২৬৬ দিনের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে ৩০ লাখ শহিদের আত্মত্যাগ আর ২ লাখ মা-বোনের সম্মানের বিনিময়ে আমরা লাভ করি মহান স্বাধীনতা। অসংখ্য বধ্যভূমি, গণকবর, স্বজন হারানোর বেদনা বাংলাদেশকে অন্ধকারে ঢেকে দিতে পারেনি। মহামারি করোনা বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি গেল বছর বিজয় দিবসে বিজয়ের আনন্দ উপভোগ থেকে। আমরা বিজয়ের আনন্দ দেখেছি অর্থনৈতিক উন্নয়ন, সমুদ্রবিজয়, বিদ্যুত্ উত্পাদন, সামাজিক নিরাপত্তা বলয় সৃষ্টি, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, দুর্নীতি দমন, অসাম্প্রদায়িক চেতনার বিকাশ, পরিবেশ রক্ষা, যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন, নিরাপদ খাদ্যনিরাপত্তা তৈরি, নারীর ক্ষমতায়ন ও দারিদ্র্যবিমোচনে। বিজয়ের আনন্দ দেখেছি শিক্ষার প্রসার, কৃষি বিপ্লব, উদ্যোক্তা তৈরি, স্বাস্থ্যসেবার প্রসার, দুর্যোগ মোকাবিলা, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধি, মাথাপিছু আয় ও গড় আয়ু বৃদ্ধি, আবাসন সমস্যা সমাধান, মাদক নির্মূল, মেগা প্রকল্প ও গর্বের স্ব-অর্থায়নের পদ্মা সেতুর কাজের অগ্রগতিতে। এসব অর্জন আমাদের স্বাধীনতা অর্জনকে সার্থক করে তুলছে।
২০২১ সালে বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশের কাতারে নাম লেখাবে আর ২০৪১ সালের পৌঁছবে উন্নত দেশে। মানুষ বিশ্বাস করে—গতিতেই জীবন। গতিহীন জীবন মৃত্যুসম। ২০৪১ সালে উন্নত দেশের কাতারে সামিল হতে মানুষ প্রবল আগ্রহে স্বাভাবিক অগ্রগতিতে ছুটে চলেছে। নতুনকে ধারণ করে, নতুন শক্তিতে বলীয়ান হয়ে উন্নয়ন ও অগ্রগতিতে শামিল হচ্ছে। সদিচ্ছা নিয়ে নিজেদের সামর্থ্যের প্রতি বিশ্বাস রেখে সামনে এগিয়ে যেতে পারলে সাফল্য আসবেই। ব্যক্তিজীবনে মানুষ সাহসী হবে, যা সামষ্টিক জীবনে প্রতিফলন হবে। তবে জনগণের দুঃখ,স্ব-অর্থায়নে পদ্মা সেতুটি নির্মাণ করা হলেও অনেক প্রকল্পের মতোই প্রাথমিক প্রাক্কলনের তিন গুণ অর্থ ব্যয় হচ্ছে। স্বাধীন দেশে নিজেদের অর্থ ব্যয়ে দায়িত্বশীল হতে হবে। আরো দুঃখ হলো, দেশের অন্যতম মেধাবী শিক্ষার্থীদের নিয়ে আটটি প্রকৌশল ও কারিগরি বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনার পর বঙ্গবন্ধু সেতু, লালন সেতু নির্মাণ ও দেশে-বিদেশে প্রশিক্ষণের পরও আমাদের পেশাজীবীরা পদ্মা সেতু নির্মাণে ভূমিকা পালনে ব্যর্থ হয়েছে। নির্মাণের দায়িত্ব যারা নিতে পারে না, তারা তত্ত্বাবধায়ন করে সেতুর নির্মাণ বুঝে নেবে কীভাবে? তাই নির্মাণে ত্রুটি থাকছে, জীবনকাল পাচ্ছে না।
স্বাধীনতা আমাদের মধ্যে আকাশসমান স্বপ্ন জাগিয়েছিল। স্বপ্ন ছিল দেশকে প্রগতির পথে নিয়ে মানুষের দুঃখকষ্ট দূর করার লক্ষ্যে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় শাসকশ্রেণি নিবেদিত হবে; কিন্তু পাহাড়সম সমস্যার অগ্রাধিকার চিহ্নিত করার ব্যর্থতায় লক্ষ্যহীন যাত্রা শুরু হয়। দীর্ঘদিনের লক্ষ্যহীন যাত্রার কারণে জনগণ জানতে পারেনি তাদের গন্তব্য। আগামী ২০/৫০ বছর পর তাদের সামাজিক অর্থনৈতিক অবস্থানকে শাসকশ্রেণি কোথায় নিয়ে যেতে কাজ করে চলেছে। কিন্তু আজ জনগণের সামনে বর্তমান মহাজোট সরকার একটা সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নির্ধারণ করে দিয়েছে। সেই লক্ষ্য পূরণের মহাযজ্ঞ চলমান। যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়নে রাজধানীতে মেট্রোরেল আসছে, চার লেনের সড়কব্যবস্থা হচ্ছে, রেলযোগাযোগ সহজতর করতে পদ্মা সেতুতে রেল সংযুক্ত হয়েছে এবং বঙ্গবন্ধু সেতুর পাশে রেলসেতুর প্রকল্প আসছে। নৌযোগাযোগ সম্প্রসারণে নদনদী ড্রেজিংয়ের মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের কাজ চলছে। বিদ্যুতের সমস্যা সমাধানে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুেকন্দ্রের পাশাপাশি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুত্ উত্পাদনের ব্যাপক কার্যক্রম চলছে। এখনই দেশের চাহিদার চার গুণ বিদ্যুত্ উত্পাদিত হচ্ছে যা ব্যবহার করা যাচ্ছে না। ব্যবহারের ক্ষেত্রে প্রস্তুত না করে এমন বিদ্যুত্ উত্পাদন পরিকল্পনাহীনতার পরিচায়ক বলে জনগণ শত আনন্দের মধ্যেও দুঃখ পায়।
নিয়মিত বিরতিতে একনেকে হাজার হাজার কোটি টাকার প্রকল্প অনুমোদন করা হচ্ছে। জাতীয় আয়ের প্রধান উত্স কৃষি থেকে রপ্তানিনির্ভর পোশাকশিল্প ও রেমিট্যান্স হওয়ায় বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সম্মানজনকভাবে বেড়ে চলেছে। নারীর ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে ক্ষুদ্রঋণের মাধ্যমে দারিদ্র্যবিমোচনের উদ্যোগ, নারীনির্ভর পোশাকশিল্পে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করে, কৃষিক্ষেত্রে নারীশ্রমককে গুরুত্ব দিয়ে অর্থনীতিকে শক্তিশালী করা হয়েছে। রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ জোন তৈরি করা হচ্ছে। এসব কিছুর ফলে আমাদের মাথাপিছু আয় বাড়ছে। দেশের মানুষ এত আনন্দের মধ্যে আর্থিক শ্রেণিবৈষম্য ক্রমাগতভাবে প্রবল হওয়ায়, কৃষিক্ষেত্রে আধুনিকায়ন না হওয়ায়, লোকসানের অজুহাতে বৃহত্ শিল্পকারখানা বন্ধ করে দেওয়ায়, আর্থিক দুর্বৃত্তায়ন ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের সংস্কৃতিতে জনগণ দুঃখ পায়। প্রবাসীদের প্রেরিত অর্থে গ্রামীণ অর্থনীতি উন্নত হলেও মধ্যস্বত্বভোগীদের হাত থেকে রক্ষা না হওয়ায় মানুষকে দুঃখ দেয়। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ও বাজারব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণহীন থাকায় খাদ্যনিরাপত্তায় টান পড়ছে। দেশের অর্থনীতির প্রবাহকে দুর্নীতিমুক্ত গতিশীল রেখে, তরুণ কর্মমুখী মানুষকে কর্মের স্রোতে ফেলে, গৃহীত প্রকল্প বাস্তবায়নে আন্তরিক হলে জনগণের অর্থনৈতিক মুক্তি বেগবান হবে। উন্নয়ন ও অগ্রগতির প্রকল্প বাস্তবায়নে বিদেশে বেগুন পোড়া শিখতে বা দেখতে যাওয়ার প্রবণতা কঠোরভাবে বন্ধ হওয়া প্রয়োজন।
