প্রতীক্ষার টিকাদান শুরু

আপডেট : ২৭ জানুয়ারি ২০২১, ২৩:০৮

কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের সিনিয়র স্টাফ নার্স রুনু ভেরোনিকা কস্তাকে করোনা ভাইরাসের টিকা দেওয়ার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে বহু প্রতীক্ষিত টিকাদান কার্যক্রম শুরু হয়েছে। টিকা নিয়ে তিনি বলেন, ‘জয় বাংলা।’ গতকাল বুধবার বিকালে গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সে যুক্ত হয়ে কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে টিকাদান কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বিশ্বের অনেক দেশ যেখানে এখনো করোনা ভাইরাসের টিকা দেওয়া শুরু করতে পারেনি, সেখানে ‘সীমিত শক্তির’ বাংলাদেশে এই কার্যক্রম শুরু করাকে ‘ঐতিহাসিক’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন প্রধানমন্ত্রী। প্রধানমন্ত্রীর উদ্বোধনের সঙ্গে সঙ্গে সুরক্ষা অ্যাপের মাধ্যমে করোনা ভাইরাসের ভ্যাকসিনের জন্য নিবন্ধন কার্যক্রম চালু হয়ে গেছে।

মহামারিতে মৃত্যু, শোক আর সংকটের একটি বছর পেরিয়ে এসে টিকা দেওয়ার মধ্য দিয়েই করোনা ভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে বাংলাদেশ ঘুরে দাঁড়াতে পারবে বলে সরকার আশা করছে। রুনু ছাড়াও প্রথম টিকা পাওয়া বাকি চার জন হলেন—এ হাসপাতালের মেডিসিন কনসালট্যান্ট ডা. আহমেদ লুত্ফুল মোবেন, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. নাসিমা সুলতানা, ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) ট্রাফিক মতিঝিল বিভাগের কর্মকর্তা দিদারুল ইসলাম এবং বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এম ইমরান হামিদ। আর ভ্যাকসিন নিয়ে তারা বাকিদের উদ্দীপ্ত করেছেন ইতিহাসের গৌরবময় স্লোগান ‘জয় বাংলা’ বলে। অনুষ্ঠানে কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে প্রথম পাঁচ জনকে টিকা দেওয়া প্রত্যক্ষ করেন প্রধানমন্ত্রী। টিকা নিতে ভয় পাচ্ছেন কি না, সে বিষয়ে তাদের কাছে জানতে চান প্রধানমন্ত্রী। তাদের সাহস জোগান, সশরীরে অনুষ্ঠানে থাকতে না পারায় দুঃখ প্রকাশ করেন তিনি। প্রথম টিকা গ্রহণের সময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রুনু ভেরোনিকা কস্তাকে জিজ্ঞাসা করেন, ‘তোমার ভয় লাগছে না তো?’ জবাবে রুনু বলেন, ‘না।’ এরপর প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘খুব সাহসী তুমি। তুমি সুস্থ থাকো, ভালো থাকো। আরো অনেক রোগীর সেবা করো। সেই দোয়া করি।’ প্রথম দফায় টিকা নেওয়া পাঁচ জনের সঙ্গেই কুশল বিনিময় করেন প্রধানমন্ত্রী। সবাইকে অভিনন্দন জানান তিনি।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমি মহান রাব্বুল আলামিনের কাছে শুকরিয়া আদায় করি যে, আমরা সময়মতো এই ভ্যাকসিনটা ক্রয় করতে পেরেছি, আনতে পেরেছি এবং তা আজকে প্রয়োগের মাধ্যমে আমাদের দেশের মানুষকে আমরা সুরক্ষা দিতে সক্ষম হব।’ তিনি বলেন, এরপর সারা দেশে টিকা দেওয়া শুরু করা হবে, যাতে দেশের মানুষ তাড়াতাড়ি স্বাস্থ্য সুরক্ষা পায়। উপহার হিসেবে ২০ লাখ ডোজ টিকা দেওয়ায় ভারত সরকারকে ধন্যবাদ জানান প্রধানমন্ত্রী। টিকার সমস্যা হবে না বলে দেশবাসীকে আশ্বস্ত করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমরা যে ৩ কোটি ৪০ লাখ ডোজ কিনেছি তার মধ্যে ৫০ লাখ এসে গেছে। এরপর থেকে আরো আসতে থাকবে। কাজেই এই ব্যাপারে কোনো সমস্যা হবে না। টিকা সংগ্রহ ও টিকাদান সবকিছু সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে সবার সহযোগিতা প্রত্যাশা করেন শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, ‘আজকে বাংলাদেশের একটা ঐতিহাসিক দিন হলো। কারণ বিশ্বের অনেক দেশও এখনো শুরু করতে পারেনি। সেখানে আমাদের মতো একটি দেশ, ঘনবসতিপূর্ণ দেশ সীমিত অর্থনৈতিক শক্তি নিয়েই আমরা কিন্তু মানুষের কল্যাণে যে আমরা কাজ করি সেটাই আজকে প্রমাণিত হলো।’ সরকারের ভালো কাজে অহেতুক সমালোচনাকারীদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের দুর্ভাগ্য হলো যে কিছু কিছু লোক থাকে, সবকিছুতেই একটা নেতিবাচক মনোভাব তারা পোষণ করে। করোনার টিকা আগে নেওয়ার বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমার তো মন চাইছে, আমরাও গিয়ে টিকা নিয়ে আসি। না থাক। শেষে আগে আগে নিলে (সমালোচকরা) বলবে, নিজেরাই আগে নিয়ে নিছে।  সবাইকে না দিয়ে। সবাইকে দিয়ে নিই, তারপর নেব।’ তিনি বলেন, ‘আমাদের কাছে অনেক মন্ত্রী-এমপি, উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা ইচ্ছা পোষণ করেছেন। আশা করছি, তারা সে সময় ভ্যাকসিন নেবেন।’ শেখ হাসিনা বলেন, ‘করোনায় সব স্থবির হয়ে গেছে। এই করোনা চরম আতঙ্ক ছড়িয়েছে। ছেলে পর্যন্ত মায়ের লাশ স্পর্শ করেনি। আত্মীয়স্বজনরা কেউ এগিয়ে আসেনি। এমন সংকটে আমরা মানুষের পাশে ছিলাম। আর্থসামাজিক গতিশীলতা রক্ষায় বিশেষ প্রণোদনা দিয়েছি। স্বাস্থ্য সুরক্ষায় যাবতীয় উদ্যোগ নিয়েছি। ভ্যাকসিনও অনেক দেশের আগে আমরা দিচ্ছি।’ তিনি বলেন, ‘মানুষের স্বাস্থ্য সুরক্ষার মতো মৌলিক অধিকার নিশ্চিতে আমরা দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছি। চিকিত্সক, নার্স, টেকনোলজিস্ট, প্রশাসন, পুলিশ, র্যাব এবং আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠন কমিটি করে মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে। সেনাবাহিনী, বিজিবি ও আনসার ভিডিপিও মানুষের পাশে ছিল। যারা এগিয়ে এসেছিলেন সবাইকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই।’

