‘ধৈর্য মানে কাঁটার দিকে তাকাইয়া গোলাপকে দেখা’

আপডেট : ২৯ জানুয়ারি ২০২১, ২২:০৯

এই পৃথিবীতে নিরবচ্ছিন্ন দিন কিংবা রাত নাই। ইহা ঠিক যে, দুই মেরুবৃত্তের মধ্যে বত্সরের অর্ধেক সময় টানা দিন কিংবা রাত থাকে। তবে উহারও মেয়াদ আছে। ছয় মাস। অর্থাত্ দেরিতে হইলেও উহারও পটপরিবর্তন হইবেই। প্রকৃতির মধ্যেই রহিয়াছে মানবজীবনের গভীর দর্শন। এই জগতে কখনো এমন দিন আসিবে না, যখন আপদ বলিয়া কিছু থাকিবে না। মঙ্গলের পাশাপাশি অমঙ্গল থাকিবেই। অমঙ্গল কাহারোই কাম্য নহে বটে। তবে ভুলিয়া গেলে চলিবে না—মঙ্গল ও অমঙ্গলের উত্পত্তি কিন্তু একই শিকড় হইতে। এই কারণে কিশোরবেলা হইতেই আমাদের শিখানো হয়—অমঙ্গলকে জগত্ হইতে হাসিয়া উড়াইয়া দিবার চেষ্টা করিও না, তাহা হইলে মঙ্গলসমেত উড়িয়া যাইবে।

আমরা কেন ভুলিয়া যাই যে, একটি অন্ধকারাচ্ছন্ন আধাসামন্তবাদী সমাজ হইতে আমাদের উত্তরণ ঘটিয়াছে। কোনো অন্ধকারই রাতারাতি দূর হয় না। ইহাও দূর হইতে সময় লইবে। চারিদিকে তাকাইলে আমরা কিন্তু এখনই অনেক পরিবর্তন দেখিতে পাইব। এককালের অন্ধকারই যেমন শেষ কথা ছিল না, তেমনটি এই আধা-অন্ধকার দিনগুলিও শেষ কথা নহে। তাহা ছাড়া, তৃতীয় বিশ্বের অশিক্ষিত, অর্ধশিক্ষিত জনপদে কোন শাসনব্যবস্থা যথোপযুক্ত—তাহার মীমাংসা এখনো হয় নাই। কিন্তু আমাদের তো আইনের শাসন মানিতে হইবে। একটা ‘আদর্শ’ তো আমাদের সম্মুখে থাকা চাই। আর সেই আদর্শই হইল ‘রুলস অব ল’। সমস্যা অনুযায়ী আইন আসিয়াছে। সময়ের প্রয়োজনেই যুগের সহিত তাল মিলাইয়া আস্তে আস্তে পরিবর্তন আসিয়াছে, আসিতেছে। সুতরাং পরিবর্তন আসিবেই। আর ইহার জন্য সর্বাগ্রে প্রয়োজন তিনটি জিনিস—ধৈর্য, ধৈর্য এবং ধৈর্য। অধৈর্য ও অসহিষ্ণুতার ফল খুব খারাপ হয়। চৈনিক দার্শনিক কনফুশিয়াস এই জন্য বলিয়াছেন—ধৈর্যের অভাবের কারণে অনেক বড় বড় সম্ভাবনা ধ্বংস হইয়া যায়। প্রকৃতপক্ষে ধৈর্য এমন একটি গাছ, যাহার সারা গায়ে কাঁটা, কিন্তু ফল অতি সুস্বাদু। সুতরাং ‘কাঁটা হেরি ক্ষান্ত কেন কমল তুলিতে?’ কাঁটার ভয়ে ধৈর্যহারা হইলে সাফল্য আসিবে কী করিয়া? মনে রাখিতে হইবে, মহান সৃষ্টিকর্তা সাফল্যের নিয়ামকরূপে বর্ণনা করিয়াছেন ধৈর্যকে। বিখ্যাত ফারসি কবি জালালউদ্দিন রুমির নিকট ধৈর্য হইল বুদ্ধিমত্তার উত্তম পরিচয়। তিনি মনে করিতেন—ধৈর্য মানে শুধু বসিয়া বসিয়া অপেক্ষা করা নহে, ধৈর্য মানে ভবিষ্যেক দেখতে পাওয়া। ধৈর্য মানে কাঁটার দিকে তাকাইয়া গোলাপকে দেখা, রাতের অন্ধকারের দিকে তাকাইয়া দিনের আলোকে দেখা।

প্রকৃতপক্ষে, ধৈর্য ধরা মানে ভরসা করা। যাহার মাঝে ধৈর্য নাই, ধরিয়া লইতে হইবে তিনি একজন দুর্বল মনের মানুষ—যিনি অল্পতেই অস্থির হইয়া পড়েন। যাহার ধৈর্য নাই, তাহার মধ্যে আত্মবিশ্বাস এবং সাহসও নাই। অধৈর্য অস্থিরতা কত বড় ক্ষতি করিতে পারে, তাহার ভারতের প্রখ্যাত সাহিত্যিক গুলজারের দেশভাগ লইয়া রচিত একটি গল্প হইতে উদাহরণ দেওয়া যায়। দেশভাগের সময় একটি গরিব পাঞ্জাবি পরিবার সদ্যোজাত যমজ বাচ্চা লইয়া ভিড়ে ঠাসা ট্রেনের ছাদে উঠিয়াছে। ভিড়ের চাপে, প্রচণ্ড অস্থিরতায় বাবা-মা খেয়ালই করেন নাই কখন তাহাদের একটি বাচ্চা মারা গিয়াছে। ট্রেন তখন রাভী নদীর ওপর দিয়া গমগম করিয়া চলিতেছে। একজন বলিয়া উঠিলেন, সর্দারজি, মরা বাচ্চাকে আর কোলে রাখিয়া লাই নাই, গুনাহ হইবে, নদীতে ভাসাইয়া দিন। দেশভাগ, দেশত্যাগ, বাচ্চার মৃত্যু—সর্দারজীর তখন মাথার ঠিক নাই। তিনি বউয়ের কোল হইতে জোর করিয়া বাচ্চাটিকে টানিয়া লইয়া ছুড়িয়া দিলেন নদীর জলে। রাতের অন্ধকারে একটি বাচ্চার কান্নার কচিকণ্ঠ নিকট হইতে দূরে মিলাইয়া গিয়া শব্দ হইল—ঝপ। পরক্ষণেই সর্দারজি সন্দিহান হইয়া বউয়ের কোলে হাত দিয়া দেখিলেন—তাহার বউ মরা বাচ্চাটিকে কোলে লইয়া কাঠ হইয়া বসিয়া আছেন। জীবিত বাচ্চাটি তখন নদীর গভীরে। এই কারণেই ধৈর্যশীলদের মহান সৃষ্টিকর্তা ভালোবাসেন।