বিচ্ছিন্ন সংঘর্ষ, সহিংসতা, গুলি ও পালটাপালটি ধাওয়ার মধ্য দিয়ে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছে। এসব ঘটনায় এক জন নিহত এবং প্রায় অর্ধশত ব্যক্তি আহত হয়েছে। পুলিশ বিএনপির একজন কাউন্সিলর প্রার্থী এবং আওয়ামী লীগের সমর্থক এক বিদ্রোহী প্রার্থীসহ বেশ কয়েক জনকে আটক করেছে। গতকাল বুধবার করপোরেশনের নতুন মেয়র এবং মহানগরীর ৪০ ওয়ার্ডে কাউন্সিলর ও ১৪টি সংরক্ষিত মহিলা কাউন্সিলর নির্বাচনের জন্য ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। নগরীর আলকরণ এলাকায় একজন প্রার্থীর মৃত্যুজনিত কারণে ঐ ওয়ার্ডের কাউন্সিলর পদে নির্বাচন ২৮ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হবে।
নির্বাচনে অধিকাংশ সহিংসতার ঘটনা ঘটে আওয়ামী লীগ-সমর্থিত কাউন্সিলর পদপ্রার্থী ও বিদ্রোহী প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে। তবে কয়েকটি এলাকায় আওয়ামী লীগ ও বিএনপির সমর্থক কাউন্সিলর এবং পুলিশের মধ্যে ত্রিমুখী সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। সকাল সাড়ে ৯টা নাগাদ নগরীর ১৩ নম্বর পাহাড়তলী ওয়ার্ডে আওয়ামী লীগ-সমর্থিত কাউন্সিলর পদপ্রার্থী ওয়াসিম উদ্দিন এবং একই দলীয় বিদ্রোহী প্রার্থী মাহমুদুর রহমানের সমর্থকদের মধ্যে গুলিবিনিময়ের ঘটনায় আলাউদ্দিন (২৫) নামে এক রাজমিস্ত্রি গুলিবিদ্ধ হয়ে পরে হাসপাতালে মারা যান। ঐ আসনে বিএনপি-সমর্থিত ওয়ার্ড কাউন্সিলর পদপ্রার্থী জাহাঙ্গীর আলম দুলাল ঝাউতলা কেন্দ্রে প্রতিপক্ষ প্রার্থীর সমর্থকদের হাতে সকালে লাঞ্ছিত হন। চট্টগ্রাম মহানগরীর সবচেয়ে সংঘাতপূর্ণ লালখান বাজার ওয়ার্ড এলাকায় একপ্রকার সারা দিন পালটাপালটি ধাওয়া, সংঘর্ষ, ভাঙচুর চলতে দেখা যায়। পুলিশ, বিজিবি ও র্যাব সদস্যদের এলাকায় ব্যাপক টহল দিতে দেখা গেলেও থেমে থেমে সংঘর্ষ হয়েছে। এ সময় পুরো এলাকার দোকানপাট, বাসাবাড়ির দরজা-জানালা বন্ধ হয়ে যায়। এলাকায় সকাল থেকে নির্বাচন অবধি আতঙ্ক বিরাজ করে।
ভোটের চিত্র :চসিক নির্বাচনে বেশ কয়েকটি কেন্দ্রে ভোটারের উপস্থিতি ছিল বেশ কম। গতকাল বুধবার এসব কেন্দ্র পরিদর্শনের সময় নির্বাচনের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের অলস বসে থাকতে দেখা যায়। দুপুর পর্যন্ত ভোট প্রদানের হার ছিল খুবই কম। দুপুর দেড়টায় নাসিরাবাদ এলাকায় এ জলিল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে মাত্র ৮ শতাংশ ভোট পড়েছে বলে প্রিসাইডিং অফিসার জানান। বাংলাদেশ শিশু একাডেমি কেন্দ্রে প্রথম তিন ঘণ্টায় ৩ হাজার ২৮০ জন ভোটারের মধ্যে মাত্র ১৭০ জন ভোট দেন। মহিলা কেন্দ্রে প্রথম তিন ঘণ্টায় ২ হাজার ৮৯৫ জন ভোটারের মধ্যে ভোট পড়ে ১০০টিরও কম।
ভোট দিতে গিয়ে বিভিন্ন কেন্দ্রের সামনে বিরূপ অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয়েছেন ভোটাররা। কেন্দ্রের সামনে যাওয়ামাত্রই বিভিন্ন প্রার্থীর পক্ষের লোকজন ভোটারকে ঘিরে ধরে নানা ধরনের জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করেন। ভোটারের উত্তর সন্তোষজনক মনে হওয়ার পর ভোটারকে ভোটকেন্দ্রের ভেতরে যাওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়। এরপর কেন্দ্রে প্রবেশ করার পর শুরু হয় পোলিং এজেন্টদের আরেক দফা নজরদারি। ইভিএম মেশিন ব্যবহারের নিয়ম শেখানোর অজুহাতে প্রার্থীর এজেন্টই ভোটারের ভোট দিয়ে দিয়েছেন বলে অনেক ভোটারের কাছ থেকে অভিযোগ পাওয়া গেছে। প্রতিবাদ করতে গিয়ে প্রার্থীর এজেন্টদের কাছে ধমক খেয়েছেন বলেও অনেক ভোটার অভিযোগ করেছেন।