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বক্তৃতা করেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক। সঞ্চালনা করেন প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের সচিব তোফাজ্জল হোসেন। উপস্থিত ছিলেন স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব আবদুল মান্নান, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল বাসার মোহাম্মদ খুরশীদ আলম প্রমুখ। স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক বলেন, ‘ভ্যাকসিন নিয়ে যারা বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেন বা সমালোচনা করেন তাদের আগে ভ্যাকসিন দেব।’

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল বাসার মোহাম্মদ খুরশীদ আলম বলেন, ‘কে কী বলল সেদিকে কান না দিয়ে আমরা সামনের দিকে এগিয়ে যাব।’

কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে ঐ পাঁচ জনসহ গতকাল মোট ২৬ জনকে করোনা ভাইরাসের টিকা দেওয়া হয়েছে। তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে জানা গেছে, তারা সবাই ভালো আছেন। কোনো ধরনের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া তাদের দেখা দেয়নি। গুজবে কান না দিয়ে সবার করোনা ভ্যাকসিন নেওয়ার পরামর্শ দেন তারা। আজ বৃহস্পতিবার ঢাকার পাঁচটি হাসপাতালের ৪০০ থেকে ৫০০ জনকে টিকা দেওয়া হবে। কুর্মিটোলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল ছাড়াও আজ বৃহস্পতিবার স্বাস্থ্যকর্মীদের টিকা দেওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিয়েছে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, মুগদা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় ও বাংলাদেশ-কুয়েত মৈত্রী হাসপাতাল। টিকা দেওয়ার পর সপ্তাহখানেক তাদের পর্যবেক্ষণ করা হবে। সব ঠিক থাকলে আগামী ৭ ফেব্রুয়ারি সারা দেশে টিকাদান কার্যক্রম শুরু হবে। দেশের মানুষকে টিকা পেতে অনলাইনে নিবন্ধনের জন্য অ্যাপ ব্যবহার করতে হবে। করোনার টিকা নিতে আগ্রহী ব্যক্তিদের নিবন্ধন করতে হবে ‘সুরক্ষা’ নামক ওয়েব পোর্টালে (.িংঁত্ড়শশযধ.মড়া.নফ)। অ্যান্ড্রয়েড বা অ্যাপল প্লে-স্টোর থেকে সুরক্ষা মোবাইল অ্যাপ ডাউনলোড করেও করা যাবে নিবন্ধন ।

করোনা ভাইরাসের টিকা নিয়ে শুরুতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ বিভিন্ন অঙ্গনে গুজব ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। করোনার টিকা নিলে মানুষ কুমির হয়ে যাবে, পঙ্গু হয়ে যাবে—এমনকি মারাও যেতে পারে গুজব ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু গতকাল তা মিথ্য প্রমাণিত হলো। বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকরা বলেন, চিকিত্সাসেবা নিয়ে রাজনীতি করা ঠিক না। টিকা নিয়ে গুজব ছড়ানোর মূল লক্ষ্যই ছিল মানুষকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়ার ষড়যন্ত্র। টিকা চিকিত্সার একটি অংশ। সবার স্বতঃস্ফূর্তভাবে টিকা গ্রহণের পরামর্শ দেন বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকরা।