প্রশ্ন। সেই সঙ্গে প্রযুক্তির অপব্যবহার তথা প্রযুক্তিকে দুর্নীতি ও অনিয়মের সহায়ক হিসাবেও ক্ষেত্রবিশেষ ব্যবহার করা হইতেছে। কোনো কোনো ইলেকট্রনিক ফান্ড ট্রান্সফারের ক্ষেত্রে প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগ লইয়া দুর্নীতির ঘটনা ঘটিতেছে। প্রযুক্তি সচেতন নহে, এমন নাগরিকদের সঙ্গে প্রতারণার ঘটনা ঘটিতেছে। ইহা অবশ্যই অনাকাঙ্ক্ষিত। প্রযুক্তির অপব্যবহারকারীদের শাস্তির আওতায় আনা গেলে আরো অনেক আস্থাশীল হইয়া উঠিবে প্রযুক্তির সুবিধাভোগীরা।
তাহার পরও আমরা মনে করি, সামনের দিনগুলিতে প্রযুক্তি ব্যবহারও স্বচ্ছ হইয়া উঠিবে। যে কোনো কিছু সঠিকভাবে চলনে সময় দিতে হয়। দেশ স্বাধীন হইবার ক্ষণে আমরা প্রায় কপর্দকহীন ছিলাম। বিগত ৫০ বত্সরে যাহা অর্জিত হইয়াছে তাহা একেবারে মন্থর গতি বলা যাইবে না। কেবল প্রযুক্তি নহে, রাস্তাঘাট, অবকাঠামো উন্নয়ন সর্বত্রই আমরা পরিবর্তন দেখিতেছি। যেই স্থানে কেবলই জলা বা পতিত জমি ছিল সেই খানে উঠিতেছে সুউচ্চ ভবন, যেই খানে একটি পায়ে হাঁটার পথ ছিল না, সেইখানে হইতেছে চওড়া সড়ক। নিশ্চয়ই আরো হইবে। আর সেই হওয়ার জন্য রাষ্ট্রযন্ত্রকে কেবল নিষ্ঠাবান থাকিতে হইবে।
