সিলেটে মাদকের বিস্তার ভয়াবহ 

আপডেট : ২৯ জানুয়ারি ২০২১, ১৯:০৯

সিলেটে মাদক ব্যবসা বিস্তার লাভ করেছে ভয়াবহভাবে। প্রতিদিনই মাদকসহ ধরা পড়ছে ব্যবসায়ী ও বহনকারীরা। এই মাদক ব্যবসায় নারীরাও জড়িয়ে পড়ছে। সিলেটে বর্তমানে ৩ হাজারেরও বেশি মাদক কারবারী কারাগারে রয়েছে।

গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় সিলেট নগরীর উপশহর থেকে রোকসানা আক্তার (৩৬) নামের এক নারীকে ২৮ হাজার ৮শ’ পিস ইয়াবাসহ গ্রেফতার করে র‌্যাব। রোকসানা জকিগঞ্জের এওলাসার এলাকার আব্দুল হামিদ চৌধুরীর স্ত্রী। এ ঘটনায় র‌্যাব বাদী হয়ে তার বিরুদ্ধে শাহপরাণ থানায় মাদক আইনে মামলা দায়ের হয়েছে।

আরও পড়ুন: সীমান্তে হঠাৎ বেড়েছে মাদক চোরাচালান

র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন-৯ এর অধিনায়ক লে. কর্নেল আবু মুসা মো. শরীফুল ইসলামের নেতৃত্বে মেজর মো. শওকাতুল মোনায়েম, সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) একেএম কামরুজ্জামান এবং সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) আব্দুল্লাহসহ সদর কোম্পানির একটি দল রোকসানাকে গ্রেফতার অভিযানে অংশ নেয়। 

এর আগে ১৮ জানুয়ারি ইয়াবা বিক্রির সময় পুলিশের উপপরিদর্শক রোকন উদ্দিন ভুঁইয়া (৪০) ও এক নারীসহ ৫ জনকে আটক করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। তাদের কাছ থেকে ১৮২ পিস ইয়াবা ও নগদ ৮২ হাজার ৩০০ টাকা উদ্ধার করা হয়। 

আটক উপপরিদর্শক মো. রোকন ২০১৯ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি মাদকসহ ধরা পড়লে সাময়িক বরখাস্ত হয়ে সিলেট আর্মড পুলিশে যুক্ত ছিলেন। সেখান থেকে কৌশলে বের হয়ে তিনি মাদক ব্যবসা করতেন। আটক এই ৫ জন বর্তমানে জেল হাজতে। তাদের বিরুদ্ধে মাদক আইনে মামলা করেছে পুলিশ। 

এসএমপি’র এডিসি (মিডিয়া) আশরাফ উল্লাহ জানান, মাদক ব্যবসায় রুকনের সঙ্গে কারা কারা জড়িত এবং এর উৎস কোথায় তারও অনুসন্ধান চলছে।

সীমান্তের ওপার থেকে আসে মাদক:

সূত্র মতে এসব মাদক আসছে সীমান্তের ওপার থেকে। প্রতিদিন মাদক বিরোধী অভিযান চললেও ধরা পড়ছে কম। মাদকের সহজলভ্যতায় বিপথগামী হচ্ছে সিলেটের তরুণ সমাজ। তাতে উদ্বিগ্ন সচেতন মহল। তারা বলেছেন, ‘আইন-শৃঙ্খলাবাহিনী, জনপ্রতিনিধিরা মাদক ব্যবসায় জড়িয়ে পড়লে আমরা যাবো কোথায়।’ 

এদিকে গত বছর সিলেট বিভাগে ১১ কোটি ১৩ লাখ ৩৩ হাজার টাকার ইয়াবাসহ বিভিন্ন ধরনের মাদকের চালান ধরা পড়ে আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হতে।

