দেশে বহুকাল ধরিয়া একটি প্রবচন চালু রহিয়াছে। প্রবচনটি হইল ‘আপনি আচরি ধর্ম শেখাও অপরে।’ ইহার সার কথা হইল, আমাদের সমাজে, আমাদের প্রজাতন্ত্রে এমন অনেক ব্যক্তি রহিয়াছেন, যাহারা উপদেশ দিতে পছন্দ করেন। কিন্তু তাহাদের নিজেদের জীবন বা আচরণে সেই উপদেশ প্রতিফলিত হইয়াছে কি না—সেই সম্পর্কে বিশেষ নজর রাখেন না। এমন ব্যক্তিরা যখন কাহাকেও কোনো কিছু শিখাইতে চেষ্টা করেন, তাহা গ্রহণযোগ্যতা পায় না। একজন মানুষ কেবল নিজের চর্চার মধ্য দিয়া যদি কোনো কথা বলেন, তাহা হইলেই কেবল মানুষের কর্ণগোচর হইয়া থাকে; গুরুত্ব দিয়া মানুষ কথাটি ভাবিয়া দেখে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরপরই বিশ্বব্যাপী উপনিবেশের অবসান ঘটিতে থাকে। শুরু হয় তৃতীয় বিশ্বের যাত্রা, যাহাকে ভদ্র ভাষায় আমরা বর্তমানে উন্নয়নশীল দেশ বলিয়া ডাকিয়া থাকি। ১৯৪৭ সালে ভারত উপমহাদেশ ব্রিটেন ছাড়িয়া যাইবার পর আমরা হইয়াছিলাম পূর্ব পাকিস্তান। সেই তখন হইতেই শুরু হইয়াছিল দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘জ্বালাময়ী’ বক্তব্য। দুর্নীতিমুক্ত সমাজ গড়িবার বহু অঙ্গীকার। কিন্তু দিন যতই গড়াইয়াছে, দুর্নীতি তত বাড়িয়াছে এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে বক্তব্যও আরো বেশি আবেগঘন হইয়া উঠিয়াছে। বাংলাদেশ স্বাধীন হইবার পরও একই ধারা অব্যাহত রহিয়াছে, কোনোই ব্যত্যয় ঘটে নাই। ইহার সহিত তৈরি হইয়াছে সকল কিছু কেয়ার না করিবার প্রবণতা। রাষ্ট্র ও সমাজ হইতে দুর্নীতি উত্খাত তো দূরের কথা, বরং সরকারি আয়ব্যয় প্রতিটি ক্ষেত্রেই এমন একটি ভাব তৈরি হইয়াছে, যেন ‘উহা তো আমার নহে, অন্যের জিনিস!’ ইহা প্রকৃতপক্ষে ঔপনিবেশিক মানসিকতা, যাহা হইতে দেশ এখনো বাহির হইয়া আসিতে পারে নাই। অথচ এই দেশটি স্বাধীন করিতে অনেক রক্ত দিতে হইয়াছে। কিন্তু দেশ স্বাধীনের যে উদ্দেশ্য, যে আদর্শের স্বপ্ন ছিল তাহা অধরাই রহিয়া গিয়াছে। কোন ক্ষেত্রে অনিয়ম আর দুর্নীতি নাই তাহাই আমাদের চোখে পড়ে না। সিস্টেমের মধ্যেও বাঁধিয়া আছে গোলমাল। অথচ আশ্বাস, প্রতিশ্রুতি ও উন্নয়নের বক্তব্যের নিচে চাপা পড়িয়া যাইতেছে অনেক দুর্বলতা। যেমন সরকার উন্নয়ন পরিকল্পনায় বরাদ্দ দিয়া থাকে। প্রকল্প বাস্তবায়ন করিতে গিয়া দেখা যায় ১০ টাকার কাজ পাঁচ টাকায় আসিয়া দাঁড়াইয়াছে। ফলে যাহা হইবার তাহাই হয়, অনেক ক্ষেত্রেই ঠিকাদার কাজ অসমাপ্ত রাখিয়া অধিক পেমেন্ট লইয়া সরিয়া পড়িতেছে। অথচ এই কাজ তদারক করিবার জন্য রহিয়াছেন স্তরে স্তরে দায়িত্বপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা। আমরা দেখিতে পাই, প্রকল্পের অবস্থা যাহাই হউক না কেন, প্রকল্প পরিচালকের পদ থাকিতে হইবে অনিবার্যভাবে।
এই সকল অসংগতির কথা না বলিয়া আমরা যখন কেবল উন্নয়নের কথা বলি, তখন সেই কথা মানুষের কর্ণগোচর না হইয়া বাতাসে ভাসিয়া যায়। অর্থাত্ সকল ক্ষেত্রেই নাচের চাইতে ঢাক উচ্চ মাত্রায় বাজিলে ঢাকটাই মুখ্য হইয়া উঠে, নাচ আর মুখ্য থাকে না। যেই হারে দেশে টাস্কফোর্স, কমিশনসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান গড়িয়া উঠিতেছে তাহাতে একসময় হয়তো সরকারের আকারই ছোট হইয়া যাইবে। হয়তো তখনো আমাদের মুখের গল্প থামিবে না। আমরা বলিব, ‘পশ্চিমা উন্নত বিশ্ব যাহা পারে নাই আমরা তাহা করিয়া ফেলিয়াছি! বিশ্বকে দেখাইয়া দিয়াছি সরকার কী করিয়া ছোট করিতে হয়!’ ইহাতে গল্পটাই থাকে, বাস্তবতা হইয়া যায় তুচ্ছ, যাহার পরিণাম ভালো হয় না। ঠিক একইভাবে, সমাজের উঁচু স্তরে যাহাদের দুর্নীতি করিবার সুযোগ আছে তাহারা দুর্নীতি না করিয়া, স্বচ্ছ থাকিয়া যদি দুর্নীতির বিরুদ্ধে সমাজকে নির্দেশনা দেন, তাহা হইলে সমাজ তাহা গুরুত্বের সহিত গোচরে লইতে বাধ্য। সেই জন্যই যে কোনো স্তর হইতে যে যাহা বলিবেন, তিনি নিজে তাহা সঠিকভাবে পালন করিয়াই যদি উপদেশ-নির্দেশনা দেন, তাহা হইলে এই দেশ শৃঙ্খলায় আবদ্ধ হইবে। আর তাহা করিতে হইলে প্রথম নিজেকে জানিতে হইবে। যিনি নিজেকে জানিবেন, তিনি নিশ্চয়ই বুঝিবেন যাহা বলিতেছেন তাহা বাস্তবসম্মত কি না, পরামর্শ সময়োপযোগী কি না অথবা মানুষের নিকট গ্রহণযোগ্য কি না।