গতকাল সরেজমিনে বিভিন্ন কেন্দ্র পরিদর্শন করে দেখা যায়, অনেক কেন্দ্রেই আওয়ামী লীগ ছাড়া আর দলের কোনো প্রার্থী নেই। অনেক কেন্দ্রে বিএনপির এজেন্টদের বাইরে ঘোরাঘুরি করতে দেখা যায়। এ সময় বিএনপির এজেন্টদের জোর করে কেন্দ্র থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেন। বিভিন্ন কেন্দ্র পরিদর্শন করতে গিয়ে সাংবাদিকদেরও নানা বিড়ম্বনায় পড়তে হয়েছে। পুলিশ লাইনস কেন্দ্রে গেটের সামনে গিয়ে সাংবাদিকদের লাইনে দাঁড়াতে হয়। এরপর দুই জন করে ভেতরে প্রবেশের সুযোগ পান।
প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী-সমর্থকদের মিশ্র প্রতিক্রিয়া :নগরীর ৪ নম্বর চান্দগাঁও ৫ নম্বর মোহরা ওয়ার্ডের ভোট কেন্দ্রগুলোতে শান্তিপূর্ণভাবে ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়েছে। নগরীর গুরুত্বপূর্ণ এই দুই ওয়ার্ডের ভোট কেন্দ্রগুলো পরিদর্শনকালে দুপুরের দিকে ভোটারদের সমাগম বাড়তে দেখা গেছে। নিরাপত্তা বাহিনীর কড়া পাহারায় ভোট কেন্দ্রগুলো থেকে নির্দিষ্ট দূরত্বে বিভিন্ন প্রার্থীর ভোটারদের জটলা লক্ষ্য করা গেছে। ভোট কেন্দ্রগুলোর প্রিজাইডিং অফিসার ও পোলিং অফিসাররা জানান, ইভিএম মেশিনে দ্রুত ভোটগ্রহণ সম্পন্ন হওয়ায় ভোট গ্রহণের ক্ষেত্রে অস্বাভাবিক জটলা হয়নি।
আওয়ামী লীগ মনোনীত মেয়র প্রার্থী মো. রেজাউল করিম চৌধুরীর নৌকা প্রতীকের সমর্থকরা এবং আওয়ামী লীগ মনোনীত কাউন্সিলর প্রার্থীদের সমর্থক-কর্মীরা ভোটগ্রহণ শান্তিপূর্ণভাবে অনুষ্ঠিত হচ্ছে বলে জানান।
কেন্দ্রের বাইরে কিশোর গ্যাং :চসিক নির্বাচনে নগরীর বিভিন্ন কেন্দ্রে সংঘর্ষের ঘটনায় অর্ধশতাধিক লোক আহত হয়েছে। তার মধ্যে আহত হয়ে চমেক হাসপাতালে ৩৪ জন ভর্তি হয়েছে। এদের মধ্যে ৪ জনের আঘাত গুরুতর। চমেক হাসপাতালের পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ জহিরুল ইসলাম জানান, আহতদের মধ্যে ৭/৮ জন প্রাথমিক চিকিত্সা নিয়ে চলে গেছেন। নগরীর আকবরশাহ, খুলশী, চাঁন্দগাঁও, পাথরঘাটা ও পাহাড়তলী এলাকা থেকে আহতদের আনা হয়েছে। খুলশী ও লালখান বাজার এলাকা থেকে বেশি আহত লোক এসেছে।
নগরীর ভোট কেন্দ্রগুলোতে কিশোর গ্যাংয়ের তত্পরতা বেশি ছিল। কেন্দ্রের বাইরে তাদের জটলা করতে দেখা গেছে। এতে সাধারণ ভোটারদের মধ্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। কাউন্সিলর প্রার্থীদের কিশোর গ্যাংদের নির্বাচনি কাজে ব্যবহার করতে দেখা গেছে। যেসব কেন্দ্রে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে সেখানে কিশোর গ্যাং সংঘর্ষে লিপ্ত ছিল। সংঘর্ষে তারা ইট পাটকেল, লাঠিসোটা, লোহার রড ব্যবহার করেছে।
পুলিশ ৫ শতাধিক কেন্দ্র দখল করেছে :আমীর খসরু :বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, এই নির্বাচন বিএনপি ও আওয়ামী লীগের মধ্যে হয়নি। বিএনপি নির্বাচন করেছে আওয়ামী প্রশাসন, পুলিশ ও সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে। পুলিশ, প্রশাসন ও সন্ত্রাসীরা আওয়ামী লীগের নির্বাচনি প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে। বিএনপির এজেন্টদের বের করে দিয়ে ৫ শতাধিক কেন্দ্র দখল করা হয়েছে, যার মূল দায়িত্ব পালন করেছে পুলিশ। সন্ত্রাসীদের হামলায় বিএনপির কাউন্সিলর প্রার্থীসহ দুই শতাধিক নেতাকর্মী আহত হয়েছে।