‘মাদক ব্যবসা ঠেকাতে সীমান্তেও নরজরদারী জোরদার জরুরি,’ এমন মন্তব্য করেছেন সিলেটেস্থ সুজন সভাপতি ফরুক মাহমুদ চৌধূরীর। ‘ভয়াবহ এই মাদক ব্যবসা বন্ধ করতে সামাজিক সচেতনতার আহ্বান জানিয়ে সিলেট রেঞ্জের ডিআইজি সিলেটের ডিআইজি মফিজ উদ্দিন আহম্মেদ (পিপিএম) বলেছেন, ‘মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্সে পুলিশ। তবে অভিভাবকদেরকেও সন্তানদের প্রতি খেয়াল রাখার কথা বলেন তিনি।

আরও পড়ুন:  রাজধানীতে মাদক বিক্রি ও সেবনের অভিযোগে গ্রেফতার ৫০

সূত্র মতে, সিলেটের বিভিন্ন সীমান্ত পথে মাদকের চালান ঢুকে সড়ক ও রেল পথে হয়ে রাজধানীর ঢাকাসহ অন্যান্য স্থানে যায়। সিলেট সীমান্ত দিয়ে ফেন্সিডিল, গাজা, ইয়াবা, ভারতীয় বিভিন্ন ব্রান্ডের মদ এসে থাকে। ব্যবসায়ীরা সিলেট নগরীকে নিরাপদ ‘ট্রানজিট’ হিসেবে বেছে নিয়েছে। 

এ ব্যবসার সঙ্গে জড়িত মাদক কারবারি, নারী, ট্রাক চালক জনপ্রতিনিধি এমনকি পুলিশ সদস্যও। বিশেষ করে রাজনীতিবিদ, আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, জনপ্রতিনিধিরা ইয়াবা ব্যবসায়ে জড়িয়ে পড়ার ঘটনায় উদ্বেগ বেড়েছে। জকিগঞ্জ পৌর যুবলীগের সভাপতি শাহরিয়ার রহমান বেশ কয়েক দিন আগে ইয়াবাসহ নগরীর দরগা গেইটে আটক হন। একইভাবে ইয়াবা পাচারের ঘটনায় আটক হন জকিগঞ্জের খলাছড়া ইউনিয়নের ৫নং ওয়ার্ড সদস্য শাহিন আহমদ ও ৬নং ওয়ার্ড সদস্য শাহাব উদ্দিন।

জকিগঞ্জ থানার ওসি মীর মো. আব্দুল জাহের জানান, গত বছরে জকিগঞ্জ থানায় ইয়াবা সংক্রান্ত মামলা হয় ১০৯টি। গ্রেফতার ১৪৯ জন। এসময় ৩৫ হাজার ২৫২ পিস ইয়াবা, ১ হাজার ৩৮৪ বোতল ভারতীয় মদ। 

গত ২২ জুলাই রাতে ৩০ হাজার পিস ইয়াবা, ২৯ হাজার টাকাসহ মাদক ব্যবসায়ী খালেদ মিয়াকে বিশ্বনাথের শিমুলতলায় অভিযান চালিয়ে গোয়েন্দা পুলিশ গ্রেফতার করে। গত বছর ৯ ফেব্রুয়ারি নরসিংদীর নারায়ণপুর বাসস্ট্যান্ড এলাকায় পাথরবাহী এক ট্রাকে তল্লাশি করে ১০ হাজার পিস ইয়াবা, ২৭০ বোতল ফেনসিডিল ও নগদ ৫৫ হাজার টাকা উদ্ধার করে গোয়েন্দা পুলিশ। গ্রেফতার করা হয় ট্রাক চালক জকিগঞ্জের তাজ উদ্দিনকে। 

একই বছরের ৫ ফেব্রুয়ারি সিলেট-ঢাকা সড়ক পথে হানিফ পরিবহনের বাসে মাদকসহ নাহিদা বেগম ও শাহিনা খাতুন ধরা পড়েন হবিগঞ্জে। গোয়েন্দা পুলিশ তাদের শরীর থেকে ৬১ হাজার পিস ইয়াবা উদ্ধার করে। পরদিন এই দুই নারী হবিগঞ্জের আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দীও দেন।   

ইত্তেফাক/জেডএইচ