এখন আর ডিজিটাল বাংলাদেশ স্বপ্ন নয়—বাস্তব। তথ্যপ্রযুক্তির মহাসড়কে ইন্টারনেট ব্যবহার, ই-কনফারেন্স, ই-ক্যাশ, ই-ব্যাংকিং, ই-টেন্ডারিং ইত্যাদির পাশাপাশি সরকারি-বেসরকারি দপ্তরে, শিক্ষায়, প্রকাশনায় কম্পিউটার ব্যবহার বেড়ে চলেছে। পেশাজীবীদের রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়ায় প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও গতিশীলতা আনতে, জাতীয় নির্বাচনকে স্বচ্ছ করতে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার হচ্ছে। কম্পিউটারের পাশাপাশি মোবাইলের বহুমাত্রিক ব্যবহার গুরুত্ব পাচ্ছে। তথ্যপ্রযুক্তির কাজ এখন মোবাইল ফোনে হওয়ায় সাধারণ মানুষের কাছে সহজতর হয়ে পড়েছে। তবে বেসরকারি মোবাইল ব্যবসায়ীদের অসহযোগিতা কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে সহায়ক হচ্ছে না। উপজেলা তথ্যকেন্দ্র ও তথ্য-অধিকার আইন জনগণকে উত্সাহিত করছে। তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার সবচেয়ে গুরুত্ব পেয়েছে এই করোনাকালে শিক্ষাব্যবস্থায়। বিত্তবানদের জন্য এমন প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষাব্যবস্থা সমস্যা সৃষ্টি না করলেও সাধারণ জনগণের জন্য বিশাল সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্বাধীনতার পর থেকে প্রাতিঠানিক শিক্ষায় ভর্তির হার বেড়েছে, শিক্ষার হার বেড়েছে, সাক্ষরতার হার বেড়েছে, নারীশিক্ষার হার বেড়েছে, আর ঝরে পড়ার হার কমেছে। মহাজোট সরকারের যুগান্তকারী উপহার জাতীয় শিক্ষানীতি। উচ্চশিক্ষার পথ সুগম করতে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশাপাশি সিরিজ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এসেছে। বিজ্ঞান-প্রযুক্তি-চিকিত্সা-কৃষি-কারিগরি শিক্ষার প্রসার ঘটেছে। তবে মানসম্মত শিক্ষার চাহিদা পূরণে সংশ্লিষ্টদের নজর এড়িয়ে চলা জনগণকে দুঃখ দেয়। তারপরও বাংলাদেশের ভবিষ্যত্ অগ্রগতিতে বিশ্ববাসী আশাবাদী। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তির প্রাক্কালে নতুনের প্রতি আগ্রহ মানুষের মধ্যে সম্ভাবনা জাগিয়ে তুলেছে। উন্নয়নের সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে, মতাদর্শের ভিন্নতাকে সরিয়ে রেখে, ব্যক্তিস্বার্থের ঊধ্বে উঠে, কুপ্রবণতাকে রোধ করে, অনুদার ও সংকীর্ণ দৃষ্টিমুক্ত হয়ে, নিজেদের কৃষ্টি-কালচারকে সামনে রেখে জাতির দায়িত্ব পালনে আন্তরিক হলে মাটি আর মানুষের প্রত্যাশার উন্নয়ন সুনিশ্চিত। কিন্তু বাংলাদেশের কৃষক-শ্রমিক-সাধারণ মানুষকে বঞ্চিত রেখে সার্বিক উন্নয়ন হবে সোনার পাথরবাটির মতো।
n লেখক : অসবরপ্রাপ্ত কলেজশিক্ষক