নির্বাচনে ইভিএম (ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন) এর অপব্যবহার হয়েছে দাবি করে আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, নির্বাচনের আগের দিন মক ভোটিংয়ের নামে নৌকা মার্কায় সব ভোট নেওয়া হয়েছে। প্রশাসনের সহযোগিতায় গতরাতেই কয়েকটি কেন্দ্রে নৌকার পক্ষে ভোট নেওয়া হয়েছে। এসব কেন্দ্রে দিনের বেলায় ভোটারদের যেতে বাধা দেওয়া হয়েছে। অনেক ইভিএম মেশিনে ধানের শীষ প্রতীক ছিল না। কয়েকটি জায়গায় ইভিএম মেশিনে ধানের শীষে চাপ দিলে আম প্রতীক এসেছে। নির্বাচন কমিশন সরকারের তাঁবেদারে পরিণত হয়েছে মন্তব্য করে তিনি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে জাতীয় নির্বাচন দাবি করেন। গতকাল বুধবার চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ভোটগ্রহণ শেষে দলীয় কার্যালয় নাসিমন ভবনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব অভিযোগ করেন আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
সংবাদ সম্মেলনে বিএনপিসমর্থিত মেয়র প্রার্থী ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, এই নির্বাচন আওয়ামী লীগের সঙ্গে হয়নি, রাষ্ট্র ও প্রশাসন যন্ত্রের সঙ্গে হয়েছে। সাধারণ ভোটাররা প্রশাসনের কাছে অসহায় ছিল। প্রত্যেকটা কেন্দ্রের বাইরে হাজার হাজার বহিরাগত ছিল। তারাই ভোট দিয়েছে। প্রকৃত ভোটাররা ভোট দিতে পারেনি।
৪ মেয়র প্রার্থীর অভিযোগ, এক জনের বর্জন :আওয়ামী লীগ ও বিএনপির প্রার্থী ছাড়া চসিক নির্বাচনে আরো পাঁচ জন মেয়র প্রার্থী ছিলেন। তাদের মধ্যে এক জন স্বতন্ত্র প্রার্থী নির্বাচনের দুই দিন আগে নৌকা প্রতীককে সমর্থন জানিয়ে প্রার্থিতা থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন। বাংলাদেশ ইসলামিক ফ্রন্টের মেয়র প্রার্থী ছিলেন এম এ মতিন। তার মার্কা ছিল মোমবাতি। নির্বাচনের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে তিনি ইত্তেফাককে বলেন, ‘নির্বাচনে ইভিএম পদ্ধতি ছিল ত্রুটিপূর্ণ। ক্ষমতাসীন দলের কাউন্সিলর প্রার্থীদের মধ্যে মারমুখী আচরণের কারণে কেন্দ্রের মধ্যে ভীতির সঞ্চার করেছে। নির্বাচন কমিশন ভোটারদের সঙ্গে নির্বাচনের নামে প্রতারণা করেছেন।’
সহিংসতায় এক জনের মৃত্যু :চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনে দুই কাউন্সিলর প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষে আলাউদ্দিন ওরফে আলম মিয়া নামে এক নির্মাণশ্রমিক গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা গেছেন। গতকাল বুধবার সকালে সাড়ে ৯টায় ১৩ নম্বর পাহাড়তলি ওয়ার্ডের আমবাগান এলাকায় ইউসেপ টেকনিক্যাল স্কুল কেন্দ্রের সামনে গোলাগুলির ঘটনা ঘটে। ঘটনার পর বিক্ষুব্ধ লোকজন ঝাউতলা এলাকায় রেললাইন অবরোধ করেন। এ সময় ইউসেপ স্কুল কেন্দ্রের বাইরে একটি মোটরসাইকেলে অগ্নিসংযোগ করা হয়। স্থানীয়রা জানান, নিহত আলম কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না। ঘটনার সময় তিনি বাসা থেকে নাশতা খাওয়ার জন্য বের হয়েছিলেন। এ সময় দুই গ্রুপের মধ্যে গোলাগুলি শুরু হলে তিনি গুলিবিদ্ধ হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। চমেক হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিত্সক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। পাহাড়তলি থানার পরিদর্শক (তদন্ত) রাশেদুল হক বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। আলম কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে জড়িত ছিলেন না বলে এলাকাবাসী জানালেও তাকে নিজের সমর্থক বলে দাবি করেছেন কাউন্সিলর প্রার্থী মাহমুদুর রহমান। এই ঘটনার পরও ইউসেপ স্কুল কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ বন্ধ হয়নি।
